প্রতিবন্ধী হয়েও স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়েছেন। গ্রামের প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়েছেন। যুব ও কল্যাণ সংগঠন গড়েছেন। এগুলোর মাধ্যমে এককালের ডাকাতের গ্রাম বদলে গিয়ে হয়েছে শান্তিপুর গ্রাম। নারায়ণগঞ্জের আড়াই হাজার উপজেলার এই গ্রাম ঘুরে এসে, হান্নান মোল্লা নামের অদম্যের সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন আসিফ আল আজাদ। ছবি তুলেছেন নূর
মরদাসাদি গ্রামটি নারায়ণগঞ্জ জেলার মাহমুদপুর ইউনিয়নে। আড়াই হাজার উপজেলা সদর থেকে সাত কিলোমিটার দূরে। এক সময় এটি ছিল ‘ডাকাতের গ্রাম’। লোকে ‘ডাকাইত্তা গেরাম’ নামেই ডাকত। গ্রামের সবগুলো রাস্তাই ছিল কাঁচা, প্রবীণরা তাই বলেন। তবে এখন আর এটি সেই গ্রাম নেই। সবগুলো পথ পাকা। চারদিকে ফসলি জমি। মরদাসাদি মানে ডাকাত মরদদের গ্রামের নামও তার ভেতরের অবস্থার মতো পুরোপুরি বদলে গেছে। এখন এটি ‘শান্তিপুর গ্রাম’। প্রবেশ পথেই পথিককে ছায়া দেয় বিরাট এক বটবৃক্ষ। সেখানে বিশ্রাম নিয়ে গ্রামে ঢোকেন আগন্তুকরা। গ্রামের শুরুতেই কারিগরদের তাঁতকলের খটখট শব্দ কানে আসে। তারা গামছা, শাড়ি তৈরি করছেন। যে কোনো মানুষ দেখলেই গ্রামের লোকেরা ফিরে তাকান। নতুন হলে ভয় পেয়ে যান। কেন? বাসিন্দা এসহাক বললেন, ‘এক সময় আমরা ডাকাতি করে কাটিয়েছি। ৮০ ভাগ লোকের পেশা ছিল তাই। ফলে যখন-তখন বিপক্ষের লোকেরা, পুলিশ, তাদের গোয়েন্দারা গ্রামে ঢুকে পড়তেন। দোষী কি নির্দোষ সবাই বিপদে পড়তেন। সেই ভয় এখনো কাটেনি। তবে সেই পেশায় এখন আর একজনও নেই।’ পুরুষ-নারী নির্বিশেষে গ্রামের মানুষ নানা ভালো পেশায় জীবন চালান। কেউ কৃষিকাজ করেন, কেউ হাঁস-মুরগির খামার দিয়েছেন, কারও পেট চলে মাছের চাষে। পুরো গ্রামে আছে প্রায় সাড়ে তিনশ পরিবার, বাস করেন হাজার তিনেক মানুষ। গ্রামের এই পরিবর্তনের শুরু স্থানীয় সংসদ সদস্যের হাত ধরে। আলহাজ নজরুল ইসলাম বাবু ২০০৯ সালে গ্রামের নামটি বদলে রাখলেন ‘শান্তিপুর’। এর কারণ ছিল, এই গ্রামের জন্যই যুগের পর যুগ পুরো আড়াই হাজার উপজেলার সব মানুষের গায়ে কলঙ্ক লেপে ছিল। শান্তিপুরের অবস্থাও ছিল খুব খারাপ। পুরো গ্রামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও ছিল না। পরিবর্তনের হাওয়াতে গ্রামে ২০১৪ সালে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হলো। নাম দেওয়া হলো ‘মদিনাতুল উলুম হাফিজিয়া মাদ্রাসা’। সেখানে প্রধান শিক্ষক মাওলানা ওবাইদুল শেখ। মাদ্রাসার কথা বলতে গিয়ে গর্বিতই হলেন শিক্ষক, ‘আমাদের এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৮২ জন ছাত্র-ছাত্রী। পুরো গ্রামের সব মানুষ চান, তার ছেলে বা মেয়ে শিক্ষিত হোক। ফলে ছেলেমেয়েরা লেখাপড়ার দিকে ঝুঁকছে।’ তিনি বললেন, ‘আগে যেখানে ধর্মের নামগন্ধও তেমন ছিল না, এখন সেখানে চারটি মসজিদ আছে। ফলে মানুষ প্রশান্তির খোঁজ পাচ্ছেন।’ গ্রামের ছেলে-মেয়েরা পাশের গ্রামের জোকারদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও পড়তে যাচ্ছে। সে স্কুলের সহকারী শিক্ষক হোসনে আরা আক্তার জানালেন, এই গ্রামের অন্ধকার একমাত্র শিক্ষার আলো দিয়েই দূর করা সম্ভব। সেদিকেই গ্রামের মানুষ হাঁটছেন।
কৃষিজীবী গ্রামের লোকেরা চর দখলের জন্য বড় লোকের লাঠিয়াল হয়ে গেল। এরপর খুন, হিংস্রতার জীবন ঘিরে ধরে। নিজেদের বাঁচাতে ও প্রতিপক্ষকে শেষ করে দিতে ডাকাতি, খুনের মতো ভয়ংকর বাজে কাজে জড়িয়ে পড়ে। তবে সেইসব দিনগুলো আর মনে করতে চান না হালিমা বেগম। তিনি এখন তাঁতের কাজ করে জীবন চালান। বলেন, ‘আমাদের শান্তিপুরে শান্তির হাওয়া বইছে।’ গ্রামের এই বদলে যাওয়ার নেপথ্যের নায়ক হান্নান মোল্লা। তার জীবনের গল্পটিও অন্যরকম। জন্মের মাত্র ছয় বছর পর তাকে নিয়ে হাসপাতালে দৌড়াতে হলো মা-বাবাকে। ঢাকা শিশু হাসপাতালে মা হাছিনা বেগমের কোলে চড়ে পৌঁছালো সে। ডাক্তাররা এই শিশুটিকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বললেন, তার পোলিও হয়েছে। তারা চিকিৎসাও করলেন। তবে কোনোদিন দুই পায়ে ভর দিয়ে হাঁটতে পারেননি তিনি। দুটি পা-ই পোলিও রোগে অচল। একটি লাঠি নিয়ে তাকে চলাফেরা করতে হয়। তবে অকেজো জীবন কোনোদিনই ভালো লাগেনি। তিনি চেয়েছেন, আরও সব মানুষের মতো সমাজের জন্য, নিজের জন্য, দেশের জন্য কিছু করবেন। যাতে জীবনটি অর্থপূর্ণ হয়। কারও করুণা নিতেও ভালো লাগে না। তবে পদে পদে বাধা পেয়েছেন, দমে যাননি।
অন্য শিশুদের চেয়ে বেশি বয়সে, আট বছর বয়সে প্রাথমিকের লেখাপড়া শুরু করলেন তিনি। তবে শিক্ষকরা এই প্রতিবন্ধী ছাত্রটিকে ভর্তি করাতেও রাজি হননি। এই প্রতিবন্ধী ছেলে তো স্কুলে নিয়মিত আসতে পারবে না, অন্য ছাত্র-ছাত্রীরা তাকে দেখে ভয় পেয়ে যাবে। তবে হাছিনা বেগম ছেলের লেখাপড়ার তুমুল আগ্রহ দেখে তাকে ভর্তি করাতে বারবার অনুরোধ করলেন। হান্নান স্কুলে ভর্তি হলেন এবং তার সংগ্রামী ও বন্ধুত্বের জীবনের শুরু হলো। স্কুলের কারও সঙ্গে কোনোদিন বিবাদ করেননি তিনি, সবাইকে ভালোবেসেছেন। ডাকাতের গ্রাম থেকে গিয়ে জোকারদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাস করলেন। এলাকারই সুলতান সাদী হাই স্কুল থেকে ২০১০ সালে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি পাস করলেন। চলে গেলেন আড়াই হাজার উপজেলার হাজি বেলায়েত হোসেন ডিগ্রি কলেজে। দুই বছর পর এইচএসসি পাস করলেন। উচ্চতর শিক্ষা, বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ার খুব শখ হান্নানের। ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিলেন। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে হলো না, জাহাঙ্গীরনগরে অপেক্ষমাণ তালিকাতে নিজের নাম দেখে আশায় বুক বাঁধলেন। সেখানে শেষ পর্যন্ত মেধার লড়াইয়ে টিকতে না পেরে হলো না। হতাশ না হয়ে পরের বছর, ২০১৩ সালে ভর্তি হলেন ঢাকার মিরপুরের সরকারি বাংলা কলেজে। বিজ্ঞানের অন্যতম সেরা বিভাগ উদ্ভিদবিজ্ঞানের ছাত্র তিনি। হলে উঠলেন। মনোযোগ দিয়ে পড়ালেখা করতে লাগলেন। এখন তিনি স্নাতকোত্তরের ছাত্র। শিক্ষা তার মধ্যে জ্ঞানের, মনুষ্যত্বের আলো ছড়িয়ে দিলো।
ছোটবেলা থেকেই মানুষের উপকার করতে ভালো লাগত হান্নানের। এটি যেন তার চরিত্রের অংশ হয়ে গেল। কারও ভালো কাজের জন্য প্রয়োজনীয় টাকার অভাব? নিজে কষ্ট করে চলে হলেও তাকে টাকা দিয়েছেন। কেউ টাকার অভাবে পড়ালেখা করতে পারছে না শুনলেই ব্যথা লাগে হান্নান মোল্লার। কেন? “আমাদের গ্রাম সম্পর্কে জন্মের পর থেকেই খারাপ কথা শুনে আসছি। এই গ্রামের কথা শুনলেই আড়াই হাজার, নারায়ণগঞ্জের লোকেরা পর্যন্ত ছি ছি করে। ‘তোমাদের গ্রামের বেশিরভাগ লোকই তো মুর্খ’ বলে। আসলেই তাই। ফলে গ্রামের পরিবেশও ভালো ছিল না। খুব খারাপ লাগত। অনেক ভেবে মনে হলো, কোনো গ্রামের এমনকি দেশের পরিবর্তন আনতে হলে প্রথমেই মানুষকে শিক্ষিত করে তুলতে হবে। সেজন্যই এদিকে পা বাড়ালাম। আমি কলেজে পড়ি তখন; ২০১১, ২০১২ সালের ঘটনা, গ্রামের বেশকিছু ছেলেমেয়ে স্কুলে যায়, কারও ভালো কাজের ইচ্ছে আছে। সেই দল থেকে নিজে আলাপ করে ৩৯ জনকে আলাদা করে ফেললাম। তাদের নিয়ে গড়ে তুললাম ‘শান্তিপুর যুব ও কল্যাণ সংগঠন’। স্কুলপড়–য়া ২০টি ছেলেমেয়ে আর তাঁতসহ টুকিটাকি নানা কাজের সঙ্গে যুক্ত বাকিরা। আমাদের এই সংগঠন যাতে ভালোভাবে কাজ করতে পারে সেজন্য গ্রামের ব্যবসায়ী মোতালেব ও ইয়াকুব নামের দুই সিনিয়র আর্থিকভাবে খুব সহযোগিতা করলেন। আমরা দাঁড়িয়ে গেলাম। প্রথম থেকেই আমাদের ইচ্ছে ছিল, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলব। যাতে ছেলেমেয়েরা এই গ্রামেই লেখাপড়ার সুযোগ লাভ করতে পারে। ফান্ড থেকে ছাত্র-ছাত্রীদের ভালো লেখাপড়ার জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করব, যাতে তারা লেখাপড়ায় উৎসাহী হয়।” তবে সেই স্বপ্ন পূরণ করা সহজ ছিল না মোটেও। একে তো ছাত্র-ছাত্রী, পাড়াগাঁয়ের ছেলে বলে তাদের তেমন কোনো সঞ্চয় নেই; তার ওপর গ্রামের মানুষের মধ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য আগ্রহও তীব্র ছিল না। কিন্তু দমে গেলেন না হান্নান। চাচা তারাব আলীর কাছ থেকে জমি পেলেন। সেখানেই গড়ে উঠতে লাগল গ্রামের প্রথম আলোর পাঠশালা। চেয়েছিলেন স্কুল করবেন, কিন্তু ধর্ম ও সাধারণ শিক্ষার গ্রামে প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে, গ্রামবাসীর মনোভাব মেনে নিয়ে মাদ্রাসা তৈরির দিকেই এগুলেন। সেই মাদ্রাসা তৈরির পর ওয়াজ-মাহফিলের মাধ্যমে সেটির উদ্বোধন করা হলো। তাতে গ্রামের সবাই অংশ নিলেন। ছাত্র-ছাত্রীরা ধর্ম ও সাধারণ শিক্ষা লাভ করতে শুরু করল। ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ার ফি দিয়ে শিক্ষকের আট হাজার টাকা বেতন হয়ে যায়। তার বাড়ি কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলায়, এই মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করছেন দেড় বছর ধরে। শান্তিপুর যুব ও কল্যাণ সংগঠনের প্রতিটি সদস্য অন্তত ৫০ টাকা করে মাসিক চাঁদা ফান্ডে জমা দিচ্ছেন। যারা আরও সামর্থ্যবান, তারা আরও বেশি দিলেন। যাতে তারা পরের একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। কিন্তু জমিদাতার অভাবে সেটি সম্ভব হয়নি। তবে টাকাগুলো ভালো কাজেই লাগিয়েছেন তারা। টাকার অভাবে যেসব মেয়ের বিয়ে হতো না, তাদের বিয়ের খরচ দিয়েছেন, অভাবে যারা লেখাপড়া করতে পারেননি, তাদের প্রয়োজনীয় আর্থিক সাহায্য করেছেন। চিকিৎসার খরচও দিয়েছেন অনেকের। গ্রামের মানুষও এই সহযোগিতা ভালোভাবে নিয়েছেন। তারা বাড়িতে বাড়িতে ঘুরে লেখাপড়া করলে কী লাভ হবে, ছেলেমেয়েদের মা-বাবাকে বুঝিয়ে তাদের মাদ্রাসায় এনেছেন, পাশের গ্রামের স্কুলে পাঠিয়েছেন। ফলে এখন পুরো গ্রামের শ খানেক ছাত্রছাত্রী পাশের গ্রামের স্কুলে পড়ে। পুরো শান্তিপুরের শতকরা ৯০ জন ছাত্র-ছাত্রীই শিক্ষার আলো পাচ্ছে। ১৫টি ছেলেমেয়ে এইচএসসি ও অনার্সে পড়ে। ফলে যে উদ্দেশ্যে এই সংগঠনের জন্ম হয়েছে সেটি পূরণ হয়েছে। হান্নান এখন সারা দেশের অর্থের অভাবে পড়ালেখা করতে না পারা ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ায় আর্থিক সাহায্য করার স্বপ্ন দেখেন।
তার লেখাপড়াও প্রায় শেষ। বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে ভালো সরকারি চাকরির স্বপ্ন দেখেন। প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নে জীবনটিকে উৎসর্গ করতে চান। নিজের জন্য কোনো চাওয়া নেই। তাদের পরিবারে চার ভাই-বোন। তিনি সবার বড়। বাবা আলাউদ্দিন আর মা হাছিনা বেগম। মেজ ভাইটি ঢাকা চিড়িয়াখানায় চাকরি করে। সেজ ভাইটি বাবার ডিজাইন কারখানার কাজের সঙ্গী, তার ছোটটি মাদ্রাসায় পড়ে, বোন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রী। একসময় যে ছেলেটি ছাত্র পড়িয়ে লেখাপড়া করেছেন, ভাই ও বাবার আয়ে এবং প্রতিবন্ধী কার্ড থেকে পাওয়া ভাতায় তিনি দিন কাটান। ২০০৬ সালে আড়াই হাজার উপজেলার চেয়ারম্যান আবদুল গাফফার তাকে ‘প্রতিবন্ধী কার্ড’ দিয়েছেন। এই কার্ড ব্যবহারের পর তার উপলব্ধি, প্রতিবন্ধীদের ভাতা আরও বাড়াতে হবে। পাশাপাশি যোগ্যতা অনুসারে এই মানুষগুলোর কাজের ব্যবস্থা করতে হবে। তারাও তো দেশের সম্পদ।
