বাংলাদেশের ফুটবলে বাঁকবদলের বছর

আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:২৩ এএম

জাতীয় স্টেডিয়াম, ফুল ভলিউম, লাউড স্পিকারে বাজছে গান, সঙ্গে গলা মেলাচ্ছেন গ্যালারি ভরা দর্শক। স্পিকার ছাপিয়ে গলার আওয়াজটাই কানে বাজছে বেশি। অথচ ৯০ মিনিটের ফুটবল ম্যাচ শেষ হয়ে গেছে ততক্ষণে। কিন্তু স্টেডিয়াম ছাড়েননি কেউ। ভারতকে হারানো গেছে ২২ বছর পর। উদযাপনটা যেন জমা ছিল এতদিন। জুনের ভ্যাপসা গরমে সিঙ্গাপুরের সঙ্গে হয়নি, শরতের রাতে হংকং-এর বিপক্ষে হতে হতেও হয়নি। নভেম্বরে আর হয়নি নড়চড়। ম্যাচ জিতে বাংলাদেশ কোচ হাভিয়ের কাবরেরা যখন মাঠ ছাড়ছেন তখন প্রশ্ন থাকল একটাইÑ এই দেখাই কি শেষ দেখা? 

ফুটবলে বছরটা বিশ্বকাপের। বাংলাদেশের জন্য উইমেনস এশিয়ান কাপের। কিন্তু বাংলাদেশ মেনস টিমের জন্য কী? নতুন বছরে ঘুরে-ফিরে সে প্রশ্ন যেমন তোলা, জবাব অজানা। বাংলাদেশের একটা ম্যাচের ফিকশ্চার নির্ধারিত। বছরের প্রথম উইন্ডোতে সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে ম্যাচ। মার্চের ৩১ তারিখ ওই ম্যাচের পর বোঝা যাবে এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের পয়েন্ট টেবিলে কোন অবস্থানে থেকে শেষ করবে বাংলাদেশ। কাবরেরার সঙ্গে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের চুক্তির মেয়াদও ওইদিন পর্যন্তই। 

এরপর? নতুন কোচ আসবেন? কে হবেন নতুন কোচ? তার জন্য চ্যালেঞ্জ কী হবে? একটা দলে হামজা চৌধুরী, শামিত সোমদের মতো ফুটবলার আছেন। যারা এশিয়ার যে কোনো দলে খেলতে পারেন নিমেষেই। আবার সেই একই দলের বেশিরভাগ ফুটবলারের ক্লাব ফুটবলের গণ্ডি দেশ বাংলাদেশেই সীমিত। আপার লিমিট আর লোয়ার লিমিটের এই তফাৎ ঘুচিয়ে কে পারবেন এই দলকে এক সুতোয় গাঁথতে? এমন একজন কোচ বাছাই করাই সম্ভবত নতুন বছরে বাংলাদেশের ফুটবলে সবচেয়ে বড় কাজ।

বছরটা বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য ভিত্তি গড়ার। প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ এখন পর্যন্ত ওই একটাই। এশিয়ান গেমসে নারী দল অংশ নিচ্ছে, পুরুষ ফুটবল দলের সুযোগ মেলেনি। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপেরও সময়সূচি জানা যায়নি। তবে, এ বছর সাফ না হলে দুই বছর বিরতির টুর্নামেন্ট পড়বে লম্বা সেশন জটে। সাফের আসর এবার না হলে বরং সেটাই হবে অবাক করা। 

ভারতকে হারানোর পর বাংলাদেশ ফুটবলারদের মনেও আত্মবিশ্বাস থাকার কথা তুঙ্গে। সাফের সময়সূচি নিয়ে ধোঁয়াশা থাকলেও এবার টুর্নামেন্টের ফেভারিট দলটার নাম আর ভারত নয়, বাংলাদেশ। যে বছরটা বিশ্বকাপের, সে বছরটা হতে পারে বাংলাদেশের দক্ষিণ এশিয়ার ‘বিশ্বকাপ’ জয়ের। ২০০৩ একবারই সাফ জিতেছিল বাংলাদেশ, এর পরের আসরে রানার্স আপ। এর পর থেকে আর ফাইনালেই ওঠা হয়নি। সেই খরা ঘোচানোর মোক্ষম সুযোগ এবারই। ভারতের বিপক্ষে জয়ের পর যে আনন্দ ছুঁয়েছে গোটা দেশকে, একবার ভাবুন, হামজারা সাফ জিতলে সেই উদযাপন কোথায় গিয়ে ঠেকবে? 

তবে আনন্দের আতিশয্যে ভেসে যাওয়ার জন্য নয়, বাংলাদেশের নিজ প্রয়োজনেই দরকার টুর্নামেন্ট জেতা। সিঙ্গাপুর আর সাফ বাদ দিলে ২০২৬-এ বাংলাদেশের বাকি ম্যাচগুলো হওয়ার কথা ফ্রেন্ডলি। সেই ম্যাচগুলো জেতা গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের জন্য। প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ জিতলে পয়েন্ট বেশি, ফ্রেন্ডলিতে কম। সাফ প্রতিযোগিতামূলক টুর্নামেন্ট বটে, কিন্তু র‍্যাংকিং-এ পয়েন্টের হিসাবে সেটা ফ্রেন্ডলি জয়ের কাতারে। তাই সিঙ্গাপুরের সঙ্গে অ্যাওয়ে ম্যাচের প্রভাবটা অন্তত র‍্যাংকিং-এর ক্ষেত্রে বেশি। আর এই র‍্যাংকিং-এর ওপর নির্ভর করবে ২০২৭ সালে শুরু হওয়া ২০৩০ বিশ্বকাপ বাছাইয়ে বাংলাদেশের ভাগ্য। ‘নাই, নাই’ করেও হামজাদের সামনে তাই অনেক সমীকরণ। ভবিষ্যৎ নির্ধারণের বছর তাই এবার। 

বাংলাদেশ ফুটবলের জোয়ারের আঁচ গোটা বিশ্বের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাংলাদেশিদের গায়েও লেগেছে। হামজাদের দেখে এখন অনেকেই আগ্রহী। কিন্তু যাচাই-বাছাই আর যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাফুফের প্রয়োজন ভিন্ন একটি উইং। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতরে এই পদ্ধতি না এলে ‘সিন্ডিকেট’ শব্দটার চর্চা এড়ানো কঠিনই হয়ে যেতে পারে। 

জাতীয় দল নিয়ে বছরের শুরুতে এসব ভাবনার চল আগেও ছিল। ফুটবলের নতুন দিনে মানুষের আগ্রহ বেড়েছে কেবল। কিন্তু বরাবরের মতো এসব আলাপে আড়ালেই থেকে যায় ঘরোয়া ফুটবল। অথচ হওয়ার কথা ছিল উল্টোটা। মানুষ বাঁচে আশায়, কিন্তু সে স্বপ্ন দেখানোর মতো সাহসটুকুও বাংলাদেশের ঘরোয়া ফুটবল দিতে পারবে কি? আলাদিনের চেরাগ পাওয়ার মতো কিছু না ঘটলে, ঘরোয়া ফুটবলের দুষ্টচক্র ভাঙার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। আশা একটাই, জাতীয় দল নিয়ে চলা উন্মাদনার ঢেউ যদি লাগে কর্তাদের গায়ে! 
লেখক : ফুটবল ধারাভাষ্যকার ও বিশ্লেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত