শরীয়তপুরে অ্যাম্বুলেন্সে নবজাতকের মৃত্যু, মামলার পর গ্রেপ্তার ১

শরীয়তপুরে নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশ ও র‍‍্যাবের যৌথ অভিযানে আসামি অ্যাম্বুলেন্সচালক রহিম দেওয়ান সবুজকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আজ শনিবার (১৬ আগস্ট) ভোর সোয়া ৫টার দিকে সদর উপজেলার বেড়া চিকন্দি এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। দুপুরে তাকে আদালতের হাজত খানায় পাঠানো হয়েছে। সবুজের বিরুদ্ধে ১০দিনের রিমান্ড চেয়েছে পুলিশ।

এর আগে শুক্রবার রাতে নবজাতকের বাবা নূর হোসেন সরদার বাদী হয়ে পালং মডেল থানায় ৪ জনের নাম উল্লেখ করে ৫ থেকে ৬ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে একটি মামলা করেন। আটক রহিম দেওয়ান সবুজ (২৮) সদর উপজেলার ধানুকা এলাকার আবু তাহের দেওয়ানের ছেলে।

পুলিশ ও মামলা সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার দুপুরে অস্ত্রপ্রচারের মাধ্যমে শরীয়তপুর শহরের নিউ মেট্রো ক্লিনিকে জন্ম নেয় ডামুড্যা উপজেলার কনেশ্বর ইউনিয়নের ছাতিয়ানি এলাকার রুমা বেগম ও নূর হোসেন সরদার দম্পতির ছেলে। জন্মের পর শ্বাসকষ্ট দেখা দেয় নবজাতকের। পরে সদর হাসপাতালে ভর্তি করলে কর্তব্যরত চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা প্রেরণ করেন। পরে ৫ হাজার টাকায় একটি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে ঢাকার পথে রওয়ানা হন স্বজনরা। তখন স্থানীয় অ্যাম্বুলেন্স চালক রহিম দেওয়ান সবুজ তার বাবা আবু তাহের দেওয়ান ও তাদের সহযোগীরা অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখেন। বাইরের অ্যাম্বুলেন্সে কেন রোগীকে নেওয়া হচ্ছে, তাই এমন কথা বলে কেরে নেওয়া হয় চালকের চাবি। দীর্ঘ সময় তর্কাতর্কি ও ধস্তাধস্তির মধ্যে চিকিৎসা না পেয়ে অ্যাম্বুলেন্সে মৃত্যু হয় নবজাতকের।

এ ঘটনায় শুক্রবার রাতে ৪জনের নাম উল্লেখ করে ৫ থেকে ৬জনকে অজ্ঞাত আসামি করে নবজাতকের বাবা নূর হোসেন দেওয়ান বাদী হয়ে পালং মডেল থানায় একটি মামলা করেন। মামলার আসামিরা হলেন রহিম দেওয়ান সবুজ (২৮), আবু তাহের দেওয়ান (৫৫), আব্দুল হাই (৫০)  ও বিল্লাল (৪৫)।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সদর হাসপাতালসহ জেলার পাঁচটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৭টি সরকারি অ্যাম্বুলেন্স আছে। এসব অ্যাম্বুলেন্সে শরীয়তপুর থেকে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে রোগী নিতে খরচ হয় সাড়ে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা। কিন্তু জেলার ব্যক্তিগত অ্যাম্বুলেন্সে ৭ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা নিচ্ছে।

জেলা অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি আব্দুল হাই বলেন, জেলায় ২৫টির মতো ব্যক্তিগত অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। আমরা ঢাকার যেকোনও হাসপাতালে রোগী নিয়ে যেতে ৬ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা ভাড়া নিয়ে থাকি।

তিনি বলেন, ঢাকার থেকে আসা অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করছে রোগীর স্বজনরা। আসলে সবুজদের কোনও অপরাধ ছিল না। ঘটনাস্থলে সবুজ ও তার সহযোগীরা গেছে কেন? এটাই এখন অপরাধ।

জয়নাল আবেদীনসহ স্থানীয়রা বলেন, অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে জদি সিন্ডিকেট না থাকতো তাহলেতো কেউ অ্যাম্বুলেন্স আটকাতো না। অন্য এলাকার অ্যাম্বুলেন্স শরীয়তপুরের রোগী নিয়ে যাবে, যেহেতু টাকার খেলা- এটা মেনে নিতে পারেনি সিন্ডিকেটের লোকজন। অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের কারনেই নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে। আমরা এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি চাই না। আমরা জেলায় অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট মুক্ত চাই। দোষীদের আইনের আওতায় এনে বিচার দাবি করছি।

মৃত নবজাতকের বাবা নূর হোসেন দেওয়ান বলেন,  ঢাকার অ্যাম্বুলেন্সে কম টাকায় যেতে পারবে না, স্থানীয় অ্যাম্বুলেন্সে যেতে হবে বলে তারা চালকের গাড়ির চাবি কেড়ে নিয়ে যায়। এ ছাড়া চালককে মারধর করে। অনেক সময় অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখায় অ্যাম্বুলেন্সটি ছেড়ে যেতে না পারায় আমার ছেলে মারা যায়। জড়িতদের সবাইকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি। আমার সন্তানের মতো কারও সন্তান যেন অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটে পরে চিকিৎসার অভাবে মৃত্যু না হয়।

অ্যাম্বুলেন্সটির চালক মোশারফ বলেন, ঢাকার গাড়ি। আমি বিকাল ৩টার দিকে এক রোগী নিয়ে শরীয়তপুরে এসেছিলাম। এক নবজাতককে ঢাকা শিশু হাসপাতলে নিয়ে যাওয়ার জন্য তার স্বজনেরা আমার গাড়ি ভাড়া করে। শিশুর স্বজনেরা শিশুটিকে নিয়ে গাড়িতে ওঠার পর আমি গাড়ি চালু করি। এ সময় স্থানীয় অ্যাম্বুলেন্স ব্যবসায়ীরা আমাকে রোগী নিয়ে ঢাকায় যেতে বাধা দেয়। তারা আমার গাড়ির চাবি ছিনিয়ে নেয় এবং আমাকে মারধর করে অনেক সময় গাড়ি আটকে রাখে। এতে গাড়ির মধ্যেই শিশুটি মারা যায়। যা খুবই দুঃখজনক।

সদরের পালং মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। র‍‍্যাবের সহযোগিতায় যৌথ অভিযানে আসামি সবুজকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হই। তাকে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ১০দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে। এ ছাড়া শুনতে পরেছি অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট রয়েছে। এ বিষয়ে অনুসন্ধান চলমান আছে। যারা সিন্ডিকেটে জড়িত তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।