দেশের প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে ৪১ হাজার ৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৫) অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। একই সঙ্গে ৫৮ হাজার ৮৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৩টি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ৫০ হাজার ৪১ কোটি ২০ লাখ টাকা। প্রকল্প ঋণ ৭ হাজার ৯৭৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ৭৩ কোটি ৭ লাখ টাকা।
গতকাল বুধবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় এসব প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশগ্রহণ করেন।
একনেক সভায় প্রধানমন্ত্রী উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বড় প্রকল্পের পণ্য ক্রয়ের আগে বাজারদর যাচাইয়ের নির্দেশ দেন। এ জন্য প্রাইস অ্যাসেসমেন্ট কোম্পানি (মূল্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান) নিয়োগ করে পণ্যগুলোর দাম যাচাইয়ের ব্যবস্থা করার কথাও বলেন তিনি। সভাশেষে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি একটি সুশৃঙ্খল যাচাই ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রাইস অ্যাসেসমেন্ট কোম্পানি নিয়োগ করে সব পণ্য কেনার দাম বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা যাচাই করার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা তৈরি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সরকার এ প্রক্রিয়া অনুমোদন করেছে এবং ধীরে ধীরে তা চালু করা হচ্ছে।
জানা গেছে, পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৫) প্রকল্পটি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বাস্তবায়ন করবে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। প্রকল্পটি ৪১ হাজার ৯০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ৩৩ হাজার ২০৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। বাকি ৭ হাজার ৮৮৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে সংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউনিসেফ ও ইউনেস্কোসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার অর্থায়নে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে ঋণ ও অনুদানের বিষয়ে আলোচনা এবং চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, একনেক সভায় জরুরি বিবেচনায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হলেও বিভিন্ন খাতের ব্যয় নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের পর্যবেক্ষণের পরিপ্রেক্ষিতে দুই সপ্তাহের মধ্যে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশোধনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
একনেকে অনুমোদন পাওয়া অন্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের ‘বরেন্দ্র অঞ্চলে নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্প’, ‘বরিশাল সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন খালের পাড় সংরক্ষণসহ পুনরুদ্ধার ও পুনঃখননকাজ (প্রথম পর্ব)’, ‘ইনোভেশন ফর ক্লাইমেট স্মার্ট আরবান ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প’, ‘সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প’ এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-৩-এর তৃতীয় সংশোধন।
অন্যদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুটি প্রকল্প ‘বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিশেষায়িত যানবাহন ক্রয় এবং অপারেশনাল যানবাহন ক্রয় প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঢাকা সেনানিবাসের মঈনুল রোড আবাসিক এলাকায় ‘বি’ টাইপ অফিসার্স বাসস্থান নির্মাণ প্রকল্প এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের জিগাতলার গাবতলা কলোনিতে সরকারি কর্মচারীদের জন্য বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দেশের পাঁচটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ক্যাম্পাসে ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস (ইনমাস) স্থাপন প্রকল্প এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৫) অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে দুটি মূল্যায়ন-কাম-উন্নয়ন কূপ (তিতাস-৩২ ও ৩৩) খনন প্রকল্প এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের গ্রামীণ রাস্তায় ১৫ মিটার দৈর্ঘ্য পর্যন্ত সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধন অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
সভায় পরিকল্পনামন্ত্রীর মাধ্যমে ইতিমধ্যে অনুমোদিত ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়ের পাঁচটি প্রকল্প সম্পর্কেও একনেককে অবহিত করা হয়। প্রকল্পগুলো হলো দিনাজপুর জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউটের হৃদরোগ চিকিৎসাসেবার আধুনিকায়ন; দেশের শিশু-কিশোরসহ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার নিশ্চিতকরণ; ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার ট্রাফিক অবকাঠামো উন্নয়নসহ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পের প্রথম সংশোধন; ঢাকা কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্র সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন প্রকল্পের প্রথম সংশোধন এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে আধুনিক যান-যন্ত্রপাতি সংগ্রহ প্রকল্প।