‘লাম্পি স্কিন ডিজিজ’ সংক্ষেপে ‘এলএসডি’। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্তের পশুর সংখ্যা! কাঁদছে কৃষক। সরজেমিনে শুক্র, শনি ও রবিবার ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার মাওহা, অচিন্তপুর, বোকাইনগর ও সহনাটী ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, গবাদিপশুর মাঝে এলএসডি বর্তমানে মহামারি আকার ধারণ করেছে।
মহামারি প্রতিরোধে ভ্যাকসিনের প্রকট সংকট দেখা দিয়েছে। চাহিদা ৪০ হাজার হলেও উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগে প্রতি মাসে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২৫০ থেকে ৩শ ভ্যাকসিন।
এ প্রসঙ্গে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার ডা. মুহাম্মদ শিহাব উদ্দিন জানান, এটি একটি ভাইরাসজনিত রোগ। সবখানেই মহামারি আকার ধারণ করেছে। ভ্যাকসিনেরও সংকট দেখা রয়েছে। প্রাণিসম্পদ বিভাগের বর্তমান চাহিদা প্রায় ৪০ হাজার ভ্যাকসিন। কিন্তু গত এপ্রিল মাসে ৩শ এবং মার্চে ২৫০ ভ্যাকসিন পাওয়া গিয়েছিল।
তিনি আরও জানান, গত ৩ মাসে এলএসডিতে আক্রান্ত হয়ে প্রায় ২৫০টি গবাদিপশু মারা গেছে। উপজেলা পরিষদের এডিপি খাতে বিনামূল্যে ভ্যাকসিন বিতরণের জন্য একটি প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছিল। সেটি অনুমোদন হলে কিছুটা হলেও লাঘব ঘটবে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার আফিয়া আমীন পাপ্পা বলেন, উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের সঙ্গে পরামর্শক্রমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ জানায়, এ উপজেলায় গরুর সংখ্যা ৬৫ হাজার ৩৭০টি এবং ছাগল ৩৯ হাজার ৮২৩টি। এর মধ্যে কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে গরু ৪ হাজার ৩২২টি, বলদ ৩৫টি ও গাভী ১ হাজার ৬০০টি, মহিষ ৪টি, ভেড়া ১০০টি এবং ছাগল ১৩ হাজার ৩৩০টি। তবে ‘লাম্পি স্কিন ডিজিজে’ প্রতিদিনই গরু আক্রান্ত হচ্ছে। আক্রান্ত গরুর শরীরে ফোসকা পড়ছে।
কোনো গরুর পা ফুলে যাচ্ছে, কোনো গরুর গলায় ঘা হচ্ছে। কিছু আক্রান্ত গরুর চামড়ার নিচে পচন ধরেছে। ফলে এ রোগে আক্রান্ত গরুর একাধিক সমস্যা দেখা দিয়েছে।
উপজেলার মাওহা ইউনিয়নের খলদবাড়ির জুবেদ আলীর পুত্র মো. রফিকুল ইসলাম জানান, তার একটি গাভী ও একটি বাছুর আক্রান্ত হয়েছে। প্রায় ৭০ হাজার টাকা মূল্যের একটি বকনা গরু মারা গেছে। একই গ্রামের রজু মিয়ার পুত্র আব্দুল বারেকের একটি ষাঁড় বাছুর, বাবুল মিয়ার একটি গরু, তালে হোসেনের পুত্র ছমেদ আলীর একটি বকনা বাছুর, লালু মিয়ার একটি, হাছেন আলীর পুত্র হাবিবুর রহমানের একটি গাভী, ইউসুফ আলীর একটি ষাঁড় বাছুর, আদম আলীর পুত্র আমির হোসেনের একটি বাছুর, জবেদ আলীর পুত্র লাল মিয়ার একটি বাছুর মারা গেছে। কৃষক আজমত আলী জানান, সরকারি দপ্তরের কেউ আসে না; পল্লী ডাক্তারই একমাত্র ভরসা। জুয়েল মিয়া জানান, আমাদের গরু মারা মানে সর্বনাশ, তাই সরকারিভাবে এ ভ্যাকসিন প্রদানের দাবি জানাচ্ছি।
অপরদিকে বোকাইনগর ইউনিয়নের মৃত নুর আহাম্মদের পুত্র মনহর উদ্দিন জানান, ৩-৪ দিনে তার গরুর শরীরে ফোসকার মতো গুটি হয়েছে। গুটিগুলোতে স্পর্শ করলে খুব শক্ত লাগে। গরু খাওয়া-দাওয়াও ছেড়ে দিয়েছে।
সহনাটী ইউনিয়নের রাইশিমুল গ্রামের এলাই বক্সের পুত্র নুর ইসলাম জানান, গরুর পুরো শরীরে ঘায়ের মতো হয়ে গেছে। মইলাকান্দা ইউনিয়নের ষোলপাই গ্রামের মৃত ইমান আলীর পুত্র মো. আব্দুল মজিদ জানান, আস্তে আস্তে গরুর শরীরে গুটি বাড়ছে।
অনেক স্থানে পচনও ধরেছে। গবাদিপশু নিয়ে শঙ্কায় আছি। সহনাটী ইউনিয়নের যোগিরটাঙ্গুরি গ্রামের আফজাল হোসেন জানান, প্রাণিসম্পদ বিভাগ এ ব্যাপারে উদ্যোগ না নিলে আমাদের সর্বনাশ হয়ে যাবে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদের উপসহকারী আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, মশা, মাছি ও অন্যান্য কীটপতঙ্গের মাধ্যমেও ভাইরাসটি ছড়াচ্ছে। গরুর লালা, দুধ এবং খামার পরিচর্যাকারী ব্যক্তির মাধ্যমেও এটি ছড়াতে পারে।
এসব পশু জবাই ও দুধ খাওয়া নিষিদ্ধ। আক্রান্ত পশুকে আলাদা রাখা, সুস্থ গরুগুলোকে নিমপাতা ও খাবার সোডা খাওয়াতে বলা হচ্ছে। নিমপাতা বা জীবাণুনাশক দিয়ে গরুকে নিয়মিত ধৌত করা এবং রোদের তাপ লাগাতেও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।