পোশাক খাতে অস্থিরতা 

থামছে না সহিংসতা চলছে সংঘর্ষ অবরোধ

আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০২:১১ এএম

পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে গতকাল বুধবারও উত্তপ্ত ছিল রাজধানীর মিরপুর, সাভার, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ। মিরপুরে প্রধান সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও মিরপুর-১১, পল্লবী ও রূপনগরের বিভিন্ন কারখানার সামনে শ্রমিকদের জমায়েত ঘিরে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। সাভারের হেমায়েতপুরে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। সাভার মডেল থানার ওসিকে মারধর এবং তার গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এতে ওসিসহ অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছেন। প্রায় এক ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ ছিল ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে। গাজীপুরে নিহত শ্রমিকের গায়েবানা জানাজায় বাধা, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। নারায়ণগঞ্জেও আন্দোলন অব্যাহত রেখেছেন শ্রমিকরা। 

মিরপুর: গতকাল সকালে পল্লবী শিল্প এলাকার কয়েকটি পোশাক কারখানার সামনে শ্রমিকরা জড়ো হওয়ার চেষ্টা করেন। রূপনগরের শিয়ালবাড়ী এলাকায়ও সড়কে নামার চেষ্টা করেন তারা। পুলিশ তাদের বুঝিয়ে সরিয়ে দেয়। মিরপুর-১১ নম্বরে একটি পোশাক কারখানার সামনে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের বাগবিত-ার ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে শ্রমিকদের ক্ষোভের মুখে পুলিশ সেখান থেকে সরে যায়। ফলে বড় ধরনের অবরোধ না হলেও কয়েকটি জায়গায় উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত মিরপুর-১০ থেকে মিরপুর-১২ নম্বর পর্যন্ত সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক ছিল। পুলিশ বলেছে, শ্রমিকদের কয়েক দফা সড়কে নামার চেষ্টা ঠেকানো হয়েছে এবং তাদের বুঝিয়ে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে কর্মদিবসে অফিসগামী মানুষ, গণপরিবহনের যাত্রী ও অন্যান্য যানবাহনকে আগের দিনগুলোর মতো দীর্ঘ সময় আটকে থাকতে হয়নি।

সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল থেকে মিরপুর-১০, ১১, ১২, পল্লবী ও রূপনগর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে পুলিশ ও বিশেষায়িত বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থানে সাঁজোয়া যান ও জলকামানের গাড়িও রাখা হয়। কয়েক জায়গায় শ্রমিকরা সেøাগান দিচ্ছেন। আন্দোলন দমনে বিভিন্ন সড়কে দফায় দফায় মিছিল করেছে বিএনপির অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা।

এলাকার সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, তারা এই সহিংসতায় চরম বিরক্ত ও উদ্বিগ্ন। তাদের ভাষ্য, কয়েকদিনের টানা আন্দোলনে স্বাভাবিক জনজীবন ব্যাহত হচ্ছে। জরুরি প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হতেও এখন ভয় পাচ্ছেন অনেকে। কখন কোথায় সংঘর্ষ শুরু হয়, কিংবা শ্রমিক সন্দেহে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ, মারধর বা আটকের মুখে পড়তে হয়এমন শঙ্কা কাজ করছে তাদের মধ্যে। শ্রমিকদের দাবির সমাধানের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশের দাবি জানান তারা।

ডিএমপি যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) ক্রাইম প্রিভেনশন উত্তর মো. মহিদুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ১০ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। আন্দোলনের নামে যারা দেশকে অস্থিতিশীল, জনদুর্ভোগ সৃষ্টি, সড়ক অবরোধ, গাড়ি ভাঙচুর এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ নষ্ট করার চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত সব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তিনি বলেন, বুধবার শ্রমিকদের সড়কে নামার সুযোগ হয়নি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। অনেক পোশাক কারখানার শ্রমিক কাজে ফিরে গেছেন এবং কারখানাগুলোতে কাজ চলছে।

সাভার: সাভারের হেমায়েতপুর, উলাইল ও আশুলিয়ায় দিনভর দফায় দফায় সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। সকালে কারখানায় হাজিরা দেওয়ার পর শ্রমিকরা বেরিয়ে এসে বিক্ষোভ শুরু করেন। হেমায়েতপুরের পদ্মার মোড় ও বাসস্ট্যান্ড এলাকায় তারা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট ছোড়ে। এ সময় শ্রমিকদের হামলায় সাভার মডেল থানার ওসি সাইফুল আলম আহত হন। তার ব্যবহৃত গাড়ি ও পুলিশের একটি মোটরসাইকেলে আগুন দেওয়া হয়। উলাইলের আল-মুসলিম কারখানার সামনেও শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। এতে আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং কিছু সময় যান চলাচল বন্ধ থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এ সময় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে মবিন নামের একজনকে আটক করে পুলিশ। সংঘর্ষের বিভিন্ন পর্যায়ে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে হেলমেট ও মুখোশপরা লাঠি হাতে একদল লোককে দেখা যায়। এসব ঘটনায় পুলিশ, শ্রমিক, সাংবাদিক ও পথচারীসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হন। পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। এদিকে বহিরাগত ও নৈরাজ্যকারীদের প্রতিহত করার কথা বলে সাভারের তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নসহ আশপাশের বিভিন্ন কারখানার সামনে অবস্থান নেন বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা।

সাভারের ইউএনও মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অনেক কারখানা কর্তৃপক্ষ ছুটি ঘোষণা করেছে। সাভার ও আশুলিয়ায় বিজিবি সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি নয়জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন।

বিজিবি-৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তৈয়মুর হাসান খান বলেন, অরাজকতা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি ঠেকাতে বিজিবি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে সর্বাত্মক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

শিল্পপুলিশ-১-এর এসপি মোহাম্মদ মমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, আশুলিয়া ও সাভারে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ ও বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। বিকেলে দুই এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল।

গাজীপুর: সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মহানগরীর সাইনবোর্ড এলাকায় শ্রমিকরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। এ সময় পুলিশের সঙ্গে তাদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও বিজিবি সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়ে শ্রমিকদের সরিয়ে দেয়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বাসন থানার ভোগরা এলাকায় শ্রমিকরা মহাসড়ক অবরোধ করলে সেখানেও একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। কালিয়াকৈরের রতনপুরেও শ্রমিকরা অবস্থান নেন। আন্দোলনের কারণে অর্ধশতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়।

এদিকে শ্রমিক তৌফিক মিয়ার মৃত্যুর প্রতিবাদে গাজীপুর সদর উপজেলার বাংলা বাজার এলাকায় লায়লা স্টাইলস লিমিটেডসহ কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা বিক্ষোভ মিছিল করেন। চান্দনা চৌরাস্তায় গায়েবানা জানাজার আয়োজন করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। নেতারা বক্তব্য শেষে জানাজা পড়তে গেলে পুলিশ ও বিজিবি সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে।

এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা আলী নাসের খান অভিযোগ করেন, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বাধা দিয়ে জানাজা পড়তে দেওয়া হয়নি। তিনি তৌফিকের মৃত্যুর বিচার ও শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান।

গাজীপুর শিল্পপুলিশের এসপি মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন জানান, গাছা থানা এলাকায় শ্রমিকরা রাস্তায় এসেছিল। পরে তাদের টিয়াল শেল ছুঁড়ে সরিয়ে দেওয়া হয়।

নারায়ণগঞ্জ: নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা জড়ো হয়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়কের দিকে এগোতে চাইলে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় শ্রমিকরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়ে। জবাবে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে। কয়েকটি কারখানায় ভাঙচুরের চেষ্টাও হয়। পরে পরিস্থিতি শান্ত হলে সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদী বলেন, শ্রমিকদের বোঝানোর চেষ্টা করা হলেও তারা সড়কে ওঠার চেষ্টা করেন। এ ঘটনায় চারজনকে আটক করা হয়েছে। তবে বিসিক ও আদমজী ইপিজেড এলাকায় পরিস্থিতি শান্ত ছিল।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত