গণরুম, র‌্যাগিং ও গাছ কাটা

আপডেট : ০৮ জুন ২০২৩, ০৪:৪২ এএম

ঢাকার অদূরে সবুজে ঘেরা, শহরের কোলাহল ও ট্রাফিকমুক্ত একটি বিশ্ববিদ্যালয় জাহাঙ্গীরনগর। বিশ্ববিদ্যালয়টিকে দেশের মানুষ দেশের একমাত্র ‘সম্পূর্ণ আবাসিক’ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবেই চেনে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষ, এমনকি দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য হল প্রশাসন একটি সিটের ব্যবস্থা করতে পারে না। যে অসীম সম্ভাবনাময়ী ও আত্মপ্রত্যয়ী বয়সে শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার গঠন করার কথা, তখন তাদের গণরুম নামক এক ‘নরকে’ টিকে থাকার লড়াই করতে হয়। লাখ লাখ শিক্ষার্থীর মধ্য থেকে, হাজারো মেধাবী শিক্ষার্থীকে বেছে নিয়ে কীভাবে তাদের মেধা ও সম্ভাবনাকে নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গণরুম।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গণরুম নামক ‘নরকের’ বিলুপ্তি, অছাত্রদের হল থেকে বের করে দেওয়া ও নিয়মিত শিক্ষার্থীদের আবাসন নিশ্চিতের দাবিতে গত চারদিন ধরে ‘প্রত্যয়’ নামের একজন শিক্ষার্থী হলের বাইরে মাঠে অবস্থান করে প্রতিবাদ জানাচ্ছে।  একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে চার বছরের একটি স্নাতক সম্পন্ন করতে যান। অথচ তার স্নাতক কোর্সের অর্ধেক সমাপ্ত হওয়ার সময়ে তাকে হলে একটি সিটের দাবিতে খোলা আকাশের নিচে রাত-দিন অবস্থান করতে হচ্ছে। এই সময়ে প্রত্যয়ের জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত তরুণ ও শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দেওয়ার কথা, জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে জার্নাল লেখার কথা কিন্তু দেশের একমাত্র ‘আবাসিক’ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হয়েও তাকে হলে থাকার ন্যূনতম আবাসনের জন্য আন্দোলন করতে হচ্ছে। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি বলেছেন, ‘শিক্ষার্থীর দাবি যৌক্তিক, কিন্তু বাস্তবায়নে সময় লাগবে’। ভিসি মহোদয়ের বক্তব্যে আমার ন্যূনতম আস্থা নেই। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচ বছর পড়ালেখা করেছি। চার বছর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি হিসেবে জাতীয় দৈনিকে সাংবাদিকতা করেছি। একটি বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে ফাংশান করে, খুব কাছ থেকে দেখেছি। ভিসি আসে ভিসি যায়। প্রভোস্ট আসে, যায়। কিন্তু শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকটের সমাধান আসে না। প্রতি বছর নতুন ব্যাচ আসার আগে হল প্রশাসন ‘অছাত্রদের হল ছাড়তে’ বলে নিয়ম রক্ষার একটি নোটিস সাঁটান। তাদের দৌরাত্ম্য অতটুকুই। হল প্রশাসনের অছাত্রদের হল থেকে বের করার ইচ্ছে বা সাহস নেই। হল ছাড়া কেন, শিক্ষার্থীদের হলের সিট বণ্টনেও হল প্রশাসনের ন্যূনতম প্রভাব নেই। এমনকি কোনো হল প্রভোস্ট বলতে পারবেন না, তার হলে কতজন ছাত্র ও কতজন অছাত্র অবস্থান করছেন! আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণরুম বিলুপ্তি করে নিয়মিত ছাত্রদের সিট বণ্টনের দাবি করেছিলাম, তখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জবাব ছিল ‘নতুন হল হলেই আবাসন সমস্যার সমাধান হবে’।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি বছর হলের সিট সাপেক্ষে নতুন ভর্তি নেওয়া হয়। তাহলে যতজন নিয়মিত ছাত্র আছে তত সিটই আছে। তবু কেন দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা হলে সিট পান না? কারণ ছাত্রত্ব শেষ হওয়ার পরও দুই-তিনটি ব্যাচের শিক্ষার্থীরা হলে অবস্থান করেন। সেই সঙ্গে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের সিট দখলদারিত্ব তো আছেই! এখন যখন নতুন হল হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের আসন সংখ্যা বেড়েছে। ফলে শিক্ষার্থী ভর্তি সংখ্যাও বাড়বে। নতুন আঙ্গিকে দখলদারিত্ব শুরু হবে। ফলে সিস্টেমকে চ্যালেঞ্জ না করে, নতুন হল দিয়ে আবাসন সমস্যার সংকটের আশা ‘কুমিরের বাচ্চা দেখানোর গল্প’ ছাড়া কিছুই না।

গণরুমের অমানুষিক নির্যাতন : গণরুমের অবাসযোগ্য পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীদের আরেক নারকীয় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়। পৃথিবীর কোনো সভ্য সমাজে এটা ভাবা যায় না যে, চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে মেধাবীদের বাছাই করে তাদের গণরুমে রেখে রাত জাগিয়ে ‘ম্যানার শেখানোর’ নামে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়। গণরুমে যা হয় সবকিছু সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অবগত। কিন্তু হল প্রভোস্ট ‘অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা’ শীর্ষক ‘তোতাপাখির বুলি’ ছাড়া কোনো কিছুর ক্ষমতা রাখেন না। প্রক্টর অফিস জানে না, কতটি অভিযোগ তাদের দপ্তরে জমা আছে। র‌্যাগিং, নবীন শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, রাত জাগিয়ে রাখা, গ্রিলে ঝুলিয়ে রাখা এসব জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গণরুমের নিত্যদিনের চিত্র। গণরুমের কাছে গিয়ে কান পাতলেই শোনা যায় কী অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়। একজন সন্তানকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পৌঁছাতে বাবা-মায়ের বছরের বছর কী পরিমাণ আত্মত্যাগ করতে হয় তা শুধু মা-বাবাই জানেন। আর সে কাক্সিক্ষত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর রাত জাগিয়ে বাবা-মা’কে গালি শুনানো হয়। এটা কোন সভ্য দেশের প্রক্রিয়া? বাবা-মা কি সন্তানদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠিয়েছে রাত জেগে তাদের গালি শুনাতে? এসব বছরের পর বছর হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নাকের ডগায়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কী করেছে এবং করতে পেরেছে? কিছুই না।

গাছ কাটা নিষেধ : বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ‘অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প’ নামে মেগা উন্নয়ন প্রজেক্ট চলমান রয়েছে। এই প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা অংশীজন অতিথি পাখি যাতায়াত, আবাস্থল ও ন্যূনতম গাছ কেটে বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছিল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভিসি কোনো পরামর্শ, প্রস্তাবকে আমলে নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি। প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষার একটা দাবিতে তিনি শেষ পর্যন্ত শিক্ষক-শিক্ষার্থী দ্বন্দ্বে পরিণত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌহার্দ্যকে বিসর্জন দিয়েছেন। জাহাঙ্গীরনগরের অংশীজন প্রাণ-প্রকৃতির বেশ যতœশীল ও আবেগপ্রবণ। প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষার জন্য এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অনশনেও বসতে পারেন। এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয়, একটি তীব্র আন্দোলনের রেশ না কাটতেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ফের ‘মহাপরিকল্পনা’র বাইরে গিয়ে একটি সংরক্ষিত অঞ্চলে ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ ও উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকদের আপত্তির মুখে প্রশাসন এই প্রকল্প অনুমোদন করেছে। এখন ভবন নির্মাণে অমূল্য আরও ৫০০ গাছ কাটা যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে দৈনিক দেশ রূপান্তর, ২৫ মে, ২০২৩।

ইতিমধ্যে অপরিকল্পিত মহাপরিকল্পনার জন্য জাহাঙ্গীরনগরে সবুজ, প্রাণ-প্রকৃতি হুমকির মুখে। অথচ দেশের একমাত্র ওয়াইল্ড লাইফ রেসকিউ সেন্টারটি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত। সাবেক ভিসি ফারজানা ইসলাম জানিয়েছিলেন, তাকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন ‘জাহাঙ্গীরনগরের সুবজ যেন নষ্ট করা না হয়’। অথচ নির্বিচারে গাছের পর গাছ কেটে অপরিকল্পিত উন্নয়নের মধ্যে আবারও ৫০০ গাছ কাটার কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের রেশ বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে পড়তে শুরু করেছে ইতিমধ্যে। হয়তো আমাদের আগামী ভবিষ্যতের মধ্যে সবচেয়ে কম গরমের বছরটি আমরা পার করছি। আসছে বছর আরও তীব্র তাপপ্রবাহ অপেক্ষা করছে। পরের বছর তীব্রতর। এখন বৃক্ষ সৃজন, প্লাস্টিক বর্জন, পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর জ্বালানি-নির্ভর বিদুৎকেন্দ্র নির্মাণ বন্ধ করে ধরণীকে বাঁচানোর সময়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের সংকটের পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের আসার আগে অন্তত দেশের বুদ্ধিভিত্তিক জায়গাগুলোতে তৈরি হওয়া দরকার। ঢাকার মতো জায়গায় যেখানে একটি গাছ মানে একটি অমূল্য হীরা সেখানে সিটি করপোরেশন গাছ কেটে ফেলছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে ইতিমধ্যে প্রাণ-প্রকৃতি হুমকির সম্মুখীন সেখানে বেপরোয়া প্রশাসন ফের গাছ কাটার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন না পারছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষা করতে, না পারছে মেধাবী তরুণদের জীবনকে গতিশীল রাখতে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত