করোনা প্রতিরোধের প্রকৃষ্ট পন্থা হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। আর স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার অন্যতম অনুষঙ্গ হলো সামাজিক দূরত্ব মেনে চলাচল করা। মুখে মাস্ক পরা এবং ঘন ঘন হাত ধোয়া হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধির অপর দুই পরিপালনীয় বিষয়। সামাজিক দূরত্ব যা প্রকৃত প্রস্তাবে দৈহিক দূরত্ব, তাকে মানুষে মানুষে পারস্পরিক সাহচর্য ত্যাগ, বয়কট এবং অতি আপনকেও পর করে দেওয়ার নামান্তর হয়ে দাঁড়িয়েছে। মৃত্যুপথযাত্রীর সাহচর্য ত্যাগ, এমনকি মৃত্যুর পরও তার পরিবারকেও সমবেদনা জানানোর, সর্বজনীন সহানুভূতি- সমানুভূতির তাৎপর্যকে উপেক্ষার উপান্তে মানসিক শক্তি ও সুস্থতার সুযোগ যে তিরোহিত হচ্ছে তা বোঝার শক্তিও সবাই হারিয়ে ফেলছে। করোনার প্রতিষেধক এখনো আবিষ্কার হয়নি, চিকিৎসার রীতিপদ্ধতি এখনো অজানা, বারবার ভোল পাল্টানোতে করোনাকে শনাক্ত করা যেমন কঠিন, তেমনি করোনা সংক্রমণের ক্রিয়া প্রক্রিয়াও ক্রিকেটেরে স্পিন বলের মতো দুর্বোধ্য ঠেকছে। করোনায় সংক্রমণ ও মৃত্যুর রেকর্ড যখন বাড়ছে তখন ভীতি-বিহ্বলতা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বেড়েই চলেছে। এর মধ্যে সামাজিক দূরত্ব, যা স্বাস্থ্যবিধির অন্যতম উইকেট, তার সাজঘরে ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল হয়ে উঠছে। লকডাউন কোনো পক্ষ থেকেই অর্থবহ করা হচ্ছে না, যাচ্ছে না।
সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় বহু হাত ঘুরে আসা একটি পোস্টে ৩টি ঘটনা নিয়ে ‘চিন্তা করার’ আহ্বান রয়েছে ১. পঞ্চাশোর্ধ্ব এক করোনা রোগী সুইসাইড নোট লিখে মুগদা হাসপাতাল থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছেন। লিখে গেছেন, নিজের একাকিত্বের কথা। টাকা ছিল, পয়সা ছিল। কিন্তু আত্মীয়স্বজন, বন্ধু ছিল না কাছে। পরিবার ও আত্মীয়দের সবাই ছিল যুক্তরাষ্ট্রসহ ‘উন্নত’ দেশে! একাকিত্ব সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন বলে লিখে গেছেন! ২. চলচ্চিত্রের ‘মিষ্টি মেয়ে’খ্যাত নায়িকা, সাবেক সাংসদ কবরী করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। মারা যাওয়ার পর তার একটি সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ ভাইরাল হয়েছে। তা হলো, জীবনে ভালো একজন বন্ধু পেলাম না, ভালো একজন স্বামী পেলাম না, সন্তানরাও যে যার মতো! কারও সঙ্গে বসে এক কাপ চা খাব, মনের কথা খুলে বলব তা পেলাম না! ৩. ‘বিশ্ব রাজনীতির ১০০ বছর’-এর লেখক, খ্যাতনামা কলামনিস্ট, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক তারেক শামসুর রেহমানের লাশ নিজের বাসা থেকে দরজার তালা ভেঙে উদ্ধার করা হয়েছে! বাসায় তিনি ছিলেন একা। স্ত্রী ও কন্যা আছেন যথারীতি ‘স্বপ্নের দেশ’ যুক্তরাষ্ট্রে! অসুস্থ ও মৃত্যুর সময় কেউ ছিল না পাশে, কেউ জানেনি কিছু! টাকা, পয়সা, যশ, খ্যাতি, পরিচিতি সবাই ছিল। কিন্তু কারও পাশে ছিল না স্ত্রী, স্বামী বা পুত্র-কন্যা! ছিল একাকিত্ব!
এর থেকে দেশ, সমাজ, পরিবার ও ব্যক্তির অবস্থান, অবস্থা-ব্যবস্থা কোনদিকে যাচ্ছে তা নিশ্চয়ই আঁচ করে আঁতকে উঠতে হচ্ছে। কিন্তু যেন ওই পর্যন্তই। সবাই নিজ নিজ স্বাস্থ্য সুরক্ষার নামে, নিরাপদ নিরাপত্তা নিয়ে, উন্নয়ন উন্নতির জন্য ভেদবুদ্ধির আশ্রয় নিতে ব্যতিব্যস্ত। গত ১৯ এপ্রিল আইএমএফের ব্লগে রোবট স্বাস্থ্য সুরক্ষাকল্পে, মেহনতি মানুষের আয়-রোজগারের উপায় যে কাজ সেই কাজ ছিনিয়ে নিচ্ছে, কর্মহীন ও বেকার বৃদ্ধির এই ভয়াবহ যান্ত্রিক আগ্রাসন মানুষকে জীবিকার প্রশ্নে প্রাণনাশক আঘাত হানতে যাচ্ছে আইএমএফের প্রতিবেদনে সে আশঙ্কা ব্যক্ত করা হয়েছে। কিন্তু ওই পর্যন্তই। সবই সামাজিক দূরত্বের নামে।
করোনায় আক্রান্তদের নির্দিষ্ট চিকিৎসা বা প্রতিষেধক নেই সত্য তবে আক্রান্ত হলেও নিজে নিজে সেরে ওঠা সম্ভব। তবে তার জন্য প্রয়োজন মনোবলের, মানসিক শক্তি ও শান্তির। আর তার জন্য জোগান চাই আপনজনের সার্বক্ষণিক উপস্থিতি ও সহানুভূতি, শুশ্রƒষার।
সুতরাং এখনো সময় আছে সম্ভাব্য সবাইকে শনাক্তকরণের পরীক্ষা পদ্ধতি প্রক্রিয়া সহজসাধ্য বা নাগালের মধ্যে আনা। আপনজন-সহ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীকে উপযুক্ত পোশাকসহ ভাইরাস থেকে তাদের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করা, সরকারি ও ব্যক্তি খাত মিলে সর্বদলীয় সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ এবং সামাজিক সেবা শক্তির আত্মপ্রকাশ ঘটলে করোনা দুর্যোগ মোকাবিলায় সাফল্য মিলবে।
বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতিতে সব কাজ সারা দিন ফেলে রেখে আসর ওয়াক্তের (শেষ বেলায়, দিন শেষের ঘণ্টাখানেক আগে) সময় জোরেশোরে শুরুর প্রবণতার বাইরে আসার প্রয়োজন ছিল অন্তত করোনাভাইরাস মোকাবিলার ক্ষেত্রে। যাইহোক বাংলাদেশ এ মুহূর্তে করোনাযুদ্ধেও একটি অতি কঠিন ক্রান্তিকাল পার করছে। করোনা সংক্রমণের মূল লক্ষ্য যেহেতু সমাজ সংসার পরিবার এমনকি আপনজন থেকে আলাদা করা ব্যক্তি সেহেতু ব্যক্তির ‘সচেতনতা’, ‘নিজেকে নিরাপদ রেখে অন্যকে বাঁচানো’য় ‘দায়িত্বশীল’ হওয়ার কঠিন ব্রত তার সামনে। সে ব্রত পালনে তার চাই দৃঢ়চিত্ত মনোবল, মানসিক শক্তি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সুস্থতার সংজ্ঞা দিয়েছে ‘Health is a state of complete physical, mental and social well-being and not merely the absence of disease or infirmit ’ অর্থাৎ রোগবালাই মুক্ত হলেই শুধু নয় শারীরিক বা দৈহিক, মানসিক এবং সামাজিক সবলতাই সুস্থতা। সুস্থতার এ সংজ্ঞা একজন ব্যক্তি বা ব্যষ্টির জন্য যেমন সত্য, ব্যষ্টির সমষ্টি পরিবার সমাজ, দেশ ও জাতির জন্যও প্রযোজ্য। একবিংশ শতাব্দীতে এ পর্যন্ত বৃহৎ বলে বিবেচিত করোনাভাইরাস বৈশ্বিক বিচরণে যেভাবে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে তাতে পৃথিবীর তাবৎ নাগরিকের ব্যক্তিগত শারীরিক সুস্থতা, মানসিক শান্তি ও সামাজিক সুরক্ষা সংকটের সম্মুখীন, আর এর জন্য বর্তমান কিংবা আসন্ন অর্থনৈতিক সংকটের আশঙ্কাও দুশ্চিন্তার অন্যতম কারণ। উচ্চবিত্ত বাদে মধ্যবিত্ত-সহ অন্য সবাই (৯৬ শতাংশের বেশি মানুষ) স্বাভাবিক জীবন যাপনে ও ধারণে প্রাণান্ত সংগ্রামে। এ পরিস্থিতিতে মহামারী করোনা মোকাবিলায় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ঠাসা বিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্ত এবং সমন্বয়হীন কর্মসূচি পালনের সময় মানসিক সুস্থতা অপরিহার্য। অনেক আপনজনের মৃত্যু সংবাদ শুনতে হবে, সমবেদনা জানাতে যাওয়া যাবে না, এহেন পরিস্থিতিতে অনেক কিছু মেনে নিয়ে নিজেকে আত্মশক্তিতে সোপর্দ করতে হবে।
এটা ঠিক দেশে-বিদেশে করোনা নিয়ন্ত্রণ ও নিরাময় ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা ও ক্ষয়ক্ষতির বেহাল চিত্র দেখে আস্থাহীনতায় আতঙ্ক, আশঙ্কা বেড়েই চলেছে যা মানসিক অশান্তির উপসর্গ। অথচ মানসিক শান্তি বা মনের বল করোনার মতো ভয়াবহ মহামারী মোকাবিলায় প্রাণশক্তি বা প্রতিষেধক হতে পারে। গৃহীত সব পদক্ষেপে, দোষারোপে, বিচ্যুতির পরিবর্তে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এ যুদ্ধে টিকে থাকার ক্ষেত্রে ঐকমত্যের ঐশ্বর্য মতানৈক্যের মাশুল দিতে দিতে যেন শেষ না হয়।
এটা উপলব্ধির অবশ্যই অবকাশ রয়েছে যে মহামারী করোনা নানান ক্ষেত্রে মানুষের সীমালঙ্ঘনের প্রতিফল। প্রকৃতির প্রতিশোধ। খাদ্য স্বভাব ও উপায় উপকরণ থেকে শুরু করে মৌলিক অধিকার অস্বীকৃতি, সুশাসন নির্বাসন, পারস্পরিক দোষারোপে জবাবদিহিবিহীনতায়, পরিবেশ দূষণ-দুষ্কর্মে সদাচার, সহমর্মিতার, সত্যম শিবম সুন্দরের সহাবস্থানের সুযোগ যখন হয় তিরোহিত, প্রতিবিধানে জাগতিক বা বাহ্যিক বিচার ব্যবস্থা হয় অপারগ, তখন তার মতো প্রতিশোধ প্রতিবিধানের একটা পথ বেছে নেয় প্রকৃতি। করোনা তেমন এক প্রকার উপায় বা উপলক্ষ। তাবৎ ঐশী গ্রন্থে সৃষ্টিকর্তা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যখন যে জনপদ, সম্প্রদায় নানানভাবে বাড়াবাড়ি করেছে স্বভাবে, বুদ্ধি ও বিচার বিবেচনায় তখন তাদের ওপর নিপতিত হয়েছে অশেষ দুর্ভোগ। উদ্ধত উদভ্রান্ত অনেক জনপদকে উল্টিয়ে দেওয়ার উপমা টেনেফল ফসল ও জীবনের অশেষ ক্ষয়ক্ষতির দ্বারা অনুশোচনার উপলব্ধিকে করা হয়েছে জাগ্রত। সুতরাং করোনাকে নয় সবার সৃষ্টিকর্তাকে ভয় করা প্রয়োজন। অনুশোচনা, অনুতাপ থেকে মার্জনা প্রার্থনা, প্রকৃতির সম্পদ অপব্যবহার, সুযোগের অপপ্রয়োগ, অন্যের অধিকার হরণের মতো আত্মবিধ্বংসী প্রবণতা থেকে ফিরে আসার অয়োময় বাধ্যবাধকতাই করোনাকালের দাবি।
চিন্তা থেকে কাজের উৎপত্তি। চিন্তা বা নিয়ত বা কর্মপরিকল্পনা পল্লবিত হয় আত্মায়। পরমাত্মা বা সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে এই আত্মার সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ঠিক থাকা জরুরি। কেননা ভালো-মন্দ, ভূত-ভবিষ্যৎ জ্ঞান পরমাত্মার এখতিয়ার। যুদ্ধের সময় সেনাবাহিনী যেমন সবসময় হেডকোয়ার্টারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে নির্দেশনা মতো কাজ করে, হেডকোয়ার্টারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে রসদপ্রাপ্তিতে বিপত্তি ঘটে, শত্রুর অবস্থানের নিশানা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, ফলে দিশেহারা হয়ে শত্রুর কবজায় চলে যেতে পারে ঐ বাহিনী। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব, তার জীবন সংগ্রামে সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকেই সে পাবে প্রেরণা, অশুভ শক্তি, পথ বা প্রবণতা থেকে ফিরে আসা, বিপদ তারণের মদদ, বিপদে সৃষ্টিকর্তার কাছে জানাবে ফরিয়াদ, চাইবে মার্জনা। এটাই তার মনের শক্তি ও সান্ত¡না অর্জনের পথ। করোনা মহামারী প্রকৃতির প্রতিশোধ, নানাবিধ সীমালংঘনের অভিঘাত, প্রতিফল। সুতরাং এ থেকে নিষ্কৃতি লাভের শ্রেষ্ঠ উপায় অনুতপ্ত অনুশোচনার মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার কাছে সাহায্য চাওয়া এবং তা পাওয়াই তার মানসিক শান্তি ও শক্তি।
লেখক সরকারের সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান