ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধিতে বড় সংকটে কৃষি

আপডেট : ২০ আগস্ট ২০২২, ১২:৪৯ এএম

করোনা মহামারীকালে কৃষক জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শস্য উৎপাদন করে দেশের সাড়ে ষোলো কোটি মানুষের জীবন রক্ষা করে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে খাদ্য সংকট দেখা দিলেও সরকারের কৃষিবান্ধব কর্মসূচি ও কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে বাংলাদেশে খাদ্যের তেমন কোনো অভাব হয়নি। শুধু খাদ্য নয়; করোনার কারণে কর্মচ্যুত মানুষের কর্মসংস্থানেও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে কৃষি। এখনো জনসংখ্যার ৪০ শতাংশের বেশি লোক কৃষির ওপর প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল। জিডিপির ১৩ থেকে ১৪ শতাংশ আসে কৃষি থেকে। শিল্পের কাঁচামাল জোগায় কৃষি। কৃষিপণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। বিপদে-আপদে কৃষিই আমাদের বড় ভরসারস্থল ও বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন। গত বছরের নভেম্বরে ডিজেল ও কেরোসিনের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আবার বাড়ানো হলো সারের দাম। সম্প্রতি ডিজেলের নজিরবিহীন মূল্যবৃদ্ধির ফলে বড় সংকটে পড়েছে কৃষি। এমনিতেই উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে কৃষিপণ্য বিক্রি করে কৃষক সর্বস্বান্ত হচ্ছেন, তার ওপর উৎপাদন উপকরণের মূল্যবৃদ্ধিতে কৃষকের পক্ষে এখন টিকে থাকাটাই মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত ৫ আগস্ট ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ৩৪ টাকা, পেট্রলের দাম ৪৪ এবং অকটেনের দাম ৪৬ টাকা বাড়ানো হয়। জনজীবনে এরই মধ্যে জ¦ালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। ডিমের দাম এক লাফে হালিতে ৪০ থেকে বেড়ে ৫০ টাকা পৌঁছেছে। বেড়েছে মাছ ও মুরগির দাম কেজিতে ২০ থেকে ৫০ টাকা। গণপরিবহনের ভাড়া বেড়েছে ২২ থেকে ৩০ শতাংশ। কোনো কোনো পরিবহন সংস্থা নির্ধারিত হারের চেয়েও বেশি ভাড়া আদায় করছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে বিভিন্ন রুটে ট্রাকভাড়া বেড়েছে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। এর প্রভাব পড়েছে সবজির দামেও। ফলে পাইকারি ও খুচরা বাজারে বেড়েছে সবজির দাম। কমদামি সবজিগুলো কেজিপ্রতি ৪ থেকে ৫ টাকা এবং বেশি দামি সবজির দাম খুচরাপর্যায়ে কেজিপ্রতি বেড়েছে ১৫ থেকে ২০ টাকা। ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির আগে ঢাকায় যে গোল বেগুনের কেজি ছিল ৬০ থেকে ৭০ টাকা, এখন তা বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৯০ টাকা। ৫০ টাকার নিচে বাজারে কোনো সবজিই মিলছে না।

চুয়াডাঙ্গা থেকে যেসব সাড়ে তিন টন সবজিবোঝাই ট্রাক ঢাকায় আসছে, তাদের আসা-যাওয়ায় জ্বালানি তেল বাবদ এখন অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে প্রায় চার হাজার টাকা। অন্যদিকে বগুড়া থেকে ঢাকায় সবজি নিয়ে আসার ক্ষেত্রে সাড়ে তিন টন ক্ষমতার একটি ট্রাকে ভাড়া বেড়েছে প্রায় তিন হাজার টাকার মতো। এত দিন সাড়ে তিন টন ক্ষমতার যে ট্রাকভাড়া ছিল ১২ হাজার টাকা, ডিজেলের দাম বাড়ার ফলে সেই ভাড়া এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার টাকা।

কৃষিবিষয়ক সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর হিসাবে, কৃষকের ধান উৎপাদন খরচপ্রতি বছর বাড়ছে। বাড়ছে সার ও বালাইনাশকের দাম এবং কৃষিশ্রমিকের মজুরি। গত মৌসুমে বোরো ধানের কেজিপ্রতি উৎপাদন খরচ বেড়ে ২৭ টাকা হলেও সরকারি পর্যায়ে সংগ্রহ মূল্য বাড়েনি এক টাকাও। এবার সেচ ও সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে বাড়তি চাপ তৈরি হবে উৎপাদন খরচের ওপর। দেশে ধান ছাড়াও গম, ভুট্টা ও শীতকালীন সবজি পুকুর ও ঘেরের মাছ চাষে সেচযন্ত্রের ব্যবহার করা হয়। সারা দেশে প্রায় ১৬ লাখ ক্ষুদ্র সেচযন্ত্র (শ্যালো মেশিন) রয়েছে। জমি চাষ, শস্য মাড়াই, পণ্য পরিবহন ও নৌযান চালানোর মতো কাজে সারা বছর শ্যালো মেশিনের ব্যবহার করা হয়। এসব যন্ত্র আবার সম্পূর্ণ ডিজেলনির্ভর। একজন কৃষিবিশেষজ্ঞের মতে, ডিজেলের দাম এত বাড়ানো উচিত হয়নি। কারণ, এ দুটি জ্বালানির বেশি ব্যবহার হয় ধান চাষ, নৌকা চালানোসহ অন্যান্য কাজে, যা গ্রামীণ অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখে। সার ও ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে ধানের উৎপাদন কমতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন একজন কৃষি অর্থনীতিবিদ। এতে বাড়তে পারে আমদানিনির্ভরতা। তাই কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত দ্রুত প্রত্যাহার করা উচিত। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের একজন অধ্যাপকের কথাÑ প্রয়োজনে অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সময় কমিয়ে কিংবা সাপ্তাহিক ছুটি বাড়িয়ে বিদ্যুতে ভর্তুকি কমিয়ে কৃষিতে বাড়তি ভর্তুকি দিয়ে হলেও সার-ডিজেলসহ কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা উচিত। কেননা কৃষি উৎপাদন এবং কৃষক সমাজের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে ব্যর্থ হলে পরিশেষে সমগ্র জাতিকে কঠিন মূল্য দিতে হবে।

ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে কৃষি উৎপাদন খরচ কম করে হলেও ৪৫ শতাংশ বেড়ে যাবে বলে জানান কৃষক ও কৃষিবিদরা। ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার পলাশতলী গ্রামের কয়েকজন কৃষক জানান, সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রতি বিঘা ধান উৎপাদনে খরচ বাড়বে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। অন্যদিকে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রতি বিঘায় সেচ খরচ বাড়বে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। ত্রিশাল উপজেলার নওধার গ্রামের একজন কৃষক এক একর জমিতে আমন ধানের চাষ করেন। আগে এক একর জমিতে চাষ ও সেচে তার খরচ পড়ত প্রায় সাড়ে চার হাজার টাকা। জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন তার এক একর জমিতে ধান চাষে খরচ পড়বে সাত হাজার টাকা। কারও কারও মতে, ডিজেলের দাম বাড়ার ফলে জমি চাষে পাওয়ার টিলার ব্যবহারের জন্য বিঘাপ্রতি উঁচু-নিচু এলাকাভেদে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা খরচ বাড়বে।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন সম্প্রতি (১৪.৮.২০২২) জ্বালানি তেলের ওপর ধার্যকৃত শুল্ক প্রত্যাহার করে দাম কমানোর যে দাবি জানিয়েছেন তা খুবই যৌক্তিক এবং তা সচেতন মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে এক চিঠিতে বলেন, জ্বালানি তেলের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি অর্থনীতিকে বহুমাত্রিক চাপে ফেলবে।

কৃষি, পণ্য পরিবহন উৎপাদনসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই এর নেতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে; যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে এবং জনজীবনে দুর্ভোগ বাড়িয়ে দেবে।

দেশের অর্থনীতি বৈশ্বিক করোনা মহামারীর ধাক্কা কাটিয়ে যখন পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়ায় রয়েছে, তখনই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম ও জাহাজভাড়া প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচও বেড়ে যাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের পক্ষে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকাই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় জ্বালানি তেলের গড়ে ৪৭ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি জনজীবনে এক অভাবনীয় দুর্ভোগের সৃষ্টি করছে। জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে রপ্তানিপণ্যের দামও বেড়ে যাবে এবং তাতে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যাবে।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পাশাপাশি সরকার সারের দামও বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে কৃষিপণ্যের উৎপাদন খরচ অনেকটা বেড়ে যাবে। চলতি বছর বৃষ্টি কম হওয়ার কারণে দেশের অধিকাংশ কৃষককে সেচ দিয়ে আমন ধানের চারা রোপণ করতে হয়েছে। গত ২০-৩০ বছরেও এ ধরনের বৃষ্টিবিহীন শ্রাবণ মাস দেখেনি কৃষক। আমনের ফলন নিশ্চিত করতে হলে কৃষককে হয়তো আরও কয়েকবার সম্পূরক সেচ দিতে হবে। আসন্ন শীতের মৌসুমে সবজি ও বোরো ধানের পুরোটাই সেচনির্ভরশীল। গম, ভুট্টা ও আলু চাষেও সেচের বিকল্প নেই। ফলে সেচে ব্যবহৃত ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা প্রত্যাহার না করলে কৃষি খাতও ঝুঁকিতে পড়বে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে শিল্প, কৃষি খাতসহ সার্বিক অর্থনীতিতে যে অভিঘাত সৃষ্টি হয়েছে, তা সামাল দেওয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়বে। শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের এই উদ্বেগের কথা বিভিন্ন মহলে আগেও প্রতিধ্বনিত হয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাধজারে তেলের দাম কমলে বাংলাদেশেও জ্বালানি তেলের দাম কমানো হবে। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলে দাম কমতে শুরু করেছে। সরকার রাশিয়া থেকেও কম দামে তেল আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

জনসাধারণের স্বার্থে সরকার অনেক সময় চাল, চিনি ও পেঁয়াজের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর থেকে কর প্রত্যাহার করে পরিস্থিতি সামাল দেয়। বর্তমানে জ্বালানি তেলের ওপর ৩৪ শতাংশ শুল্ক-কর আরোপিত আছে। আর জ্বালানি তেলের গড়ে মূল্য বাড়ানো হয়েছে শতকরা ৪৭ ভাগ। সে হিসেবে জ্বালানি তেলের ওপর থেকে সম্পূর্ণ শুল্ক-কর প্রত্যাহার করে বর্ধিত দামের শতকরা ৭২ ভাগ কমানো সম্ভব। এতে দেশের কৃষি, শিল্প, পরিবহন ও রপ্তানি খাত উপকৃত হবে। মূল্যবৃদ্ধির নিপীড়ন থেকে রক্ষা পাবে দেশের আপাময় জনসাধারণ।

লেখক সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি), বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত