মা, কিছুতেই ক্ষমা করবেন না

আপডেট : ০৪ জুন ২০২০, ০২:৫৩ এএম

গত ২৭ মে রচিত হলো বাংলাদেশ থেকে শ্রম অভিবাসনের আরেকটি কলঙ্কময় অধ্যায়। প্রাণ হারাল দেশের ২৬ জন সোনার সন্তান। আর ১১ জন লড়ছে মৃত্যুর সঙ্গে। তাদের অপরাধ, তারা স্বপ্ন দেখেছিল। তারা ভালো থাকতে চেয়েছিল। তারা বদলে দিতে চেয়েছিল তাদের পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থান। বোনকে বড় ঘরে, ভালো বরের সঙ্গে বিয়ে দিতে চেয়েছিল। বাবার সুচিকিৎসা চেয়েছিল। শ্রেণি উত্তরণের সুযোগহীন সমাজকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে উন্নত জীবনের জন্য মরিয়া হয়েছিল। জীবনবাজি ধরেই তারা গিয়েছিল। ভাগ্য দেবতা প্রসন্ন হলে পৌঁছে যেত ইতালি তারপর হয়তো স্পেন অথবা অন্য কোনো ইউরোপীয় দেশ। বাজিতে হেরে  গেল তারা।

কিন্তু আর কত দিন চলবে এই নির্মম জীবনবাজির জুয়া খেলা? মধ্য আয়ের বাংলাদেশে প্রতি বছর শ্রমবাজারে যোগ দিচ্ছে ২০ লাখ মানূষ। দেশের ভেতর আনুষ্ঠানিক খাতে তৈরি হয় মাত্র দুই লাখ চাকরি। সেই চাকরি পেতে হলে শিক্ষা বা যোগ্যতাই তো যথেষ্ট নয়। চাই মামার জোর, চাই ঘুষ দেওয়ার যোগ্যতা, চাই রাজনৈতিক যোগাযোগ। কী করবে বাকি ১৮ লাখ তরুণ-তরুণী? আত্মকর্মসংস্থান? তাই তো করছিল তারা বিদেশে পাড়ি জমিয়ে। আসাদুলের মা, আপনি শুধু শুধু কাঁদছেন কেন? আপনার পরিবারের তো ছিল না কোনো কৃষিজমি যে সে চাষবাস করে খাবে! ব্যবসা করবে? পুঁজি কোথায় পাবে? কো-লেটারাল ছাড়া কোনো ব্যাংক তাকে লোন দিত? না না না কাঁদবেন না। ঝুঁকি আছে, জেনেই তো যেতে দিয়েছিলেন ছেলেকে! এখন দেখুন, বেশ কেমন আপনার ছবি ছাপা হচ্ছে পত্রিকায়। টিভিতেও দেখাচ্ছে আপনার মতো সব হতভাগ্য মা, বাবা বা বোনদের। পা ছড়িয়ে বুক ফাটিয়ে বা ছেলের ছবি হাতে নিয়ে আপনারা কাঁদছেন। এ রকমভাবে ছেলে না হারালে কোনো দিন কি হতে পারতেন এমন তাজা মর্মস্পর্শী খবর? আপনার আর আপনার ছেলের অপরাধ আপনি জন্মেছেন এমন এক দেশে যেখানে স্বপ্ন দেখতে নেই। যেমন আছেন তেমনি থাকবেন। তার পর একদিন নিঃশব্দে চলে যাবেন।

আমার স্পষ্ট মনে আছে, ২০০০ সালে জমিলার মা স্বপ্ন দেখেছিল তার মেয়ে সুখে থাকবে। তাইতো স্বল্প পরিচিত এক দারুণ দেখতে আর বেশভুষার তরুণ ছেলের কাছে বিয়ে দিয়েছিল। ভেবেছিল হাতে সোনার দলা পেয়ে গেছে সে। সেকি জানত যে সেই ছেলে তার জমিলাকে পাচারকারীদের কাছে বিক্রি করে দেবে? সে কি জানত তার মেয়ে পাশের কোনো দেশের পতিতালয়ে স্থান পাবে? জমিলাতো আর ফিরে আসেনি। শূন্য ঘরে খাঁ খাঁ করা বুকে জমিলার মা কি আজও বেঁচে নেই? আপনিও বাঁচবেন তেমনি করে।

আপনি ভাবছেন ২০১২ সালে পাচারবিরোধী আইন হয়েছে, ২০১৩ সালে হয়েছে অভিবাসন ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান আইন। কত কত বিচারক, ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, উকিল, এসব আইনের প্রয়োগের জন্য ট্রেনিং পেয়েছেন, কত এনজিও সবাইকে এফআইআর লিখতে শিখিয়েছে, টিভিতে নাটক হয়েছে, সিনেমা হয়েছে, সাংবাদিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাচারকারীদের শনাক্ত করে খবর পরিবেশন করেছে, সুতরাং আপনি ভেবেছিলেন মানব পাচারকারীরা ভয় পেয়ে যাবে। আপনার বুঝি জানা ছিল না, পাচার বিরোধী আইন হলেও আজও বিশেষ আদালত গঠন করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। নারী-শিশুর কোর্টেই পাচারের মামলা রুজু হচ্ছে। নারীদের নিয়েই এত মামলা আজ যৌতুকের জন্য মৃত্যু, কাল এসিড নিক্ষেপ, পরশু শ^শুরবাড়িতে শারীরিক অত্যাচার আর নাহলে মৃত স্বামীর স্ত্রী বা সন্তানদের সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করে তাদের বের করে রাস্তায় ফেলে দেওয়া এতসব কেস সামলানোর জন্য আমাদের বিচার বিভাগের লোকবল নেই যে! তাইতো পাচারসহ সব ধরনের মামলাই পড়ে যায় দীর্ঘসূত্রতায়। তাছাড়া প্রমাণ প্রমাণ কোথায়? ৫০০০ মামলা রুজু হয়েছে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে। তাদের অল্প কজনেরই বিচার শেষ হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রমাণের অভাবে দোষীদের শাস্তি দেওয়া যায়নি। তাই কী হয়েছে কিছু চুনোপুঁটি তো ধরা পড়েছে। সত্যি করে বলছি, আসাদুলের মা, আপনার ছেলের কিন্তু মনে থাকা উচিত ছিল ২০১৫-১৬ সালের ঘটনা। রোজ তো টিভিতে দেখাত থাইল্যান্ড আর মালয়েশিয়ার সীমানা জুড়ে কত কত বাংলাদেশি আর রোহিঙ্গা শরণার্থীদের গণকবর, উদ্ধারকৃতদের কঙ্কালসার চেহারা, তখনও তো একইভাবে খালি হয়েছে আপনার মতোই আর কত হতভাগিনী মায়ের বুক। আপনার ছেলের সাহস আছে বটে। এখান থেকে বাসে করে কলকাতা। তারপর প্লেনে চড়ে মুম্বাই, দুবাই আর মিসর হয়ে লিবিয়ার বেনগাজি শহর। আপনিই বলুন, আমাদের দেশের দালালদের কি বেশি দোষ দেওয়া যায়?, তারা তো আপনার ছেলের কাছ থেকে চার বা সাড়ে চার লাখ টাকাই শুধু নিয়েছে, তাকে তো লিবিয়া পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে। ঘাটে ঘাটে পাচারকারীরা যদি জিম্মি করে টাকা নিতে থাকে, সেখানে আমাদের দেশের পাচারকারীরা কি অসহায় না? আপনার তো অনেক সাহস আপনি প্রশ্ন করছেন ওইসব দেশের পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ইউএনসহ অন্যসব আন্তর্জাতিক সংস্থাকে এক জোট হয়ে ব্যবস্থা নিতে। আপনি বুঝি জানেন না তারা শুধু পারে আমাদের মতো দেশগুলোর ওপর হম্বিতম্বি করতে আর টিআইপির টিয়ার ২ এবং ৩ এর মধ্যে আমাদের দেশকে ওঠানামা করিয়ে আমাদের সরকারগুলোকে কিছুটা বেকায়দায় ফেলতে।

আপনি আবারও প্রশ্ন করছেন আমাদের পুলিশ বাহিনীর কাছে এত উচ্চমানের সার্ভিলেন্স উপকরণ আছে, তবে তারা আপনার ছেলেকে যারা অভিবাসনের নামে পাচার করে দিল তাদের ধরছে না কেন? এই তো গতকাল একজনকে ধরেছে। কিন্তু আগামীকাল ঘটে যেতে পারে আরেকটি ভয়ংকর ঘটনা। তখন তাদের তো ছুটে যেতেই হবে সে অবস্থা মোকাবিলায়। শুধু পাচারকারী ধরলেই তো আর দেশ চলবে না। আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ দিকও তো আছে, যা তাদেরই সামলাতে হবে।

আপনার ছেলের মতোই আরেক অভিবাসী জিল্লুর। তার মা প্রায় পাগল হয়ে গিয়েছিল যখন তার ছেলে ইউরোপ যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে লিবিয়ায় গিয়ে আটকা পড়েছিল। জিল্লুর কিন্তু সবার নাকের ডগা দিয়ে চিটাগাং বিমানবন্দর দিয়ে রওনা দিয়েছিল। তাকে দেওয়া হয়েছিল সুদানে যাওয়ার টুরিস্ট ভিসা। আমাদের ইমিগ্রেশন পুলিশ কি জানে না সুদানে কেন একজন পড়ালেখা না জানা, জীবনে দেশের বাইরে না যাওয়া লোক বেড়াতে যাবে? নৌকায় করে বঙ্গোপসাগর দিয়ে যখন হাজার হাজার বাংলাদেশি তরুণ অথবা শরণার্থী রোহিঙ্গা নারী-পুরুষকে থাইল্যান্ডে নেওয়া হচ্ছিল, তখন আমাদের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স কি বুঝতে পারেনি বিষয়টা? আমরা কি পেরেছি এ ব্যাপারে কখনো কোনো আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যকে দায়বদ্ধ করতে? আপনি বুঝবেন কী করে মা, আপনি তো বিশেষ পড়ালেখা করেননি। আমাদের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একেই বলে ইম্পিউনিটি। আপনাকে বুঝিয়ে বলছি যখন কেউ জানে যে, তার দায়িত্ব পালন না করলে যে শাস্তি হওয়ার কথা তা হবে না এবং ক্রমাগত সে সেই অন্যায় করে চলে, তাকেই আমরা বলি ইম্পিউনিটি।

আপনার মতো আমিও স্বপ্ন দেখতাম মা, আমার দেশের এই সোনার সন্তানদের আমি বলতাম আজকের মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধারা প্রাণ দিয়ে দেশ স্বাধীন করে দিয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক আর অভ্যন্তরীণ অভিবাসীরা আজ তাদের ঘাম দিয়ে এনে দিচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা। আমরা যখন কাজ শুরু করি, সবাই তাদের প্রবাসী বলত। আমরা অভিধান ঘেঁটে খুঁজে বের করলাম তাদের আসল পরিচয়। প্রবাসী শব্দের অন্তরালে হারিয়ে যাওয়া বাংলা মায়ের দরিদ্র সন্তানদের আসল পরিচয় সামনে আনলাম। আজ সবাই আমাদের দেওয়া নামই ব্যবহার করে। সবাই তাদের ডাকেন অভিবাসী বলে। দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার জন্য তাদের সম্মানিত করেছি ‘সোনার মানুষ’ বলে। মনেপ্রাণে চাইতাম বিশে^র সামনে তাদের অর্জনগুলোকে তুলে ধরতে। তাই তো বলতাম ‘অভিবাসীর ঘামের টাকা, সচল রাখে দেশের চাকা।’ জীবনের ২৩টা বছর দিয়ে দিয়েছি এই কাজে। বিশ^বিদ্যালয় বা অন্য পরিসরের প্রাপ্তিগুলোকে অগ্রাহ্য করেছি।

গত বেশকিছু বছর ধরে আপনার মতো আমারও বুক যে ব্যথায় ভারাক্রান্ত। বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অধিকাংশ অভিবাসন আজ আর উন্নয়নের হাতিয়ার নয়, মৃত্যুপুরির হাতছানি অথবা নিদেনপক্ষে সর্বস্বান্ত হওয়ার দ্রুততম উপায়। মাগো যদি পারেন আমাদের সবাইকে ক্ষমা করে দেবেন। না না, কিছুতেই ক্ষমা করবেন না, কিছুতেই না।
লেখক
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার রামরু এবং অধ্যাপক রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়
[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত