পোশাকশ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও পরিবারের মৌলিক চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে নতুন ন্যূনতম মাসিক মজুরি নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। একই সঙ্গে ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে নতুন মজুরি কার্যকর করাসহ নবগঠিত মজুরি বোর্ডের কাছে ১৫ দফা দাবি তুলে ধরেছে দলটি।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দুপুরে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানান দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি কোনো অনুগ্রহ নয়, বরং এটি তাদের শ্রমের ন্যায্য অধিকার। শ্রমিকদের শ্রম ও উৎপাদনের ওপর ভিত্তি করেই শিল্প ও অর্থনীতি গড়ে উঠেছে। তাই শ্রমিকদের জীবনমান উপেক্ষা করে শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
এ সময় মজুরি বোর্ডের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তার অভিযোগ, সরকার নিরপেক্ষ মজুরি বোর্ড গঠনের কথা বললেও এতে জাতীয় শ্রমিক দলের নেতা এবং ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অথচ বিরোধী দলের শ্রমিকসংগঠন বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কোনো প্রতিনিধিকে বোর্ডে রাখা হয়নি।
জামায়াতের ১৫ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে নিহত শ্রমিক তৌফিক শেখের মৃত্যুর ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে আহত শ্রমিকদের সুচিকিৎসা এবং নিহত শ্রমিকের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে দলটি।
কারখানা ও যানবাহনে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, নাশকতা ও সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার কথাও বলা হয়েছে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে শ্রমিকদের ওপর অযাচিত বলপ্রয়োগ, নির্যাতন, হয়রানি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন বন্ধের দাবি জানানো হয়েছে।
চলমান শ্রম অসন্তোষের ঘটনায় গ্রেপ্তার নিরপরাধ শ্রমিক ও শ্রমিকনেতাদের অবিলম্বে মুক্তি এবং হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের দাবিও রয়েছে। সাধারণ শ্রমিকদের ওপর হামলা ও নির্যাতন বন্ধের পাশাপাশি শিল্পাঞ্চলে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে দলটি।
সংকট নিরসনে সরকার, মালিকপক্ষ, শ্রমিক প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে দ্রুত কার্যকর সংলাপ আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছে জামায়াত। এ ছাড়া নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগ কিংবা স্বার্থান্বেষী মহলের উসকানি, ষড়যন্ত্র ও নাশকতার অপচেষ্টা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রতিরোধের দাবি জানানো হয়েছে।
বন্ধ কারখানাগুলো দ্রুত চালু করা, শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এবং তাদের স্বাভাবিকভাবে কর্মস্থলে ফিরিয়ে নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। পাশাপাশি বেআইনিভাবে শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ এবং কালোতালিকাভুক্ত শ্রমিকদের বিষয়টি পর্যালোচনা করে পুনরায় কাজের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে দলটি।
শ্রমিকদের বকেয়া বেতন, ভাতা, অতিরিক্ত কাজের পারিশ্রমিক ও অন্যান্য আইনগত পাওনা দ্রুত পরিশোধের পাশাপাশি ন্যায্যমূল্যে খাদ্যসামগ্রী সরবরাহে রেশনিং ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের দাবিও রয়েছে।
এ ছাড়া নারী শ্রমিকদের জন্য স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে জামায়াত। পোশাকশিল্প, শ্রমিকদের চাকরি, মালিকদের বিনিয়োগ এবং জাতীয় অর্থনীতি রক্ষায় শ্রমিক-মালিকসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ও ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছে দলটি।
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের নায়েবে আমির মাওলানা আনম শামসুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, হামিদুর রহমান আযাদ, মাওলানা আবদুল হালিম ও এহসানুল মাহবুব জুবায়েরসহ কেন্দ্রীয় ও মহানগর পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।