বঞ্চনায় বাফুফে ছাড়লেন ছোটন

আপডেট : ২৭ মে ২০২৩, ০৬:১২ এএম

নিজের হাতে গড়ে তোলা মেয়েদের হতাশা আর সহ্য করতে পারলেন না গোলাম রব্বানী ছোটন। এর সঙ্গে মেয়েদের ফুটবল এগিয়ে নিতে দীর্ঘ ১৪ বছর যে শ্রম-ঘাম দিয়েছেন, তার মূল্যায়নও হয়নি। সবকিছু মিলিয়ে ক্লান্তি-হতাশা পেয়ে বসেছিল তাকে। তাই তো হুট করেই বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ছোটন। আজ আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেবেন বাফুফে কার্যালয়ে।

আগামী ১ জুন থেকে তিনি আর থাকছেন না নারী ফুটবলের দায়িত্বে। বিষয়টি গতকাল শুক্রবার নিজেই দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছেন ছোটন।

মেয়েদের বয়সভিত্তিক থেকে শুরু করে জাতীয় দল সব আন্তর্জাতিক সাফল্যই এসেছে তার কোচিংয়ে। আজকের সাবিনা, সানজিদা, কৃষ্ণা, মারিয়াদের নিজের সন্তানের মতো লালন করে গড়ে তুলে দিয়েছেন মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর মন্ত্র। অথচ তার কাজের যোগ্য মূল্যায়ন করেনি বাফুফে।

এই তো কিছুদিন আগেও খোদ বাফুফের সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন ভিনদেশি টেকনিক্যাল ডিরেক্টর পল স্মলির কাজের ফিরিস্তি গাইতে গিয়ে সরাসরি অস্বীকার করেছেন ছোটনের অবদান। নিজেদের মধ্যে আলোচনায় প্রায়ই সালাউদ্দিন বলে থাকেন, মেয়েদের ফুটবলে ছোটনের তেমন কোনো অবদান নেই। সবকিছুই নাকি করেছেন পল স্মলি। পল চলে গেলে নাকি ৯ মাসেই ভেঙে পড়বে মেয়েদের ফুটবলের অবকাঠামো।

এতদিন এসব মুখ বুঝেই সহ্য করেছেন ছোটন। নিজের কাজটুকুতেই দিয়েছেন সব মনোযোগ। তবে সহ্যেরও একটা সীমা থাকে। সেই ২০০৯ সাল থেকে মেয়েদের ফুটবলের দায়িত্বে তিনি। ভোরের সূর্য ওঠার আগে থেকেই শুরু হয় তার ব্যস্ততা। কখনো সিনিয়র জাতীয় দল, কখনোবা বয়সভিত্তিক দল। ক্লান্তিহীন চলে তাদের নিয়ে কাজ। এরপর তো আছে পল স্মলির অযাচিত হস্তক্ষেপ ও খবরদারি।

পদে পদে ছোটনদের পলের কাছে দিতে হয় জবাবদিহিতা। সেটাও মানা যেত, যদি কাজের মূল্যায়ন হতো, মিলত যোগ্য পারিশ্রমিক। সেটাও তো হচ্ছে না। এমনকি বাফুফের সাধারণ সম্পাদক থেকে শুরু করে সুইপার পর্যন্ত যখন ঈদ বোনাস পান, তখন কোচদের ভাগ্যে জুটে না উৎসব-ভাতা। এভাবে আর কতদিন?

সেপ্টেম্বরে সাফ জয়ের পর থেকেই সাবিনা, কৃষ্ণারা অপেক্ষায় আছেন মাঠে নামার। তবে বাফুফের একের পর এক হঠকারী সিদ্ধান্তে খেলার সুযোগ হারাচ্ছেন মেয়েরা। কোচ হিসেবে তাই প্রতিনিয়ত ছোটনকে ফুটবলারদের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। এটাও তার দায়িত্ব ছাড়ার পেছনে অন্যতম কারণ বলে জানান।

চাকরি ছাড়ার কারণ হিসেবে ছোটন অবশ্য বাফুফের বঞ্চনাকে সামনে আনেননি। বরং ক্লান্তিকেই বড় হিসেবে সামনে এনেছেন অভিজ্ঞ এ কোচ, ‘সারা বছর মেয়েদের ক্যাম্প চলে। ভোর ৪টা থেকে শুরু হয়। কাজে কোনো বিশ্রাম নেই। ব্যক্তিগত জীবন বলতে কিছু নেই। পরিবার, বন্ধু-বান্ধব ভুলে বছরের পর বছর কাজ করছি। তারপরও দেশের মেয়েদের ফুটবল যতটা মূল্যায়িত হওয়া উচিত ছিল, সেটা হয়নি। এসব দিক চিন্তা করেই চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ৩১ মে পর্যন্ত থাকব। এরপর আর থাকব না।’ সাফ শিরোপা জয়ের পর নভেম্বরেই বাফুফের চাকরি ছাড়তে চেয়েছিলেন ছোটন, পদত্যাগপত্র জমাও দেন কিন্তু পরে মত পরিবর্তন করেন। এবারে পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার আগেই সংবাদমাধ্যমের কাছে নিজের ইচ্ছার কথা জানিয়ে দিয়ে ছোটন বুঝিয়ে দিলেন, ফেরার আর পথ নেই।

বাফুফের চাকরি ছাড়লেও ফুটবল কোচিং ছাড়ার কোনো ইচ্ছে ছোটনের নেই, ‘আনুষ্ঠানিকভাবে চাকরি ছাড়ার পর কিছুদিন শুধু বিশ্রাম নেব। এরপর যদি কোনো ক্লাবে কাজ করার সুযোগ পাই, করব।’

প্রিয় কোচের বিদায়ের খবরে পাথর হয়ে গেছেন জাতীয় দলের ক্যাম্পে থাকা ফুটবলাররা। তাদের জন্য এ খবর যে অনেক বড় ধাক্কা। সালাউদ্দিনদের কাছে ছোটন কিছু না। তবে সাবিনাদের কাছে তো ছোটনই সব। সেই কোচ যখন থাকছেন না, তখন তো হতাশায় ভেঙে পড়া স্বাভাবিকই।

ছোটনের এ সিদ্ধান্তের আগেই অবশ্য ক্যাম্পের একটা রুগ্ণ চিত্র উঠে আসে জাতীয় দলের অন্যতম স্ট্রাইকার সিরাত জাহান স্বপ্নার অসময়ে অবসরের ঘোষণায়। এ কার্যকর স্ট্রাইকার গতকাল ক্যাম্প ছেড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন পেশাদার ফুটবল ছাড়ার খবর।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত