সাভারে শ্রমিক বিক্ষোভ, গাজীপুরে বিজিবি মোতায়েন

আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০১৯, ০৪:৪৮ পিএম

নতুন ঘোষিত মজুরি কাঠামোতে বৈষম্যের অভিযোগ তুলে টানা চতুর্থ দিনের মতো ১২টি স্থানে বিক্ষোভ করেছে সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। এ সময় শ্রমিকরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক, বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর সড়ক ও বিশমাইল-জিরাবো সড়কে অবস্থান নেওয়ায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এদিকে, উদ্ভুত পরিস্থিতিতে যে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে গাজীপুরে ৪ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন পোশাক কারখানার সামনে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। বুধবার সকালে সাভারের উলাইল, কাঠগড়া, আশুলিয়ার জামগড়া, নরসিংহপুর, জিরাবো ও ধামরাইয়ের কচমচ এলাকায় এ সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে তৈরি পোশাক শ্রমিকরা।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা শ্রমিকদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দিতে চাইলে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। এ সময় পুলিশ টিয়ারশেল, রাবার বুলেট, জলকামান ব্যবহার করে ও লাঠিচার্জ করে তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। সকাল ৮ টা থেকে শুরু করে দুপুর দুইটা পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে থেমে থেমে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটে। এঘটনায় প্রায় ২০ টি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণাসহ বেশ কয়েকটি কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

শিল্প পুলিশ ও শ্রমিকরা জানান, সকাল ৮টায় সাভারের উলাইল এলাকার স্ট্যান্ডার্ড স্টীচেচ লিমিটেড কারখানার শ্রমিকরা কাজে যোগদানের জন্য কারখানায় আসেন। এসময় প্রতিষ্ঠানটির মূল ফটকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধের নোটিশ দেখতে পেয়ে শ্রমিকরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে।

কারখানাটির সুইং অপারেটর আল-আমিন বলেন, আমরা শান্তিপূর্ণভাবে কাজে যোগদান করতে আসলেও কর্তৃপক্ষ আমাদের ভেতরে ঢুকতে দেয়নি। উল্টো কারখানার ভাড়াটে লোকজন দিয়ে ছাদ থেকে আমাদের ওপর ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে হামলা চালায়।

এঘটনায় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা কারখানাটিতে ভাঙচুরের চেষ্টা করলে কর্তৃপক্ষ এবং পুলিশ সদ্যদের সঙ্গে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরে শ্রমিকরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে প্রায় আধ ঘণ্টা সড়কটি অবরোধ করে রাখে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ টিয়ারশেল, জলকামান ও লাঠিচার্জ করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

শ্রমিক বিক্ষোভের আশঙ্কায় স্থানীয় আল ইসলামসহ বেশ কয়েকটি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।

স্ট্যান্ডার্ড স্টীচেচ লিমিটেড কারখানার জেনারেল ম্যানেজার লুৎফর রহমান বলেন, বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনারা বাড়ি চলে যান, আগামী শনিবার পর্যন্ত কারখানাটি বন্ধ থাকবে। রবিবার কারখানা খোলার পর আপনাদের বকেয়া পাওনা পরিশোধ করা হবে।

এদিকে একই দাবিতে সকাল থেকেই গেন্ডা এলাকার আল মুসলিম গ্রুপের প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক কারখানার ভেতরে কর্মবিরতি পালন করেন। কিন্তু মালিকপক্ষ দাবির বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত না দেয়ায় সকাল ৯ টার দিকে সকল শ্রমিক একযোগে কারখানা থেকে বের হয়ে যায়। এ সময় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যে সড়কটিতে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।

সেখানে দুই প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পরে পুলিশ সদস্যরা শ্রমিকদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলে শ্রমিকরা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। এসময় পুলিশ শ্রমিকদেরকে ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ারশেল , জলকামান ও লাটিচার্জ করেন। শ্রমিকরা পিছু হটলেও পরবর্তীতে গেন্ডা বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে আবারও সড়ক অবরোধ করে। খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে পুলিশ শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দিলে তারা সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে সড়ক অবরোধ করে। এভাবে সকাল ৯ টা থেকে দুপুর দুইটা পর্যন্ত দফায় দফায় সড়ক অবরোধ, ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশসহ অন্তত অর্ধশত শ্রমিক আহত হয়। আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

আল মুসলিম গ্রুপের নারী শ্রমিক মালেকা বলেন, নতুন মজুরি কাঠামোতে হেলপারদের তিন হাজার টাকা বাড়লেও অপারেটরদের বেড়েছে মাত্র এক হাজার টাকা। কারখানার ভেতরে মোবাইল নিতে না দেয়ায় আমরা অসুস্থ হলে কিংবা কেউ মারা গেলেও খবর পাই না।

অন্যদিকে একই দাবিতে আশুলিয়ার কাঠগড়া, আমতলা, জামগড়া, নরসিংহপুর, ঘোষবাগ, নিশ্চিন্তপুর, সরকার মার্কেট এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে শ্রমিক বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে। পুলিশের সঙ্গে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের চলে দফায় দফায় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ শ্রমিকদের ওপর টিয়াসেল ও লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

শিল্প পুলিশ-১ এর পরিচালক সানা শামিনুর রহমান বলেন, কারখানাগুলোতে কাজের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। ইতিমধ্যে সমস্যা সমাধানের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে উচ্চ পর্যায়ের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা মজুরি কাঠামোর বিষয়টি পর্যালোচনা করছে। এ সময় তিনি বর্তমান সরকারকে শ্রমিক বান্ধব সরকার উল্লেখ করে তিনি শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান।

তিনি আরও বলেন, সকালে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা রাস্তা অবরোধের চেষ্টা করলে আমরা তাদেরকে সরিয়ে দিই। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। এ ছাড়া যে কোন ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি জলকামান ও সাঁজোয়া যানের মহড়া অব্যাহত আছে।

উল্লেখ্য, চলমান শ্রমিক বিক্ষোভের মঙ্গলবার শ্রমিক পুলিশ সংঘর্ষের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে সুমন মিয়া (২২) নামে আনলিমা পোশাক কারখানার এক শ্রমিক মারা গেছে।

গাজীপুরে গত কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকদের বিক্ষোভ, মহাসড়ক অবরোধ, যানবাহন ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগে ঘটনা রোধে জেলার বিভিন্ন স্থানে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।

গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ড. দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ূন কবীর জানান, পোশাক শ্রমিকদের বিশৃংখলা রোধে গাজীপুরের টঙ্গী, গাজীপুরা, হোতাপাড়া, কোনাবাড়ি ও মৌচাক এলাকায় ৪ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। একজন নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেটের নেতৃত্বে বুধবার সকাল থেকে বিজিবি সদস্যরা কাজ শুরু করেছে।

উল্লেখ্য, গত চারদিন ধরে গাজীপুরের বিভিন্ন স্থানে পোশাক কারখানার শ্রমিকরা তাদের বেতন ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে বিক্ষোভ, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও মহাসড়ক অবরোধ করছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত