‘নারীদেহ কোনোদিন শুচি নয় আর তাই পৌরোহিত্বে নারীর কোনো অধিকার নেই’ এটি একটি চলচ্চিত্রের সংলাপ। যেখানে শবরী নামে সংস্কৃতের অধ্যাপক এক নারী, সে যখন পূজা করতে চায়, তখনই সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ ও বিশেষত পুরোহিত অসন্তুষ্ট হন, কেননা প্রতি মাসে তার ঋতুস্রাব হয়। সম্প্রতি ভারতে নির্মিত অরিত্র মুখার্জী পরিচালিত ‘ব্রহ্মা জানে গোপন কম্মটি’ চলচ্চিত্রের কাহিনী এটি। অন্যদিকে, সম্প্রতি বাংলাদেশে আয়েশা সিদ্দিকা নামে এক নারী ফুলবাড়িয়া পৌরসভার নিকাহ রেজিস্ট্রারের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেন। প্রথমে আইন মন্ত্রণালয় এবং পরবর্তী সময়ে হাইকোর্ট তার আবেদন খারিজ করে দেয়। আবেদন খারিজের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয় একই ‘শারীরিক অযোগ্যতা’ প্রতি মাসে তারও ‘মাসিক’ বা ‘ঋতুস্রাব’ হয়। দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর হোমিও চিকিৎসক আয়েশার পক্ষে তাই আর বিয়ে পড়ানোর পবিত্র কাজ করা সম্ভব নয় তিনি কাজি বা নিকাহ রেজিস্ট্রার হতে পারবেন না। ওপরের দুটি ঘটনার একটি গল্প অন্যটি বাস্তব হলেও দুটি ঘটনার কেন্দ্রীয় চরিত্রই নারী যাদের এককভাবে পুুরুষ নিয়ন্ত্রিত একটি পেশায় ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না লৈঙ্গিক পরিচয়ে তার একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য ঋতুস্রাবের কারণে। অথচ সেটা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতি বিরুদ্ধ।
কর্মসংস্থান বা পেশাগত ক্ষেত্রে বৈষম্য দূরীকরণ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার কনভেনশন-১১১ (১৯৫৮) সনদে স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। এই সনদের (ধ) নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘বর্ণ, লিঙ্গ, ধর্ম, রাজনৈতিক মতামত, জাতীয় বা সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তিতে তৈরি হওয়া কোনো পার্থক্য, বর্জন বা অগ্রাধিকার যা কর্মসংস্থান বা পেশায় সুযোগ বা আচরণের সাম্যকে বাতিল বা ক্ষতিগ্রস্ত করে’ এমন কোনো নীতি বা পন্থা অনুসরণ করা যাবে না। অন্যদিকে, বাংলাদেশ সংবিধানের ২৮ নম্বর অনুচ্ছেদের ১ নম্বর ধারায় বলা আছে ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না’। এক্ষেত্রেও নারীর নিকাহ রেজিস্ট্রার সংক্রান্ত্র মন্ত্রণালয় আর হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা নিঃসন্দেহে আইএলও কনভেনশন এবং সংবিধান পরিপন্থী।
কিন্তু সমাজে কেন এমন রীতিনীতির প্রচলন হয় যেখানে সব যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও একজন আয়েশা সিদ্দিকাকে ঋতুস্রাবজনিত কারণে তার সারা জীবনের স্বপ্নকে জলাঞ্জলি দিতে হচ্ছে। কেন বিদ্যমান আইনের ওপর প্রচলিত বিশ্বাস, অভ্যাস কিংবা সামাজিক প্রথা বড় হয়ে ওঠে। এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আমাদের জানা দরকার ঐতিহাসিকভাবে কীভাবে পেশার ক্ষেত্রে ‘জেন্ডারিং’ হয়েছে। ‘মেয়েলি’ এবং ‘পুরুষালি’ গুণাবলির ওপর ভিত্তি করে পেশার ক্ষেত্রে জেন্ডার বিভাজন তীব্রতর হয়েছিল উনিশ শতকে।
সমাজে একজন মানবের নারী ও পুরুষ হিসেবে লৈঙ্গিক পরিচয় নির্ধারণ হয় কতিপয় জৈবিক বৈশিষ্ট্যের (যেমনক্রোমোসম, লিঙ্গ, হরমোন ও শারীরিক বৈশিষ্ট্য) ওপর ভিত্তি করে। শুরুতে নারীবাদী আন্দোলনের মূল ভিত্তি ছিল ‘শারীরিক বৈশিষ্ট্য একজন নারীর ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করবে না’ সেই প্রেক্ষাপটে। প্রখ্যাত ফরাসি নারীবিদ সিমন দ্য বোভোয়ার (১৯৭২) বলেন, একজন মানুষ নারী হয়ে জন্মায় না বরং সমাজ তাকে নারী করে তোলে। নারীবিদ রুবিন (১৯৭৫) বলেন, নারী-পুরুষের শারীরিক পার্থক্য নির্ধারিত। কিন্তু জেন্ডার বৈষম্য হলো সামাজিকভাবে দমন করার ফলাফল যেখানে নারী-পুরুষের আচরণ, দায়িত্ব নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। আর এই বৈষম্যের পেছনে ব্যক্তিগত তথা সাংস্কৃতিক পরিচর্যা এবং সামাজিক প্রত্যাশাই দায়ী। তাই তো নিকাহ রেজিস্ট্রেশনের জন্য একজন কাজিকে যেমন মসজিদে যেতে হবে না তেমনি কাজির অনুপস্থিতিতেও বিয়ে সম্পন্ন হবে এবং পরে বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে বিয়ে নিবন্ধন করানো বাধ্যতামূলক (তানজিম আল ইসলাম, প্রথম আলো, ২০১৬)। কিন্তু আমরা সামাজিক, সাংস্কৃতিকভাবে ব্যক্তিগত পছন্দের কারণে কেউ কেউ বিয়ের সময় নিবন্ধন করতে আসা কাজিকে দিয়েই বিয়ে পড়ানোর কাজটিও করি। ব্যক্তিগত এ চর্চা অনেক সময় সামাজিক চর্চায় পরিণত হয়। তাই আমাদের অনেকেরই ধারণা হয় বিয়ে পড়ানোও কাজিরই কাজ। কিন্তু কাজির অর্পিত দায়িত্ব মূলত বিয়ে নিবন্ধন করা। বিয়ে পড়ানো একই সঙ্গে একটি ধর্মীয় ও সামাজিক আচার, অঞ্চলভেদে যার ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। আর বিয়ে নিবন্ধন করা হচ্ছে আইনি প্রক্রিয়া যা সর্বত্র একই রকম হবে এবং তা বাধ্যতামূলক। আমাদের আয়েশা আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হতে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু সেটাকে সামাজিক বা ধর্মীয় আচারের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা হয়েছে।
ইসলামে বিয়ের সুনির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। ইসলামি বিয়ের মূল উপকরণ হলোওয়ালি (অভিভাবক), ইজাব (প্রস্তাব), কবুল, সাক্ষী ও দেনমোহর। এখানে কে বিয়ে পড়াতে পারবেন? জানাজার নিয়ম জানা থাকলে একজন মুসলিম যেমন মৃত ব্যক্তির জানাজা পড়াতে পারবেন তেমনি বিয়ের নিয়ম জানা থাকলে যেকোনো মুসলিম ব্যক্তি বিয়েও পড়াতে পারবেন, তাকে কাজিই হতে হবে তা নয়। এখানে ধর্মীয় বিধিতে বিয়েটা হয় স¤পূর্ণ মৌখিকভাবে। অন্যদিকে, বিয়ে নিবন্ধন যা আইনি প্রক্রিয়া ও লিখিত তা যে কেউ করতে পারবেন না। তার জন্য বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রণীত সুনির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। তাই মৌখিক আচারকে আনুষ্ঠানিক নিয়ম বানিয়ে নারীকে কাজি হতে না দেওয়া মূলত সমাজে লিঙ্গ বৈষম্যকে বাড়িয়ে তোলে।
বলা হয়েছে, মাসিককালীন একজন ঋতুবতী নারী মসজিদে বিয়ে পড়াতে পারবেন না। আমার নিজের এবং আত্মীয়-স্বজনের বিয়ে হয়েছে কমিউনিটি সেন্টারে কিংবা কনের পিত্রালয়ে। আদালতের নিষেধাজ্ঞা না হলে হয়তো জানাই হতো না মসজিদে বিয়ে পড়াতে হয়। বিজ্ঞ আদালত জানতে চেয়েছিল পৃথিবীর কোথাও কোনো মহিলা নিকাহ রেজিস্ট্রার আছে কি না? যদি না থাকে তাহলে বাংলাদেশে একজন নারী কি নিকাহ রেজিস্ট্রার হতে পারবেন না? অনেক নেতিবাচক ঘটনার উদাহরণ হয় বাংলাদেশ। বাংলাদেশ কি হতে পারে না বিশ্বের বুকে প্রথম দেশ, যে পেশাগত জেন্ডারিংকে অগ্রাহ্য করে লৈঙ্গিক বৈষম্য দূরীকরণে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে?
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর
