দুই দিন জ্বরে আক্রান্ত থাকার পর চিকিৎসকের কাছে যান ইমরান হোসেন। জ্বর ও লক্ষণ দেখে চিকিৎসক তাকে ডেঙ্গু পরীক্ষা করার কথা বলেন। এরপর সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু শনাক্তের জন্য এনএস-১ পরীক্ষা করান। তবে ডেঙ্গু নেগেটিভ আসে। এরপর বাড়িতে ফিরে যান। কিন্তু জ্বর কমে না। ফের হাসপাতালে গিয়ে সিবিসি টেস্ট করান। এতে দেখা যায়, তার প্লাটিলেট কমে ৮৭ হাজারে নেমেছে। সঙ্গে বমি ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্যথার মতো ডেঙ্গুর অন্যান্য উপসর্গও রয়েছে। তখন চিকিৎসকের পরামর্শে হাসপাতালে ভর্তি হন।
ইমরান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাসপাতালে ভর্তির একদিন পর আবার আমার প্লাটিলেট বাড়তে থাকে। তখন ডাক্তার বাড়িতে গিয়ে চিকিৎসা নিতে বলেন। আমি ছাড়পত্র নিয়ে বাড়িতে চলে যাই।’ শুধু ইমরান নন, উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে গিয়ে পরীক্ষা করালে ডেঙ্গু নেগেটিভ এসেছে, কিন্তু প্লাটিলেট অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে এমন রোগীর সংখ্যা কম নয়।
রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আবু নোমান হাদী জ্বরে আক্রান্ত হন গত ১৮ আগস্ট। পরদিন রাজধানীর মগবাজারের ইনসাফ বারাকা কিডনি হাসপাতালে এনএস-১ টেস্ট করান। সেখানে তার ডেঙ্গু নেগেটিভ এলেও প্লাটিলেট পাওয়া যায় ১ লাখ ৪৫ হাজার। এখন ইস্কাটনে বাড়িতেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিচ্ছেন। তার শরীরেও ব্যথার মতো ডেঙ্গুর উপসর্গ রয়েছে।
হাসপাতালে ইমরান কিংবা নোমানের মতো রোগীর সংখ্যা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। তারা বলছেন, বর্তমানে ডেঙ্গুর মৌসুম চলছে। এর পাশাপাশি অন্যান্য ভাইরাস জ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। জ্বরে আক্রান্ত হয়ে কারও প্লাটিলেট আশঙ্কাজনক হারে কমে গেলে সেটিকে ডেঙ্গু ধরেই চিকিৎসা দিচ্ছেন তারা।
জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, প্লাটিলেটের স্বাভাবিক রেঞ্জ দেড় লাখ থেকে সাড়ে চার লাখ। বর্তমানে ডেঙ্গু ছাড়াও বিভিন্ন ভাইরাস জ্বরের কারণে প্লাটিলেট কমছে। তবে ডেঙ্গুর নমুনা পরীক্ষায় শতভাগ নির্ভুল ফলাফল আসে না।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, রিপোর্ট নেগেটিভ এলেই যে ডেঙ্গু হয়নি এই ভেবে বসে থাকলে জটিলতা আরও বাড়বে এবং মৃত্যুর আশঙ্কা তৈরি হবে। লক্ষণ ও উপসর্গ থাকলে কালক্ষেপণ না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। বিলম্বে সেবা নিতে আসার কারণে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু বাড়ছে বলে মনে করছেন তারা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্লাটিলেট কমা মানেই ডেঙ্গু নয়। বেশ কিছু কারণে রক্তে প্লাটিলেট কমতে পারে। সাধারণত ভাইরাস জ্বরে প্লাটিলেট কমে থাকে। এখন করোনা, ডেঙ্গু এবং সিজনাল সাধারণ জ্বর এই তিন ধরনের ভাইরাস জ্বর দেখা যাচ্ছে। কারও কিছু শারীরিক জটিলতার কারণেও প্লাটিলেট কমে। আবার কেউ বেশ কিছু ওষুধ খান, এজন্য প্লাটিলেট কমে। তাই জ্বর হলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে এবং জ্বরের কারণ অনুসন্ধান করতে হবে।
চিকিৎসকরা বলছেন, এনএস-১ পরীক্ষা মূলত ডেঙ্গু জ্বর হওয়ার বা লক্ষণ দেখা দেওয়ার পাঁচ দিনের মধ্যে করতে হয়। এ সময়ের মধ্যে এনএস-১ পরীক্ষার মাধ্যমে ডেঙ্গু শনাক্ত করা যেতে পারে। এরপর এটি আর কার্যকর হয় না। পঞ্চম দিন থেকে এনএস-১ নেগেটিভ হয়ে যেতে পারে। জ্বরের প্রথম তিন দিনের মধ্যে পরীক্ষা করলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়। সপ্তম দিনে আইজিএম পরীক্ষা করলে ডেঙ্গুর সঠিক ফলাফল পাওয়া যাবে। এরপর থেকে আইজিটি পরীক্ষা করতে হবে। এভাবে রোগীকে ধাপে ধাপে পরীক্ষা করে দেখতে হবে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত কি না। একই সঙ্গে প্লাটিলেট কাউন্ট পরীক্ষা চালিয়ে যেতে হবে। নিজেরা কোনো একটি পরীক্ষা করে নেগেটিভ রিপোর্ট পেয়ে বসে থাকলে হবে না।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, অন্যান্য ভাইরাস জ্বরে প্লাটিলেট সামান্য কমতে পারে। কিন্তু যদি কোনো রোগীর প্লাটিলেট ১ লাখ বা ১ লাখ ২০ হাজারের নিচে নেমে যায়, তাহলে তাকে ডেঙ্গু রোগীর মতোই চিকিৎসা নিতে হবে। ধরে নিতে হবে তার ডেঙ্গু হয়েছে। কারণ ডেঙ্গু পরীক্ষার ক্ষেত্রে এনএস-১ টেস্টে শতভাগ নির্ভুলভাবে ফলাফল পাওয়া যায় না। এই টেস্টের মাধ্যমে ৮০ শতাংশ সঠিক ফলাফল পাওয়া যায়। এখন ডেঙ্গুর মৌসুম চলছে। তাই যদি কারও প্লাটিলেট আশঙ্কাজনভাবে কমে যায়, তাহলে তাকে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে, কোনোরকম কালক্ষেপণ করা যাবে না। আমরা এটা বারবার বলছি, রিপোর্ট নেগেটিভ হলেও যদি লক্ষণ ও উপসর্গ থাকে তাহলে ডাক্তারের পরামর্শে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা নিতে হবে। তা নাহলে বিপদ বাড়বে।