তৈরি পোশাক খাতের সরবরাহ চেইনের প্রতিটি ধাপে কভিডের প্রভাব পড়েছে। ভোক্তা, ক্রেতা, কারখানার মালিক ও শ্রমিক- সব পক্ষই কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত’। ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে মধ্যমেয়াদি কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে সীমিত সামর্থ্যরে কারণে এসব উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। এ কারণে পুনরুদ্ধার গতি অত্যন্ত ধীর। এ পরিস্থিতি থেকে সহসাই উত্তরণের সম্ভাবনা কম। এ অবস্থায় কভিডের ক্ষতি সবপক্ষকে ভাগ করে নিতে হবে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সংলাপে এ মত দিয়েছেন বিদেশি ক্রেতা, ব্র্যান্ড প্রতিনিধি, মালিকপক্ষ, শ্রমিক প্রতিনিধি, গবেষক ও নীতিনির্ধারকরা। তারা বলেন, ব্র্যান্ড এবং ক্রেতাদের পক্ষ থেকে পোশাক রপ্তানি বাড়াতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রণোদনা সুবিধা বাড়াতে হবে। শ্রমিকদের মজুরি বাড়াতে হবে। এছাড়া কভিডসহ যেকোনো দুর্যোগে যাতে কাঁচামাল প্রাপ্তি নিয়ে সমস্যা না হয় সে বিষয়ে উপআঞ্চলিক কর্মকৌশল নিতে হবে।
গতকাল শনিবার অনলাইনে অনুষ্ঠিত সংলাপে ‘কভিড সংকট থেকে পোশাক খাতের পুনরুদ্ধার: সরবরাহ চেইনভিত্তিক সমাধান কতটুকু সম্ভব?’ নামে সিপিডির গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। শ্রীলঙ্কার ইনস্টিটিউট অব পলিসি স্টাডিজের (আইপিএস) সঙ্গে যৌথভাবে এ গবেষণা পরিচালনা করা হয়। সাউদার্ন ভয়েস এতে সহযোগিতা দিয়েছে।
সংলাপে সিপিডির চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান শ্রমিকদের সুরক্ষায় সামাজিক বীমা চালুর প্রস্তাব করে বলেন, বীমা তহবিলে সরকার, ক্রেতা ও কারখানার মালিকরা অর্থ জোগান দেবেন। সামাজিক বীমা থাকলে যেকোনো দুর্যোগে শ্রমিকদের সুরক্ষা দেওয়া সহজ হবে। এছাড়া করোনার মতো বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় সরবরাহ চেইন অব্যাহত রাখতে একটি উপ-আঞ্চলিক কর্মকৌশল নেওয়ার কথা বলেন তিনি।
বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, কভিডের ক্ষতি সরকার, বিদেশি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান, মালিক ও শ্রমিক সব পক্ষকে ভাগাভাগি করে নিতে হবে। কভিডের দ্বিতীয় ঢেউয়ে এখন আবার ক্রেতারা রপ্তানি আদেশ বাতিল করছেন বা কমাচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে রপ্তানিকারকদের নেওয়া প্রণোদনার ঋণ পরিশোধের সময় বাড়াতে হবে।
ক্রেতা প্রতিষ্ঠান এইচঅ্যান্ডএমের প্রতিনিধি জিয়াউর রহমান বলেন, কভিড থেকে ভিয়েতনাম এবং চীনের উত্তরণ হয়েছে। এ কারণে ওই দুই দেশে ব্যবসা বেশি গেছে। পণ্যের মানের কারণেই বাংলাদেশের পোশাকের রপ্তানি কম। বেশি অর্ডার পেতে মৌলিক থেকে ফ্যাশন পণ্য, উদ্ভাবনী, গবেষণা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি। জিয়াউর রহমান বলেন, শ্রমিক নিরাপত্তায় বীমা থাকা প্রয়োজন। তাদের মজুরিও বাড়ানো উচিত।
বিজিএমইএ সভাপতির কাছে অধ্যাপক রেহমান সোবহানের প্রশ্ন ছিল, সরকারের প্রণোদনার ঋণ ছোট-বড় কারখানা ন্যায্যভাবে পেয়েছে কি না এবং কভিডকালে শ্রমিকদের সংকট হয়েছে কি না এবং পোশাক কারখানায় সুরক্ষা সামগ্রী স্থানীয় বাজারে সরবরাহ করা হয়েছে কি না। জবাবে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, তহবিলের আকার যথেষ্ট না হওয়ায় অনেক কারখানা ঋণ পায়নি। কভিডে শ্রমিকের সংকট হয়নি, তবে সরবরাহ চেইনে বিঘ্ন ঘটেছে।
ঢাকায় নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত হ্যারি বারিজ বলেন, ইইউ এবং ওইসিডির নিয়মনীতি মেনে চলতে হয় দেশগুলোর। এই নীতির বাইরে যাওয়া যাওয়া সম্ভব নয়। তবে কভিডকালে রপ্তানি আদেশ বাতিল না করতে তার দেশের ক্রেতাদের অনুরোধ করা হয়েছিল। ক্রেতারা সেই অনুরোধ রক্ষা করেছেন।
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানে সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সংলাপে সিপিডির গবেষণার প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।
সিপিডির গবেষণায় বলা হয়, কভিডের কারণে বিশ্ববাজারে পোশাকের চাহিদা ৪২ শতাংশ কমেছে। এ কারণে রপ্তানি কমার পাশাপাশি শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে। প্রতিবেদন উপস্থাপনা করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জম। তিনি বলেন, বিভিন্ন ক্রেতা প্রতিনিধি, মালিক পক্ষসহ সংশ্লিষ্টদের প্রশ্নোত্তর এবং তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে এই ফলাফল তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কভিডে পোশাক খাতের সরবরাহ চেইন বিঘ্নিত হয়েছে। ভোক্তা থেকে ক্রেতা- সব পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়েছে। মধ্যমেয়াদি পুনরুদ্ধারে দেশের রাজস্বের দিকে তাকিয়ে থাকলে তা বিলম্বিত হতে পারে। এ জন্য বিকল্প হিসেবে সরবরাহ চেইনে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সম্মিলিত ভূমিকায় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের কথা ভাবতে হবে।