মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

বিনা পারিশ্রমিকে

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০২:২৫ এএম

ফেইসবুকে হঠাৎ পোস্ট দিলেন এক তরুণ ছাত্র। বিনা বেতনে পড়াবেন। এরপর সেই পোস্ট অনেক লাইক পেল, শেয়ারও হলো খুব। কীভাবে আবীর হাসান আকাশ এই ছাত্রদের পেলেন? লিখেছেন আমিনুর রহমান হৃদয়

হঠাৎ করেই পোস্টটি শেয়ার হলো ফেইসবুকে। সাদা একটি এ-ফোর সাইজের কাগজ, চারপাশে কালো কালির বর্ডার; ভেতরে প্রথম লাইনে লেখাÑ ‘দরিদ্র ও মেধাবী দুজন ছাত্রছাত্রীকে পড়াতে চাই’; দ্বিতীয় লাইনে লেখা ‘দ্বিতীয় থেকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত (সব বিষয়)’ এরপর কালো বৃত্তের ভেতরে লেখা ‘বিনা পারিশ্রমিকে’; তারপর আগ্রহী শিক্ষকের নাম, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম লেখা আছে। সবশেষে তার মোবাইল নম্বর দেওয়া আছে। অন্যরকম এই ফোনটির দিকে নজর পড়ল অনেকের। শেয়ারও হলো অনেক। ফেইসবুকে এই পোস্ট নিয়ে আলোচনার অভাব হলো না। কেন এই মানুষটি এমন একটি পোস্ট দিয়েছেন? তিনিই বা কেমন?

মানুষটি আবীর হাসান আকাশ, ঢাকা কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। পড়ার বিষয় মনোবিজ্ঞান। বেড়ে উঠেছেন গোপালগঞ্জ সদরের মৌলভি পাড়ায়। মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে তিনি। পঞ্চম কী ষষ্ঠ শ্রেণির স্মৃতি মনে পড়ে, শীতকালে গ্রাম থেকে অসহায় মানুষগুলো তাদের বাড়িতে আসছেন আর মা বাড়ির আলমারি থেকে পুরনো কাপড়-চোপড় তাদের হাতে পরম মমতায় তুলে দিচ্ছেন। মধুমতী নদীভাঙনে এই মানুষগুলো একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেলেন। আর্থিক সাহায্যের জন্য হাত পাততেন মা-বাবার কাছে। অসুবিধা হলেও তাদের ফেরানো হতো না। এই দেখে দেখে ছেলেটির মন বদলে গেল। এইচএসসি পড়ার সময় সদরের ফুটপাতের গরিব মানুষগুলোকে গিয়ে নিজের টাকায় কয়েকটি কম্বল দিয়ে আসতেন। এবারের শীতেও এক বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে তার মোটরসাইকেলের পেছনে বসে কম্বল নিয়ে গিয়েছিলেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে। ফুটপাতে শীতে কাতর মানুষগুলোকে মমতায় ডেকে তুলে ১০ জনকে দিয়েছেন শীতে বেঁচে থাকার অবলম্বন। এই পর্যন্ত ১৩ বার রক্ত দিয়েছেন। প্রতি তিন মাস অন্তর রক্ত দেওয়া তার বাঁধা নিয়ম। আর্থিক সাহায্যও প্রয়োজনে করতে ভোলেন না। অনেকবার তো করেছেনই, প্রথম কী দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় এক বন্ধুর ফরম কেনার টাকাই ছিল না। গোপনে ১৫০০ টাকা দিয়ে সাহায্য করেছেন। সেই মানুষটিই তিনি। ২২ জানুয়ারি পোস্টটি দেওয়ার পর তার পৃথিবী বদলে গেল। এর আগে অবশ্য একই পোস্ট তাদের ঢাকা কলেজের আশপাশের এলাকার দেয়ালে সাঁটিয়েছেন। তবে সাড়া পড়ে গেল সেই বিজ্ঞপ্তির ছবি তুলে ফেইসবুকে শেয়ার দেওয়ার পর। একের পর এক মন্তব্য আসতে লাগল। তাতে একই কথা বললেন সবাই, ‘কনগ্রাচুলেশন’, ‘শুভকামনা’, ‘মহৎ কাজ’। আকাশ বেশ অবাক হলেন। তাহলে মানুষের মধ্যে মানবতা এখনো আছে! দেশের মধ্যে এমনকি দেশের বাইরে থেকেও অনেকে ফোন করে তার খোঁজখবর নিলেন। তাকে এই ভালো কাজের জন্য শুভকামনা জানালেন। এক হাজার লাইক তিনি নিজেই পেয়েছেন, যে ৩০০-এর বেশি মানুষ শেয়ার করেছেন তাদের লাইকের সংখ্যা আন্দাজ করতে পারেননি! ২৯ জানুয়ারি বিকেলে আকাশের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাসে। হাসিখুশি একজন মানুষ। আলাপের বিষয় বিনা বেতনে পাঠদান। বলেই ফেললেন তিনি, অনেকে মনে করতে পারেন হয়তো টিউশনি পাওয়ার জন্য এমন কাজ করেছি আমি। টিউশনি বা ছাত্র জোগাড় আমার কোনো লক্ষ্য নেই, ছিলও না। মা-বাবা তাদের জীবনবোধ থেকে শিখিয়েছেন ‘কেউ পয়সা দিতে না পারলেও প্রয়োজনে বা তোমার মনে চাইলে তার ছেলে কী মেয়েকে বিদ্যাদান করবে। এটি ভালো কাজ।’ ফলে একদিন হঠাৎ খেয়াল হলো, আমি তো অনার্সে পড়ি, প্রথম থেকে সপ্তম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীকে পড়ানোর যোগ্যতা এমনিতেই আছে। ইচ্ছাটি পূরণ করতে মন চাইল, আরও গভীরভাবে বিষয়টি নিয়ে ভাবলেন। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো কাজ থাকে না, অলস সময় কাটান। এ সময়ে কোনো ছেলেমেয়েকে পড়ালে নিজের বিদ্যা ঝালাই হয়, তাদেরও বিদ্যা শিক্ষা লাভ হয়। ফলে পড়ালে পয়সা ছাড়াই পড়াবেন, স্থির সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। এরপরই সেই কাজ করলেন এবং অন্য সব কর্মকা-ের শেয়ারের মতো ফেইসবুকে এই ‘ভালো কাজের’ শেয়ার দিলেন। আবীর হাসান আকাশ ছাত্র পেয়েছেন একজন আইসক্রিমওলার ছেলে; পড়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে। অন্যজনের বাবা ফুটপাতের চা বিক্রেতা। খুব অল্প আয়ের মানুষ। তবে ছেলেকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করার খুব বাসনা। তাই খুব কষ্টেও পড়াচ্ছেন। আইসক্রিম বিক্রেতা তো তার ছেলেকে পড়া থেকে ছাড়িয়ে নিজের সঙ্গে কাজে নিয়ে ফেলেছিলেন। তবে হবু শিক্ষকের সঙ্গে তার কথা হয়েছে। শিক্ষক বলেছেন, প্রয়োজনে তিনি নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়ে ছাত্রকে লেখাপড়া করার ব্যবস্থা করবেন। তাতে খুব খুশি বাবা।  আশ্চর্য হলেও সত্য কোনো মানুষই তাকে কোনো বাজে কথা বলেননি। তবে বন্ধু বা সমবয়সী মহলে আলাপের পর বুঝেছেন কেউ কেউ নিজেকে জাহির করার জন্য এই কাজ আকাশ করছেন বলে মনে করছেন। সেই নিন্দুকদের তিনি এভাবেই ঘায়েল করলেন, ‘আমাকে দেখে আরও অনেকে ভালো কাজ করতে নেমে পড়–কÑ এই আমার বাসনা। তাদের ভালো কাজের বিবরণে ফেইসবুক ভেসে যাক। অনুপ্রেরণা জোগানোই আমার একমাত্র উদ্দেশ্য।’ পহেলা এপ্রিল থেকে ছাত্রদের বাড়িতে বিকেলে পড়াতে যাবেন শিক্ষক। তাদের নিয়মিত ও সময়মতো পড়াতে পারলেই তার মূল লক্ষ্য পূরণ হবে।

image

 আকাশ থাকেন মানুষের পাশে

 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত