অবৈধভাবে ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে লিবিয়ায় নিয়ে যাওয়ার পর শরীয়তপুরের এক যুবক তিন মাস ধরে নিখোঁজ রয়েছেন। পরিবারের দাবি, ইতালিতে পাঠানো ও পরে লিবিয়ার একটি বন্দিশালা থেকে মুক্ত করার নামে দালালচক্রের সদস্যরা তাদের কাছ থেকে মোট ৫০ লাখ টাকা নিয়েছে। কিন্তু এত টাকা দেওয়ার পরও যুবকের কোনো সন্ধান মেলেনি। এ ঘটনায় মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছে ভুক্তভোগী পরিবার।
নিখোঁজ যুবকের নাম মানিক চোকদার (৩০)। তিনি শরীয়তপুর সদর উপজেলার আংগারিয়া ইউনিয়নের উত্তর ভাষাবচর গ্রামের দেলোয়ার হোসেন চোকদারের ছেলে।
মামলা, ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বাবার সঙ্গে গরুর খামার ও কৃষিকাজ করতেন মানিক। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরাতে বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। একই গ্রামের আমিনুল বেপারী (৩৫), তার ভাই নুরুল হক বেপারী (৩৩), এনামুল বেপারী (৪০), তাদের সহযোগী মাতুল খা (৪৮) ও শাহনুর বেগমের (৩৮) প্রলোভনে পড়ে ইতালি যাওয়ার জন্য রাজি হন।
চুক্তি অনুযায়ী ২০২৫ সালের ১৫ এপ্রিল মানিকের পরিবার প্রথম দফায় ১০ লাখ টাকা পরিশোধ করে। পরে ১৬ মে তাকে আকাশপথে ভারতের চেন্নাই হয়ে শ্রীলঙ্কায় নেওয়া হয়। সেখান থেকে ১৭ মে দুবাই ট্রানজিট হয়ে মিশরে পাঠানো হয়। মিশরে কিছুদিন রাখার পর দালালচক্র তাকে লিবিয়ায় নিয়ে যায়।
পরিবারের অভিযোগ, প্রথমদিকে ইতালিতে পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে নগদ ও বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে চুক্তির বাকি ২৫ লাখ টাকা আদায় করা হয়। পরে মানিককে লিবিয়ার একটি বন্দিশালায় আটকে রেখে নির্যাতন শুরু করা হয়। এরপর দালালচক্রের সদস্যরা জানায়, মানিককে একটি মাফিয়া চক্র আটকে রেখেছে এবং তাকে মুক্ত করতে আরও ২৫ লাখ টাকা দিতে হবে। ছেলেকে বাঁচানোর আশায় চলতি বছরের ২৫ এপ্রিল দালাল নুরুল হক বেপারীর মাধ্যমে আরও ২৫ লাখ টাকা দেয় পরিবার। এরপর থেকেই মানিকের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
নিরুপায় হয়ে মানিকের বাবা দেলোয়ার হোসেন চোকদার গত ২৮ জুন শরীয়তপুরের মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে আমিনুল বেপারী, নুরুল হক বেপারী, এনামুল বেপারী, মাতুল খা ও শাহনুর বেগমকে আসামি করে মামলা করেন। আদালতের নির্দেশে ৯ জুলাই পালং মডেল থানা পুলিশ এনামুল বেপারী ও মাতুল খাকে গ্রেপ্তার করে।
মানিকের বাবা দেলোয়ার হোসেন চোকদার বলেন, আমার ছেলে শেষবার শুধু ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে বলেছিল, ‘আব্বা, তারা যত টাকা চায় দিয়ে দেন, আমাকে বাঁচান।’ ছেলেকে মুক্ত করার জন্য ২৫ লাখ টাকা দিয়েছি। এর আগে ইতালি পাঠানোর কথা বলে আরও ২৫ লাখ টাকা নিয়েছে। কিন্তু তিন মাস ধরে আমার ছেলের কোনো খোঁজ পাচ্ছি না। আমি শুধু আমার ছেলেকে ফিরে চাই।
মানিকের মা নিনুজা বেগম বলেন, ‘তিন মাস ধরে আমার ছেলের কোনো খবর নেই। দালালরা আমার ছেলেকে কী করেছে জানি না। আমি শুধু আমার ছেলেকে ফিরে পেতে চাই।’
মানিকের চাচা বিল্লাল চোকদার বলেন, ‘আমার ভাতিজা গরুর খামার ও কৃষিকাজ করত। স্থানীয় দালালরা ইতালির প্রলোভন দেখিয়ে আমাদের কাছ থেকে ২৫ লাখ টাকা নেয়। পরে ইতালি না নিয়ে লিবিয়ায় নিয়ে মাফিয়া চক্রের কাছে বিক্রি করে দেয়। মুক্তিপণের নামে আরও ২৫ লাখ টাকা নিয়েছে। এই টাকা জোগাড় করতে আমাদের গরু বিক্রি করতে হয়েছে, জমি বিক্রি করতে হয়েছে এবং ব্যাংক ও এনজিও থেকে ঋণ নিতে হয়েছে। এখন ঋণের বোঝা বইছি, কিন্তু মানিকেরও কোনো খোঁজ নেই।’
অভিযুক্তদের বাড়িতে গিয়ে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে আসামি মাতুল খার মেয়ে ও আমিনুল বেপারীর ভাগনি তানিয়া আক্তার বলেন, ‘দালাল আমার ফুফাতো ভাই। আমার বাবা বা মামারা দালাল নন। তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করা হয়েছে। আমার জানামতে মানিক নিখোঁজও নয়।’
স্থানীয় বাসিন্দা কাশেম হোসেন বলেন, ‘ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে দালালরা এলাকার অসহায় পরিবারগুলোর কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। অনেক তরুণকে লিবিয়ায় নিয়ে মাফিয়া চক্রের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। এসব দালালের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।’
পালং মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহ আলম বলেন, ‘আদালতের নির্দেশে মানবপাচারের মামলাটি থানায় রুজু হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে টাকা লেনদেনের সত্যতা পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রাথমিক তদন্ত শেষে মামলাটি সিআইডিতে হস্তান্তর করা হবে। সিআইডি তদন্ত করে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করবে।’