যমজ শিশুর রহস্য কোথায়
ধারণা করা হয়, পুরো পৃথিবীর ৩ শতাংশ মানুষ যমজ। এই ৩ শতাংশ নিয়ে মানুষের আগ্রহের কোনো শেষ নেই। চিকিৎসাশাস্ত্র অনুযায়ী, মায়ের গর্ভে দুটি শুক্রাণু একসঙ্গে একটি ডিম্বাণুর সঙ্গে অথবা দুটি ভিন্ন ডিম্বাণুর সঙ্গে নিষিক্ত হয়ে যমজ সন্তানের জন্ম হয়। দুটি ভিন্ন ডিম্বাণুর সঙ্গে দুটি শুক্রাণু নিষিক্ত হয়ে যে যমজের জন্ম হয়, বৈশিষ্ট্যগতভাবে তারা কিছুটা ভিন্ন হয়। কিন্তু একই ডিম্বাণুর সঙ্গে দুটি শুক্রাণু নিষিক্ত হয়ে সমান দুভাগে বিভক্ত হয়ে যমজ শিশুর জন্ম হলে তাদের বৈশিষ্ট্য অনেকটাই একই রকম হয়। এদের আইডেন্টিকাল টুইন বলা হয়। যমজ শিশু হওয়ার এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে গবেষকদের সুস্পষ্ট মত থাকলেও পৃথিবীর কয়েকটি বিশেষ এলাকায় কেন এই জন্মহার বেশি, তা নিয়ে এখনো অন্ধকারে তারা। কয়েকটি যমজপ্রবণ এলাকা নিয়ে লিখেছেন পরাগ মাঝি
গ্রামের নাম কোদিনহি
কেরালার মাল্লাপুরম জেলার প্রত্যন্ত কোদিনহি গ্রামের ইট-কাঠ-পাথরে আজও দানা বেঁধে আছে রহস্য। যমজদের গ্রাম নামেই এই গ্রামের অধিক পরিচিতি। আশ্চর্যের বিষয়, এই গ্রামে প্রতি হাজার জনে ৪৫ জনই যমজ। আর সংখ্যাটা দিন দিন বেড়েই চলেছে। ১০০ জোড়া, ২০০ জোড়া থেকে বর্তমানে সংখ্যাটা ৪০০ জোড়া। এই গ্রাম থেকে যেসব মেয়ে বিয়ের পর বাইরের গ্রামে যান সেখানেও তারা যমজ সন্তানের জন্ম দেন। আর বিয়ের পর বাইরে থেকে গ্রামটিতে আসা নারীরাও সমান হারেই যমজ সন্তান জন্ম দিয়ে যাচ্ছেন। কী এর কারণ? এটা কি কোদিনহি গ্রামের মাটির গুণ, নাকি অন্য কিছু?
সবার আগে যমজ দুই বোন
কালিকট থেকে ৩৫ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং মাল্লাপুরম থেকে ৩০ কিলোমিটার পশ্চিমে কোদিনহি গ্রাম আজও বিজ্ঞানীদের কাছে গোলকধাঁধার মতো। সদ্যোজাত থেকে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, এই গ্রামে জোড়ায় জোড়ায় মিল। ২০০৮ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী গ্রামটিতে দুই হাজার পরিবারের বসবাস ছিল। তাদের অধিকাংশই সুন্নি মুসলিম। বর্তমানে গ্রামটির প্রায় সব বাড়িতেই জন্ম নিচ্ছে যমজ শিশু।
গ্রামবাসী জানায়, গ্রামটিতে সর্বপ্রথম যমজ শিশু জন্মের ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৪৯ সালে। তারা ছিলেন যমজ দুই বোন। তাদের বিয়ে হয় বাইরের গ্রামে। কিন্তু সেখানে গিয়েও যমজ সন্তান প্রসব করেছিলেন দুজনই। সেই শুরু। পরেরটা ইতিহাস হয়ে গেছে।
সাড়া পড়ে ২০০৬ সালে
গ্রামে ঢোকার মুখেই নজর কাড়ে রাস্তার পাশের একটা নীল রঙের সাইনবোর্ড। তাতে লেখা, ‘ঈশ্বরের নিজের যমজদের গ্রামে স্বাগত।’ সেখান থেকে রাস্তাটা সোজা চলে গেছে কোদিনহিতে। ছোট্ট গ্রাম। পাশাপাশি ঘিঞ্জি ঘরবাড়ি। অভাবের ছাপ স্পষ্ট বাড়িগুলির দেয়ালে, উঠোনে, ঘরের আনাচে কানাচে। গ্রামে ‘টুইনস অ্যান্ড কিনস অ্যাসোসিয়েশন’-এর কর্ণধার পি ভাস্করন বলেন, ‘কেন এখানে এমনটা হচ্ছে, তা জানতে আমরা বদ্ধপরিকর। গবেষণা চলছে, প্রাথমিক অনুমানও করা গেছে, তবে স্বচ্ছ সমাধান এখনো মেলেনি।’
কোদিনহিতে দুই পুরুষের বাস ভাস্করনের। তার পরিবারেও রয়েছে যমজ সন্তান। জানিয়েছেন, এই অবিশ্বাস্য ঘটনার পেছনে কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা জাতি দায়ী নয়। কারণ ভিন্ন ধর্মের মধ্যেও দেখা গেছে এই ব্যতিক্রম। গ্রামের মানুষ বাইরে গিয়েও যমজ সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। আবার বাইরের গ্রাম থেকে কোদিনহিতে এসে বসতি গড়ে তুলেছে, এমন পরিবারেও দেখা গেছে যমজের চমক। ভাস্করন জানিয়েছেন, যমজ শিশু জন্মের ধারা ৬০-৭০ বছর আগে শুরু হলেও ২০০৬ সালে বেশ কয়েকটি পরিবারে যমজ সন্তান জন্মানোর পরই বেশ নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। কারণ অনুসন্ধানে তৎপর হন স্থানীয় চিকিৎসকরা। খবর যায় বিজ্ঞানীদের কাছেও।
সত্য অনুসন্ধানে বিজ্ঞানীদের মিশন
২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে হায়দরাবাদের ‘সেন্টার ফর সেলুলার অ্যান্ড মলিকিউলার বায়োলজি’ এবং ‘কেরল ইউনিভার্সিটি অব ফিশারিজ অ্যান্ড ওসান স্টাডিজ’ কোদিনহিতে এসে গবেষণা শুরু করে। লন্ডন ও জার্মানি থেকেও গবেষকরা এসে ভিড় করছেন এই গ্রামে। যমজ ছেলেমেয়েদের চুল, নখ, থুতুর নমুনা সংগ্রহ করে শুরু হয় গবেষণা। কেরল ইউনিভার্সিটি অব ফিশারিজ অ্যান্ড ওসেন স্টাডিজ-এর অধ্যাপক এবং গবেষক ই প্রীথাম বলেন, ‘এই ঘটনা একেবারেই কাকতালীয় নয়। এর পেছনে রয়েছে অন্য কারণ। তবে শুধু শারীরিক নয়, নানা বিষয় এর জন্য দায়ী হতে পারে। সেই কারণগুলোই খোঁজার চেষ্টা চলছে।’
কোদিনহি গ্রামে সদ্যোজাত থেকে ১০ বছর বয়সী যমজের সংখ্যা ৭৯ জোড়া। দুই জোড়া ট্রিপলেটও রয়েছে। স্থানীয় একটি স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী সমিরা ও ফেমিনা জানায়, তাদের ক্লাসেই আট জোড়া যমজ মেয়ে রয়েছে। শিক্ষিকরাও নাকি মাঝেমধ্যে বিভ্রান্ত হয়ে যান।
শুধু ক্লাস নয়, সমিরা ও ফেমিনার স্কুলে মোট যমজ পড়–য়ার সংখ্যা ২৪। আরও মজার বিষয় হলো, যমজ পড়–য়াদের ক্লাস নিতেও আসেন যমজ শিক্ষক-শিক্ষিকারা। ২০০০ সালে কোদিনহির বাসিন্দা মজিদকে বিয়ে করে গ্রামে সংসার পাতেন সামসাদ বেগম। এখন তার বয়স ৪১। তিনি বলেন, ১৪ বছর আগে যমজ মেয়ের জন্ম দিয়েছিলেন তিনি। ইশহানা ও সাহানা। এখন তারা নবম শ্রেণিতে পড়ে। তাদের স্কুলেও রয়েছে একাধিক যমজ শিক্ষার্থী।
রহস্যের বীজটি কোথায়
‘টুইনস অ্যান্ড কিনস অ্যাসোসিয়েশন’ কর্ণধার পি ভাস্করন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘২০০৮ সালে আমরা একটা ছোট কমিটি তৈরি করি। যেখানে যমজদের নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়। তাদের ডিএনএর নমুনা বিদেশেও পাঠানো হয়। তখন গ্রামে যমজের সংখ্যা ছিল ২৮০ জোড়া। সেটা বেড়ে এখন হয়েছে ৪০০ জোড়া।’ তিনি আরও বলেন, ‘চীন বা ব্রাজিলের মতো কৃত্রিম চিকিৎসা এখানে হয় না। স্বাভাবিকভাবেই সন্তানের জন্ম দেন মায়েরা। তাহলে রহস্যটা কোথায়?’
কেরল ইউনিভার্সিটি অব ফিশারিজ অ্যান্ড ওসেন স্টাডিজ-এর বিজ্ঞানী ই প্রিথামের মতে, ‘আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম গোটা ব্যাপারটা হয়তো সম্পূর্ণ জিনগত। তবে এখন দেখছি সেটা নয়। নানা ধর্ম, নানা খাদ্যাভ্যাস ও সংস্কৃতির মানুষ রয়েছে গ্রামে। সকলের ক্ষেত্রেই একই রকম ঘটনা ঘটা সম্ভব নয়।’ প্রিথামের দাবি, গ্রামের জল, খাদ্য, বাতাস সব কিছুতেই লুকিয়ে রয়েছে রহস্য। গ্রামের মানুষ যে জল পান করে তাতে থাকতে পারে এমন রাসায়নিক যা শিশুর জন্মের সঙ্গে সম্পর্কিত। অথবা বিশেষ কোনো খাবার যা গ্রামের মানুষ খেয়ে আসছে, সেখান থেকেও এমনটা হওয়া আশ্চর্য নয়। তবে এই অনুমানগুলো এখনো প্রাথমিক স্তরে বলেই জানিয়েছেন তিনি। ধাঁধার উত্তর পেতে আরও অনেক মাথা ঘামাতে হবে বিজ্ঞানীদের। স্থানীয় চিকিৎসক কৃষ্ণণ শ্রীবিজু জানান, ৪০০ জোড়া যমজ বলা হয়েছে সরকারি সূত্রে। তবে যমজের সংখ্যা উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে। যমজ সন্তানের জন্ম দিয়েই চলেছেন মায়েরা। এর যেন বিরাম নেই। বিজ্ঞানের জটিলতা কোদিনহি গ্রামের বাসিন্দারা বোঝে না। অটো চালিয়ে কিংবা হাড়-ভাঙা খাটুনি করে দুই পয়সা রোজগার করে তারা। তবু গ্রামটিতে যমজ রহস্যকে ঈশ^রের কৃপা হিসেবেই দেখছে তারা। তাদের মতে, ঈশ^রের আশীর্বাদ কোদিনহি গ্রাম। সন্তানরাও জন্মাচ্ছে ঈশ্বরের কৃপাতেই। দারিদ্র্য তাদের নিত্যসঙ্গী হলেও যমজ শিশুর রহস্য নিয়ে সুখেই আছে তারা।

যমজ যারা, কেমন তারা
যমজ শিশুদের নিয়ে মানুষের কৌতূহলের কোনো শেষ নেই। এই কৌতূহলের জন্য অনেক যমজকেই পথেঘাটে নানা ধরনের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। এসব প্রশ্নের কিছু উত্তর আছে এখানে
যমজরা আঙুলের ছাপে আলাদা : চেহারায় একে অন্যের প্রতিচ্ছবি হলেও যমজদের আঙুলের ছাপ এক নয়। এমনকি তাদের ডিএনএও আলাদা। অভিন্ন যুগল অর্থাৎ ছেলে-ছেলে অথবা মেয়ে-মেয়ে যমজের ক্ষেত্রেও আলাদা ডিএনএর সিকোয়েন্স দেখা যায়। এ ছাড়া ছেলে-মেয়ে যমজদের চেহারা সাধারণত এক রকম হয় না।
একে অন্যের সেরা বন্ধু : জন্মগতভাবেই তারা একে অপরের সবচেয়ে ভালো বন্ধু। তাদের মধ্যে অনেক সময় রাগ-অভিমান কাজ করলেও একে অপরের প্রতি তাদের টান আর সবকিছুকেই হার মানায়।
একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয় : অনেকেই ভাবেন, যমজরা নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু দেখা গেছে, একই প্রতিযোগিতায় অংশ নিলেও তাদের মধ্যে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী মনোভাব গড়ে ওঠে না। অভিন্ন যুগলদের মধ্যে এমনটা হয় না বললেই চলে।
একে অন্যের মনের খবর জানা : এই দাবিটি অনেক যমজই করে থাকেন। তারা একজন অপরজনের মনে কী চলছে তা পড়তে পারেন। এমনকি একে অন্যের কাছ থেকে অনেক দূরে থাকলেও তারা একজন অপরজনের বিপদ সম্পর্কে আঁচ করতে পারেন বলে দাবি করা হয়।
ব্যক্তিত্ব আলাদা : যমজ চেহারার পাশাপাশি দুজন একই আদর্শ এবং চিন্তাধারার হবেনÑ এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। তাদের ব্যক্তিত্ব আলাদা। আলাদা হতে পারে তাদের রুচিবোধ, এমনকি পছন্দও। তাদের কেউ কোনো উপহার দিতে চাইলে দুজনের পছন্দ আলাদাভাবে জেনে নেওয়া উচিত।
নিজেদের নিয়ে গর্ববোধ : পৃথিবীর মাত্র ৩ শতাংশ মানুষের মধ্যে অবস্থান অন্যদের কাছ থেকে কিছুটা আলাদা করে তোলে। এই আলাদা অবস্থানকে তারা খুব উপভোগ করে। এমনকি যমজ হিসেবে তাদের গর্বিত হতেও দেখা যায়।
ঝগড়া মূলত কে বড় নিয়ে : জন্মের সময় সাধারণত কয়েক মিনিটের ব্যবধান থাকে যমজদের। কিন্তু তাদের মধ্যে যে আগে পৃথিবীতে এসেছে, সে কিছুটা বড় ভাই কিংবা বোনের কর্র্তৃত্ব ফলাতে চেষ্টা করে। যদিও এটা বেশির ভাগ সময় মজা করেই।
যমজ লালন-পালন সহজ : একসঙ্গে দুটি ভিন্ন বয়সী বাচ্চাকে লালন-পালন করার চেয়ে যমজ শিশুকে লালন-পালন করা অনেক সহজ। কারণ তাদের বয়স একই হওয়ায় তাদেও মধ্যে মনের মিল বেশি এবং চাহিদাও প্রায় একই রকম।
অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় : যমজদের ঘিরে সাধারণ মানুষের কৌতূহলের কোনো শেষ নেই। তাই তাদের খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে মানুষ এবং নানা ধরনের প্রশ্ন করে। এসব পশ্নের উত্তর দিতে দিতে অনেক সময় বিরক্তিও আসে তাদের মধ্যে।

যমজ সন্তানের গ্রাম আছে ইউক্রেনেও
ইউক্রেনের দক্ষিণ-পশ্চিমের একটি ছোট্ট গ্রাম ভেলিকানা কোপানা। এই গ্রামের বাসিন্দা চার হাজারের কম হলেও বলা হয়, বিশে^র সবচেয়ে বেশি যমজদের বাস সেখানে।
৬১ জোড়া যমজ সন্তানের এই গ্রাম এখন ইউক্রেনের রেকর্ড বুকেও নিজের নাম নথিভুক্ত করেছে। শুধু তাই নয়, গত বছর মে মাসেই গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডেও যমজ ভূমি হিসেবে গ্রামটির নাম নথিভুক্ত হয়। ২০০৪ সাল থেকে ভেলিকানা কোপানায় যমজ শিশুদের সংখ্যা বাড়তে শুরু হয়। এরপর থেকে প্রতিবছরই গ্রামটিতে তিন থেকে চার জোড়া যমজ শিশুর জন্ম হয়। স্থানীয়দের বিশ্বাস, জমজ শিশু জন্ম নেওয়ার পেছনে রয়েছে বিশেষ পানি।
ওই গ্রামের যমজ দুই ভাইয়ের একজন জুরিয়ে সেভিরা জানায়, তার বাবা স্থানীয় বিশেষ পানি খেয়েছিল। জানা গেছে, গ্রামটির কয়েকটি গাভীও যমজ বাচ্চা প্রসব করেছে।
ব্রাজিলের যমজ গ্রামের নাম ক্যানডিডো

ব্রাজিলের দক্ষিণাঞ্চলের প্রত্যন্ত গ্রামের ক্যানডিডো গডোইয়ে প্রায় সাত হাজার মানুষ বসবাস করে। গ্রামটি অন্যান্য আট-দশটা গ্রামের মতো হলেও যমজ শিশুর বৈশিষ্ট্য এটিকে সবার থেকে আলাদা করেছে। ব্রাজিলে যমজ শিশু জন্মের জাতীয় গড়ের চেয়ে এই গ্রামের হার ১০ গুণ বেশি। তবে এই গ্রামে কেন এত যমজ শিশুর জন্ম হয় তা কেউ জানে না। প্রজনন বিশেষজ্ঞের একটি দল কয়েক বছর ধরে এই গ্রামটির ওপর গবেষণা করছে। রহস্য উদঘাটনে গবেষকরা গ্রামের লোকজনের ডিএনএ সংগ্রহ করছে এবং পরিবারগুলো সম্পর্কে জানার চেষ্টা করছে। ক্যানডিডো গডোইয়ে যমজ বোনদের একজন লুসিয়া বলেন, ‘এটা আমাদের জন্য খুব স্বাভাবিক। আমাদের স্কুলেও অনেক যমজ শিক্ষার্থী ছিল। আমাদের অনেক বন্ধুও যমজ ছিল, আমার চাচাতো ভাই-বোনেরা জমজ। কেউ যমজ না হলেই বরং দৃষ্টিকটু লাগে। মনে হয়, এটি ব্যতিক্রম।’ কেউ জানে না কেন এমনটা হয়। অনেকে মনে করে এই গ্রামের পানিতে কিছু একটা আছে, যার কারণে যমজ হয়। প্রতি দুই বছর পরপর এই গ্রামটিতে শতাধিক যমজ নিয়ে অনেক বড় একটি উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।

যমজের রাজধানী ইগবো ওরা
নাইজেরিয়ার ছোট্ট শহর ইগবো ওরায় প্রতি হাজারে যমজের সংখ্যা গড়ে ১৫৮টি। এ কারণে ইগবো ওরাকে বলা হয়, যমজের রাজধানী। ইগবো ওরায় যমজ সন্তানের পরিসংখ্যানটি বিস্মিত করেছে বিজ্ঞানীদের। নাইজেরিয়ার শহর ওয়ো স্টেট থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরত্বের ছোট্ট শহর ইগবো ওরায় কেন এত বেশি যমজের জন্ম হয় সেই রহস্য উদঘাটন করা এখনো সম্ভব হয়নি।
ইগবো ওরায় বেড়াতে গেলে রাস্তায় চোখে পড়বে অসংখ্য যমজ। বেশির ভাগ বাড়িতেই রয়েছে অন্তত এক জোড়া সন্তান। এখানে কেউ গর্ভবতী হলেই ধরে নেওয়া হয়, যমজ সন্তান জন্ম নিতে যাচ্ছে। যমজ না জন্মানোটাই এখানে বিস্ময়ের ব্যাপার। ইগবো ওরায় যমজ সন্তানের রহস্য উদঘাটনে তাই এই অঞ্চলের মানুষের জীবনধারা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেন গবেষকরা। তাদের ধারণা, যমজ সন্তান আধিক্যের পেছনে থাকতে পারে এ অঞ্চলের নারীদের খাদ্যাভ্যাস। আফ্রিকার প্রধান খাদ্যশস্য কাসাভা (একধরনের আলু) এখানকার নারীদের অন্যতম প্রিয় খাবার। ওয়ো স্টেটের ইউনিভার্সিটি অব লোগোস টিচিং হসপিটালের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, এখানকার কাসাভা ও ইয়াম টিউবারে রয়েছে বিশেষ ধরনের রাসায়নিক, যা কিনা একাধিক ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করতে ভূমিকা রাখে। স্থানীয়রা মনে করে, কাসাভা নয় বরং তাদের বিশেষ কিছু স্যুপের কারণেই এখানে যমজের ঘটনা বেশি ঘটে। এই অঞ্চলের মানুষরা অনেক বেশি ওকরা পাতা এবং ইলাসা স্যুপ পান করে। এছাড়া অনেক বেশি ইয়ামও খায় তারা।
