এক মাসের বেশি সময় কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পেয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান। আজ মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকাল ১০টার দিকে কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি।
পরে রাজধানীর ২৯ মিন্টো রোডে জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের বাসভবনে যান তিনি। সেখানে তাঁকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান দলের নেতারা। এ সময় আখতারুজ্জামানের কারাবাস, গ্রেপ্তার ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে কথা বলেন জামায়াত আমির।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘বিশৃঙ্খল বাংলাদেশে পাহাড়সম ব্যর্থতা, অযোগ্যতা ও অদক্ষতা চাপা দেওয়ার জন্য এখন বিরোধী দলকে অপপ্রচারের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হচ্ছে। কিন্তু মনে রাখবেন, যে সাপ আপনারা নাচাচ্ছেন, সেই সাপই একদিন ছোবল দেবে। ছোবল দিয়ে সাপ পালিয়ে যাবে, আপনাদের মরদেহ পড়ে থাকবে।’
তিনি বলেন, সংসদেও তাঁরা বসন্তের কোকিলদের কথা বলেছেন। যারা বসন্তকালে কুহু কুহু করতে এসেছে, বসন্ত পার হলে তাদের আর দেখা যাবে না। গ্রীষ্ম কিংবা বর্ষাকালে তাদের খুঁজে পাওয়া যাবে না। বিরোধী দলের চরিত্রহনন না করে সরকারের উচিত নিজেদের ব্যর্থতা দূর করা। অতীতের মতো প্রতিবাদী কণ্ঠ দমিয়ে রাখার চেষ্টা করলে তা সফল হবে না। জনগণ আর ফ্যাসিবাদ মেনে নেবে না।
আখতারুজ্জামানের মামলার প্রসঙ্গ তুলে জামায়াত আমির বলেন, তিনি কারও গায়ে হাত দেননি। অথচ তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা ও কর্মকর্তার গায়ে হাত দেওয়ার অভিযোগে মামলা করা হয়েছে। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে, নিম্ন আদালতে জামিন দেওয়া হয়নি। হাইকোর্টে জামিন পাওয়ার পরও রাষ্ট্রপক্ষ চেম্বার আদালতে বিষয়টি নিয়ে গেছে। এসব ঘটনাকে লজ্জাজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, আখতারুজ্জামানকে চোখ বেঁধে নেওয়া হয়েছে, মাথায় হেলমেট ও বুকে সেফটি ভেস্ট পরানো হয়েছে। এত কিছুর পরও তাঁকে নিম্ন আদালত থেকে জামিন দেওয়া হয়নি। এক মাস কারাগারে রেখে প্রতিবাদী কণ্ঠ স্তব্ধ করার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু তাঁকে আটকে রাখা যায়নি। তিনি বলেন, জেল তো অনেক খেটেছেন, প্রতিবাদও করেছেন; কিন্তু সব সময় সঙ্গে সঙ্গে ফল পাওয়া যায়নি। আখতারুজ্জামান এক মাসের কারাবাসের বিনিময়ে বিমানবন্দরের অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সুফল পেয়েছেন।
এ সময় আখতারুজ্জামানও কারাগারে থাকার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। রিমান্ডে নেওয়ার পর চোখ বেঁধে তাঁকে জামায়াত সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্ন করা হয়েছে কেন, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি। জিজ্ঞাসাবাদের ধরন এবং ডিবি পুলিশের ভূমিকা নিয়েও কথা বলেন। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, বিমানবন্দরের একটি ঘটনার মামলায় গ্রেপ্তারের পর তাঁকে যেভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, তার সঙ্গে মামলার অভিযোগের সম্পর্ক কী। এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে তিনি জামায়াত আমিরের সঙ্গে আলোচনা ও তাঁর নির্দেশনা নেওয়ার কথা জানান।
মিন্টো রোডে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়রপ্রার্থী মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়রপ্রার্থী সাদিক কায়েমসহ দলের নেতারা।
এর আগে কারাগার থেকে মুক্তির সময় আখতারুজ্জামানকে ফুল দিয়ে বরণ করেন নেতাকর্মীরা। কারাফটকে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি মাহফুজুর রহমান, ঢাকা জেলা আমির মাওলানা দেলোয়ার হোসেন, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি ও সংসদ সদস্য কামাল হোসেন, সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদীন, ঢাকা মহানগরী উত্তরের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক আতাউর রহমান সরকার এবং আইনজীবী শেখ মো. রোকন রেজা।
কারামুক্তির পর জেলগেটে আখতারুজ্জামান বলেন, ‘সত্যের রাজনীতি কখনো পরাজিত হবে না। ন্যায়ের রাজনীতি কখনো পরাজিত হবে না। সময় লাগতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত জয় সত্যের হবেই হবে, ন্যায়ের হবেই হবে।’ তিনি বলেন, তাঁরা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রাজনীতি করেন এবং মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশের চেতনা বাস্তবায়নে কাজ করতে চান। জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে থাকার প্রত্যয়ও জানান তিনি। নেতাকর্মীদের উপস্থিতি তাঁকে শক্তি জুগিয়েছে উল্লেখ করে তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। মামলার বিষয়ে বিস্তারিত সত্য প্রকাশের আগে দলের আমিরের সঙ্গে আলোচনা করবেন বলেও জানান।
বিমানবন্দরে লাগেজ ও ট্রলি সংকটের প্রতিবাদ প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, আখতারুজ্জামানের প্রতিবাদের পর পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। ঘটনার পরপরই দুই কর্মীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। পরে দুই দফায় ৩০০টি নতুন ট্রলি যুক্ত করা হয়েছে। লাগেজ চুরি ও ব্যাগ কাটার অভিযোগ ঠেকাতে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কর্মীদের শরীরে বডি ক্যামেরা সংযুক্ত করা হয়েছে। তাঁর দাবি, এখন ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে যাত্রীরা লাগেজ পাচ্ছেন। সাধারণ যাত্রী ও প্রবাসীদের ভোগান্তি নিয়ে আখতারুজ্জামানের প্রতিবাদ কাজে এসেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
উল্লেখ্য, গত ১ অক্টোবর সৌদি আরবের মদিনা থেকে আসা জামায়াতের প্রতিনিধিদল ও অন্য যাত্রীদের লাগেজ এবং জমজমের পানি পেতে বিলম্ব হওয়াকে কেন্দ্র করে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উত্তেজনা দেখা দেয়। ট্রলি সংকট নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন যাত্রীরা। এ সময় বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদের সঙ্গে আখতারুজ্জামানের বাগ্বিতণ্ডা হয়। ঘটনার পর বিমানের দুই কর্মীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পরদিন ২ অক্টোবর সরকারি কাজে বাধা, কর্মকর্তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও নিরাপত্তাকর্মীকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে করা মামলায় রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বাসা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। পরদিন আদালত তাঁকে এক দিনের রিমান্ডে পাঠান। রিমান্ড শেষে ৪ অক্টোবর আদালতে হাজির করা হলে তাঁর জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে নিম্ন আদালতেও জামিন পাননি তিনি। ১ নভেম্বর হাইকোর্ট তাঁকে জামিন দেন। রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পর ২ নভেম্বর আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত কোনো আদেশ না দেওয়ায় হাইকোর্টের জামিন বহাল থাকে। এরপর আজ কারামুক্ত হন তিনি।