১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন গঠিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। যে দলের উদ্দেশ্য ছিল ভারতের বিভিন্ন জায়গায় প্রদর্শনী ম্যাচ খেলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন ও তহবিল সংগ্রহ। সেই স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের মূল উদ্যোক্তা, সাবেক ফুটবলার সাইদুর রহমান প্যাটেল চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলসের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায় বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় আনুমানিক বিকেল পাঁচটা থেকে সোয়া পাঁচটার দিকে তাকে মৃত ঘোষণা করেন কর্তব্যরত চিকিৎসকরা।
শেষ দু'দিন তিনি আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। প্যাটেলের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন তাঁর শ্যালিকা ডা. লাভলী।
এক বছর আগে তার শরীরে বাসা বেঁধেছিল ক্যানসার। এরপর থেকেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন ছিলেন। হাসপাতালের বেডে শুয়েও অবশ্য দেশের কথা ভাবতেন প্যাটেল। নিজের ফেসবুকে পেইজে শেষ দিকের পোস্টগুলোতেই বোঝা যায় দেশের প্রতি তাঁর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। ২৭ জুলাই, ২০২৪। ঢাকাসহ সারা দেশে চলেছ ছাত্র জনতার বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন। হাজার মাইল দূরের হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে প্যাটেল মিরপুর ১০ গোলচত্ত্বরের ওভারব্রিজ ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে দুস্কৃতিকারীদের দেওয়া আগুনে পোড়ার একটি ছবি আপলোড করে লিখেছিলেন, 'এমন দৃশ্য বেঁচে থেকে দেখে যাবো তা স্বপ্নেও কখনও ভাবিনাই। হে মহান আল্লাহ্ আপনি আমাদের প্রাণ প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে ষড়যন্ত্রকারিদের হাত থেকে রক্ষা করেন আমিন।"
সদাহাস্যজ্জ্বল প্যাটেল এখন আর নেই। তবে তার নাম দেশের ফুটবলতথা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গঠনের ভাবনাটা যে তার মাথাতেই এসেছিল সবার আগে। একটি সাক্ষাৎকারে দল গঠনের বিবরণ প্যাটেল দিয়ে গেছেন এভাবে, 'মে মাসের মাঝামাঝি। আমরা তখন কলকাতায় সুবোধ সাহার বাসায়। হঠাৎ চিন্তা আসে ফুটবল খেলোয়াড় হিসেবে কীভাবে স্বাধীনতাযুদ্ধে অবদান রাখতে পারি। মনে মনে তখনই একটা ফুটবল দল গঠনের ইচ্ছা জাগে। সে দলের খেলা থেকে যে অর্থ আসবে তা দিয়ে দেওয়া হবে মুক্তিযুদ্ধের তহবিলে। স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গড়তেও বিরাট ভূমিকা রাখবে সেটি।'
দেশ ছেড়ে তার আগেই যুদ্ধের ট্রেনিং আগরতলা হয়ে কলকাতায় গিয়েছিলেন প্যাটেল। সঙ্গী চিলেন তিন বন্ধু। দল গঠনের ভাবনাটা বন্ধুদের জানান প্যাটেল, 'পরিকল্পনাটা জানালাম সবাইকে। শুনে লুৎফর রহমান বলে পাগল হয়েছিস। দেশে পাকিস্তানিরা লাখ লাখ লোক হত্যা করছে, মা-বোনদের টর্চার করছে। আর তুই এখানে ফুটবল খেলবি?। এর জবাব প্যাটেল তখন বলেছিলেন, 'মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে পয়সা পাবো সেটা দিয়ে দিবো মুক্তিযোদ্ধাদের তহবিলে। এর চেয়ে বড় কাজ আর কী হতে পারে!'
এরপর প্যাটেল নিজ উদ্যোগে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব তুলে ধরেন এবং নেতাদের বিষয়টি বোঝাতে সক্ষম হন। অস্থায়ী সরকারের সম্মতি পেয়ে প্যাটেল দল গঠনের উদ্যোগ নেন। শুরুতে নাম ছিল বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতি।
সে সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র পরিচালিত হতো কলকাতা থেকে। দল ২৫ জুলাই থেকে খেলা শুরুর পর মানুষের মুখে মুখে হয়ে যায় স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। দল গঠন নিয়ে আরেক সাক্ষাৎকারে প্যাটেল বলেছিলেন, 'আমিই তখন একমাত্র খেলোয়াড়। কলকাতার রাস্তাতে দেখা হয় আবাহনীর আশরাফ (শেখ আশরাফ আলী) ভাইয়ের সঙ্গে। উনি খেলতে আগ্রহী হলেন। জানালেন ট্রামে তার সঙ্গে দেখা হয়েছে প্রতাপ শংকর হাজরার, আলী ইমাম আছেন মোহনবাগান ক্লাবে, ইস্ট বেঙ্গলে আছে ওয়ারীর লুৎফর।
এরই মধ্যে বন্ধু মঈন সিনহাকে পাঠালাম ঢাকায়। সে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঢাকায় গিয়ে বিখ্যাত খেলোয়াড় শাহজাহান, লালু ও সাঈদকে নিয়ে চলে আসে কলকাতায়। এদিকে খেলোয়াড় আহ্ববান করে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রতিনিয়ত ঘোষণা দেওয়া হচ্ছিল। তা শুনে আগরতলায় আসেন অনেকেই। নওশের, সালাউদ্দিন, এনায়েত, আইনুল হক ভাই ছিলেন নামকরা খেলোয়াড়। ভারত সরকারের সহযোগিতায় আগরতলা থেকে তাদেরও আনা হয় বিমানে। আমি গেলাম আলী ইমাম ও প্রতাপ দা’কে আনতে। আরও অনেককে নিয়ে এভাবেই গঠিত হয়ে যায় দল। জাকারিয়া পিন্টু ভাইকে অধিনায়ক, প্রতাপ দা'কে সহ-অধিনায়ক এবং তানভীর মাজহার তান্না বেশ স্মার্ট ছিল বলে তাকে করা হয় ম্যানেজার।'
নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগর মাঠে ২৫ জুলাই নদীয়া একাদশের বিপক্ষে ম্যাচের আগে প্রথমবারের মতো লাল-সবুজ পতাকা নিয়ে এই দল মাঠ প্রদক্ষিণ করে এবং জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় যাত্রা। এই দলটি ভারতের বিভিন্ন জায়গায় ১৬টি ম্যাচ খেলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন করে এবং বড় একটা তহবিল সংগ্রহ করে জমা দেয় মুক্তিযোদ্ধাদের তহবিলে।
প্যাটেলের ঘনিষ্ঠর মৃত্যুর খবরটি এই প্রতিবেদকের কাছ থেকে জানার পর কিছুক্ষণ চুপ থাকেন বন্ধু মঈন সিনহা। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গঠনে ভূমিকা রাখা এই সংগঠক বলেন, 'আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে হারিয়ে আর আমি বাকরুদ্ধ। সে ছিল স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের প্রথম উদ্যোক্তা। সে না থাকলে হয়তো এই ইতিহাস গড়া হতো না।'
জাতীয় দলের সাবেক তারকা শেখ আশরাফ আলী প্যাটেলের মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করে বলেন, 'আমি গেন্ডারিয়া থাকতাম। ও ছিল আমার ভীষণ প্রিয় ছোটভাই। ওর চলে যাওয়া আমার জন্য অনেক কষ্টের। ওই আমাকে প্রস্তাব দিয়েছিল দলে যোগ দিতে। ওর কথাতেই আমি যোগ দেই। এরপর তো আরও অনেকেই দলে আসেন।'
প্যাটেল চলে গেলেন। তবে ইতিহাস থেকে নামটি কখনই মোছা সম্ভব নয়। তার মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন।