ক্রিকেট ইতিহাসে অলরাউন্ডারদের অনেক নাম শোনা যায়—কিথ মিলার, গ্যারি সোবার্স, মাইক প্রোক্টর, ইমরান খান, কপিল দেব, রিচার্ড হ্যাডলি কিংবা ইয়ান বোথাম। কিন্তু প্রথম ব্যক্তি, যিনি এক টেস্টে সেঞ্চুরি এবং দশ উইকেটের ডাবল সম্পন্ন করেছিলেন, তাদের কেউ নন। এই রেকর্ড গড়েছিলেন একজন নারী—অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি বেটি উইলসন।
১৯৪০ ও ৫০-এর দশকে, যখন অস্ট্রেলিয়ার ক্রীড়াঙ্গনে ডন ব্র্যাডম্যান, বিল ও’রিলি, কিথ মিলার ও রে লিন্ডওয়ালের নাম আলোচনায় থাকত, উইলসনও ছিলেন এক জনপ্রিয় চরিত্র। তাঁর অসাধারণ ব্যাটিংয়ের কারণে তাঁকে বলা হতো 'নারী ব্র্যাডম্যান'।
উইলসনের এই অনন্য কীর্তি আসে তার ক্যারিয়ারের শেষ সিরিজে, ১৯৫৭-৫৮ মৌসুমে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। মেলবোর্নের সেন্ট কিল্ডা গ্রাউন্ডে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে, ৩৭ বছর বয়সী উইলসন নিজের ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় পারফরম্যান্স উপহার দেন। সেই ম্যাচের সূচনা হয় এক অদ্ভুত দৃশ্যের মাধ্যমে—রাতের বৃষ্টির কারণে দেরিতে শুরু হওয়া ম্যাচে প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া মাত্র ৩৮ রানে অলআউট হয়, যেখানে উইলসন সর্বোচ্চ ১২ রান করেন। ইংল্যান্ড তখন হাসছিল, তবে বেশি সময় লাগেনি তাদের হাসি মিলিয়ে যেতে। উইলসনের দুর্দান্ত স্পিনে ইংল্যান্ড মাত্র ৩৫ রানে অলআউট হয়ে যায়। তিনি নিয়েছিলেন ৭ উইকেট মাত্র ৭ রানে, যার মধ্যে ছিল নারীদের টেস্ট ইতিহাসের প্রথম হ্যাটট্রিক।
এরপর দ্বিতীয় ইনিংসে উইলসন ব্যাট হাতে তুলে নেন সেঞ্চুরি, এরপর বল হাতে আরও ৪ উইকেট নিয়ে ইতিহাস গড়েন—এক টেস্টে সেঞ্চুরি ও ১০ উইকেটের ডাবল সম্পন্ন করা প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে!
তা হঠাৎ করেই কেন উঠে আসছে তার প্রসঙ্গ। কারণ মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডের আঙিনায় তার একটি ভাষ্কর্য স্থাপনের জোরালো দাবি উঠেছে। কেন সেই প্রসঙ্গ আসছে একটু পরই।
২০০৮ সালে, ৮৬ বছর বয়সেও উইলসন ছিলেন মনে সতেজ। মেলবোর্নের এক উজ্জ্বল রবিবার সকালে ক্রিকইনফোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্মৃতিচারণ করেন তিনি, 'আমি তখনও খুব সক্রিয় ছিলাম, পুরোপুরি উজ্জীবিত ছিলাম, এবং সেটাই ছিল আমার ক্যারিয়ারের সেরা বছর।'
পাহাড়সম স্মৃতিশক্তির অধিকারী উইলসন সেদিন সময়মতো পৌঁছে যান সাক্ষাৎকারস্থলে, যদিও ক্লিফটন হিল থেকে সাউদার্ন ক্রস স্টেশন পর্যন্ত আধঘণ্টার ট্রামের ধকল তাকে নিতে হয়েছিল। হাঁটুতে ব্যথা ছাড়া আর কোনো ক্লান্তির ছাপ ছিল না তার শরীরে।
নীল রঙের পোশাক ও ক্রিম-রঙা কোট পরে হাসিমুখে উইলসন বলেছিলেন, 'আমি লন বোলস খেলি। এটা দারুণ বুদ্ধির খেলা, যেখানে প্রতিপক্ষকে পর্যবেক্ষণ করে বল ফেলতে হয়।' ক্রিকেট খেলাকালীন সময়েও তিনি মাইন্ড গেমস খেলতে পছন্দ করতেন।
উইলসনের ক্রিকেট-জীবন শুরু হয় খুব অল্প বয়সেই। ১০ বছর বয়সে তিনি ক্লিফটন হিলের মেয়র পার্কে খেলার সময় একটি টেনিস বল ফেরত ছুঁড়ে মেরে দর্শকদের নজর কাড়েন। সেখান থেকেই তাকে ডেকে নেওয়া হয় কলিংউড উইমেন’স ক্রিকেট ক্লাবে, যেখানে তিনি প্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে খেলতে শুরু করেন।
১৪ বছর বয়সে তিনি ভিক্টোরিয়ার জুনিয়র দলে সুযোগ পান, আর ১৬ বছরেই জায়গা করে নেন রাজ্য দলে। তার সাফল্যের রহস্য ছিল সহজাত প্রতিভা ও মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা। উইলসন বলেন, 'আমি ছিলাম মিডিয়াম-পেস বোলার, তবে বল যেখানে চাইতাম সেখানে ফেলতে পারতাম।' ব্যাটিংয়েও তিনি ছিলেন কার্যকর, দ্রুত রান নেওয়ার পাশাপাশি শট খেলার দক্ষতা ছিল তার অনন্য।
প্রথম টেস্টে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তিনি করেন ৯০ রান এবং নেন ১০ উইকেট। দ্বিতীয় টেস্টেই তিনি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে প্রথম অস্ট্রেলীয় নারী হিসেবে এই কীর্তি গড়েন, সঙ্গে নেন ৯ উইকেট।
তবে বিশ্বযুদ্ধ তার ক্যারিয়ারে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যুদ্ধের কারণে অনেক বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বন্ধ থাকায় তার ক্যারিয়ার মাত্র ১১টি টেস্টেই সীমাবদ্ধ রয়ে যায়।
তবে উইলসনের প্রতিভা কিংবদন্তি ক্রিকেটারদের নজর এড়ায়নি। একবার বিল পন্সফোর্ড তার ব্যাটিং দেখে তাকে অটোগ্রাফ করা ব্যাট উপহার দেন। ব্র্যাডম্যানও একবার তার খেলা দেখে মুগ্ধ হন এবং প্রশংসা করেন।
উইলসন বলেন, 'আমি পুরুষ ক্রিকেটারদের দেখে খেলাটা শিখেছিলাম। লিন্ডওয়ালের বোলিং, মিলারের স্বতঃস্ফূর্ততা আর লিন্ডসে হাসেটের লেট কাট আমি খুব পছন্দ করতাম।'
১৯৫১ সালে ইংল্যান্ড সফরে হেডিংলিতে ইয়র্কশায়ারের বিপক্ষে একটি ম্যাচে উইলসন সেঞ্চুরি করেছিলেন মাত্র ৭৫ মিনিটে। ম্যাচ শেষে বিখ্যাত ইংল্যান্ড বোলার ও সাংবাদিক বিল বাউস তার ইনিংসকে নারীদের ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ইনিংস হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
স্বীকৃতির অভাব ও একাকী জীবন
উইলসন কখনও প্রাপ্য স্বীকৃতি পাননি, যা পুরুষ ক্রিকেটারদের ভাগ্যে জুটেছিল। এ নিয়ে তিনি বলেছিলেন, 'আমি মিডিয়ার সঙ্গে বেশি কথা বলি না। কারণ যখন কথা বলার প্রয়োজন ছিল, তখন তারা ছিল না।'
সারা জীবন ক্রিকেটকে ভালোবেসে খেললেও, উইলসন কখনও বিয়ে করেননি। দু'বার বিয়ের কাছাকাছি গিয়েও শেষ পর্যন্ত সরে এসেছেন।
২০০৮ সালে যখন এই সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল, তখন তিনি বলেছিলেন, 'আমি এমন কিছু করিনি যা মানুষ আমাকে অতিরিক্ত বড় করে দেখবে। আমার সবই স্বাভাবিক মনে হতো।'
একটি ভাস্কর্যের দাবি
বেটি উইলসন হয়তো ক্রিকেট বিশ্বে ব্র্যাডম্যানের মতো নাম পাননি, তবে ইতিহাসের পাতায় তার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। নারীদের ক্রিকেটে তার অসামান্য অবদান এখন অনেকে ভুলে গেছে।
বর্তমানে এমসিজিতে ১৪টি ভাস্কর্য রয়েছে, তবে তার মধ্যে কোনো নারী ক্রীড়াবিদের ভাস্কর্য নেই। বেটি উইলসনের ভাস্কর্য স্থাপনের মাধ্যমে এই অসমতা দূর করার প্রচেষ্টা চলছে। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া এই বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেয়নি।
তবে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটের নতুন হল অব ফেম সদস্য ক্রিস্টিনা ম্যাথিউজ কিংবদন্তি বেটি উইলসনের সম্মানে এমসিজিতে প্রথম নারী ক্রিকেটারের ভাস্কর্য স্থাপনের আহ্বান জানিয়েছেন। গত ৩০ জানুয়ারি ঐতিহাসিক নারী অ্যাশেজ টেস্টের আগে ম্যাথিউজকে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট হল অব ফেমের ৬৫তম সদস্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তিনি মনে করেন, উইলসনের এই স্বীকৃতি অনেক আগেই পাওয়া উচিত ছিল।
বৃহস্পতিবার ম্যাথিউজ বলেন, 'সবার সাধারণ মতামত হলো, বেটি উইলসনকে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। ব্রোঞ্জ ফর বেটি' নামে একটি প্রচারণা চলছে, যাতে এমসিজি-তে তার ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়। আশা করি, এটি বাস্তবে পরিণত হবে। এসসিজিতে বেলিন্ডা ক্লার্কের ভাস্কর্য স্থাপনের মাধ্যমে পথ দেখিয়েছে, এখন এমসিজি-এর উচিত সেই পথে এগিয়ে যাওয়া।'
অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট হল অব ফেমের চেয়ারম্যান পিটার কিং বলেন, 'আজ আরেকটি ঐতিহাসিক দিনে এই ঘোষণা করা যথাযথ, যখন এমসিজি-তে ৭৫ বছরেরও বেশি সময় পর প্রথম নারী টেস্ট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ক্রিস্টিনার অসাধারণ অবদান—নারী ক্রিকেটে অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং কমিউনিটিতে এর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য—তাকে হল অব ফেমে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য যথেষ্ট যোগ্য করে তুলেছে।'
বেটি উইলসন ১৯৮৫ সালে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট হল অব ফেমের প্রথম নারী সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন এবং ২০১৭ সালে আইসিসি হল অব ফেমে স্থান পান। তাঁর সম্মানে ভাস্কর্য স্থাপনের দাবি অস্ট্রেলিয়ার নারী ক্রীড়াবিদদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তার এই কীর্তির স্বীকৃতিস্বরূপ, অনেক ক্রিকেট অনুরাগী এখন দাবি তুলেছেন মেলবোর্নে উইলসনের নামে একটি ভাস্কর্য স্থাপনের জন্য। অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে নারীদের অবদানকে স্বীকৃতি দিতে উইলসনের সম্মানে একটি ভাস্কর্য নির্মাণ হলে, সেটি হবে নারীদের ক্রিকেটের প্রতি সঠিক শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ।
দীর্ঘদিন ক্রিকেট ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকা উইলসন ২০১০ সালের ২২ জানুয়ারি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তবে তার রেকর্ড ও কীর্তি আজও ক্রিকেটপ্রেমীদের হৃদয়ে অমলিন। বেটি উইলসন ছিলেন, আছেন, এবং থাকবেন—ক্রিকেট ইতিহাসের এক অনন্য নায়িকা হিসেবে।