সোমবার, ১৫ জুলাই ২০২৪, ৩০ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

খাদিম রেইন ফরেস্টে এক দিন

আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০১৯, ০১:০৭ পিএম

রাস্তার দুপাশে ঘন সবুজ বন । বনের ভেতর থেকে ভেসে আসছে ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক। সঙ্গে তাল মেলাচ্ছে পাখি। আশপাশে জনবসতির অস্তিত্ব চোখে পড়ছে না। দুপাশের টিলার গাছের ডাল নুয়ে পড়েছে রাস্তার ওপর। সবুজের ছাউনির এই রাস্তা নেমে গেছে সিলেটের খাদিমনগর জাতীয় উদ্যানের বুক চিরে।

খাদিম নগর জাতীয় উদ্যানের সৌন্দর্য উপভোগ করতে আপনাকে সাহসী আর পরিশ্রমী হতে হবে। তাহলে আপনি দেখা পেতে পারেন মুখপোড়া বানর, হনুমান, কাঠবিড়ালিসহ অনেক কিছুর। সিলেটে শহর থেকে ৫ কি.মি দূরেই খাদিম রেইন ফরেস্ট। সিলেট শহর থেকে জাফলং রোডে হজরত শাহপরানের মাজারের পর বাম পাশে খাদিম নগর টি এস্টেটের রাস্তা ধরে কিছুদূর এগোলেই বনের শুরু। এখানে দুটি ট্রেইল ধরে ট্রেকিং করতে পারেন, ছোট ট্রেইলে ৪৫ মিনিট আর বড় ট্রেইলে দুই ঘণ্টার। এর সঙ্গে খাদিম ফরেস্টে যুক্ত হয়েছে ট্রি অ্যাকটিভিটিজ আর জিপ লাইন। এই নতুন দুই অ্যাকটিভিটিজ স্বাদ পাওয়ার জন্যই এবার আমি, আমার মা, সানন্দা আর সুকান্ত যাচ্ছি খাদিম ফরেস্টে।

image

সিলেট শহর থেকে জিন্দাবাজার, বন্দরবাজার, মিরা বাজার পেরিয়ে আমরা এগিয়ে সহসাই পেঁৗঁছে গেলাম খাদিম ফরেস্টে ঢোকার রাস্তায়। দুই পাশেই চা বাগান একদিকে খাদিম চা বাগান অন্য দিকে বুরজান। বাগানের রাস্তা তাই কোথাও পিচ কোথাও মাটি। এখানকার চা বাগানগুলো খুব সুন্দর। প্রতিটি বাড়ির সামনে বাঁশের বেড়া দেওয়া এক চিলতে ফুলের বাগান। চা কারখানা, চা শ্রমিকের বাড়িঘর দেখছি আর হাঁটছি বাগানের পথ ধরে। যতই এগোচ্ছি ততই নির্জনতা বাড়ছে। বিভিন্ন পাখির ডাক শুনছি। ৪৫ মিনিট হাঁটার পর পৌঁছলাম ফরেস্টের বিট অফিসে। বিট অফিসে গিয়েই দেখা পেলাম যোগ হওয়া নতুন দুটি অ্যাক্টিভিটি। ১০০ টাকা করে নতুন দুটি অ্যাক্টিভিটির টিকিট কাটলাম। সঙ্গে আমাদের মতো বেশ কয়েকজন পর্যটক আছে।

প্রথমে দেখে মনে হয়েছিল খুব সহজ কিন্তু ওপরে ওঠার বিষয়টা ভালোই কঠিন। মনে মনে বেশ ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলাম এই বুঝি পরে যাব। বিশেষ করে লাস্ট দুইটা অ্যাক্টিভিটি বেশ কঠিন। এই শীতের মধ্যেও আমরা ঘামছিলাম। যাদের উচ্চতা ভীতি আছে তাদের না করাই ভালো। জিপ রোলিংটা অসাধারণ। যদিও দূরত্ব অনেক তারপরও ৬ থেকে ৭ সেকেন্ডেই শেষ হয়ে যাবে। দুই অ্যাক্টিভিটির কাজ শেষে সেখানে কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে শুরু করলাম ট্রেকিং।

আগেই বলেছি এখানে দুটি ট্রেইল ধরে ট্রেকিং করতে পারেন, ছোট ট্রেইলে ৪৫ মিনিট আর বড় ট্রেইলে দু ঘণ্টা। আমরা দুই ঘণ্টার পথে যাত্রা শুরু করলাম। সরু পথ ধরে আমরা হাঁটছি ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে। দুপাশের ঘন ডালপালা নুয়ে এসে পায়ে চলা পথকে সুড়ঙ্গ বানিয়ে ফেলেছে, কিছুটা অন্ধকার। পথের মাঝে পাবেন স্বচ্ছ পানির ছড়া। তবে শীতকাল বলে অনেক জায়গায় শুকিয়ে আছে। কাদামাখা পায়ে নিঃশব্দে হেঁটে যাচ্ছি । এর মধ্যে অবশ্য রক্তদান প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, পা থেকে টেনে জোঁক উঠালাম দুইটা। সামনে ট্রেইলটা আরও সরু, জঙ্গল একদম ঘন হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে ছড়া বয়ে গেছে বেশ কিছু। খুব বেশি হলে হাঁটু পানি হবে, মানে এগুলো বর্ষাকালীন ছড়া। পাড়ের বালুটা খুব নরম, পা দিতেই চোরাবালির মতো দেবে গেল। একটু টিলার মতো জায়গা পেরিয়ে আবার মোটামুটি সমতল। পথে দেখা পেলাম বানর দলের। আরও কিছু দূর যাওয়ার পর বিরল প্রজাতির মুখপোড়া হনুমান দেখলাম। আমাদের গাইড বিভিন্ন প্রজাতির গাছের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। আস্তে আস্তে জঙ্গল গভীর হচ্ছে যে হাঁটা যাচ্ছে না, শুরু হলো বসে বসে ক্রল করা। ওপরে আবার বেতের ঝাড় আর কিছু নাম না জানা কাঁটাগাছ। হাতে পায়ে গায়ে সমানে আটকে যাচ্ছে কাঁটাগুলো, আমরা বসে বসে এগোচ্ছি ।

ঘন জঙ্গল, বিশাল লম্বা লম্বা গাছে ঢাকা পথ হেঁটে আরও দুয়েকটা ঝিরি পার হলাম, সামনে এসে দাঁড়ালো দুর্ভেদ্য জঙ্গল। একদম ডেড এন্ড, গাছ না কেটে এগোনোই যাবে না। আমাদের গাইড দা দিয়ে ঝোপ কেটে আমাদের রাস্তা করে দিলেন। পায়ের দিকে তাকালেই ঝামেলা, জোঁক তুলতে হয়। বেশ কয়েক জন ভয়ে ফিরে যেতে চাচ্ছিলেন কিন্তু ফেরার উপায় না পেয়ে আমরা আবার ফিরে চললাম ট্রেইল ধরে। ততক্ষণে অবশ্য এক ঘণ্টার বেশিই হয়ে গেছে। বনের ভেতরে নির্জনতা আর মনের ভেতরের ভয় সব মিলিয়ে এক বিচিত্র সময় পার করছি। এভাবে আরও এক ঘণ্টা পর ফিরতি পথ ধরলাম। একই পথে ফিরে এলাম। ভাগ্যিস আমরা গাইড পেয়েছিলাম না হলে এই রেইন ফরেস্টের ভেতর থেকে বের হওয়া সত্যিই কঠিন কাজ ছিল।

কীভাবে যাবেন ও খরচ

খাদিমনগর যেতে হলে আপনাকে প্রথমে সিলেট আসতে হবে। তারপর আম্বরখানা থেকে টিলাগড়ের সিএনজি ভাড়া ১৫ টাকা, আর টিলাগড় থেকে শাহপরানের সিএনজি ভাড়া ১০ টাকা এবং শাহপরান থেকে চৌমুহুনীর সিএনজি ১০ থেকে ১৫ টাকা এবং চৌমুহুনী থেকে খাদিমনগর ৩০ টাকা। এভাবে ভেঙে লোকাল সিএনজিতে আসতে পারেন। অথবা ৭৫ টাকা দিয়ে একেবারে চলে আসা যাবে। তাছাড়া মাইক্রোবাস নিয়ে আসা-যাওয়া দুটোই করতে পারেন খরচ পরবে সিলেট বন্দর বাজার থেকে ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা। সারা দিনের জন্য শহর থেকে গন্তব্যে পৌঁছাতে সময় লাগবে মাত্র ৩০ মিনিট। ফরেস্টে এন্ট্রি ফি ২৩ টাকা, ট্রি অ্যাক্টিভিটি ১০০ টাকা, জিপ রোলিং ১০০ টাকা, ২ ঘণ্টার ট্রেকিং চার্জ ৫০০ টাকা থেকে ১৫০০ টাকা (দরদাম করে নিতে হবে)।

বনে প্রবেশের জন্য অনুমতি অথবা যে কোনো তথ্যর জন্য কাদির ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। ফোন : ০১৭৩৭৮৫৩৭১৩, ০১৮৭৮০৯৬৪৫৭। থাকার জন্য সিলেট শহরে ভালো মানের হোটেল পাবেন খরচ পড়বে ১২০০ থেকে ৫০০০ টাকা।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত