শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০২৪, ৬ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

খুনের আয়োজন মাদক কারবারীর জন্য, খুন হলেন নিরীহজন

আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৯:০৩ পিএম

একচ্ছত্র ইয়াবার ব্যবসা চালাতে প্রতিদ্বন্দ্বী মাদক ব্যবসায়ী পারভেজকে হত্যা করতে চেয়েছিল মাদক সম্রাজ্ঞী পিংকি। এ জন্য ৫ লাখ টাকার চুক্তি করেছিল ভাড়াটে কিলার দুর্ধর্ষ বাবু ওরফে হোন্ডা বাবু ও সজল ওরফে পিচ্চি সজলের সাথে।

অগ্রিম ১৭ হাজার টাকা নিয়ে বাবু ও সজলসহ ৫ ভাড়াটে খুনি পারভেজের শরীরে শতাধিক ছুরিকাঘাত করে। একইসাথে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের জেরে  খুনি  সজল  ঘটনাস্থলে উপস্থিত তার পূর্ব পরিচিত  রাসেলকেও ছুরিকাঘাতে মৃত্যু নিশ্চিত করে পালিয়ে যায়।  

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা পিবিআইয়ের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া দুই আসামি সজল ওরফে পিচ্চি সজল  ও হোসেন বাবু ওরফে হোন্ডা বাবু রবিবার ঢাকা মহানগর মুখ্য হাকিম আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এসব কথা বলেছেন। পরে আদালতের নির্দেশে তাদের দুজনকেই কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

পিবিআইয়ের কর্মকর্তারা জানান, ২০১৫ সালে রাজধানীর কদমতলী থানাধীন এলাকায় রাসেল (২২)  ও পারভেজ নামে নামে দুই যুবককে কে বা কারা ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে পারভেজ বেঁচে গেলেও মারা যান রাসেল। এই ঘটনায় কদমতলী থানায় মামলা হলেও হত্যা রহস্য উদঘাটন না করেই থানা পুলিশ চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে দেয়। এরপর তদন্তে নামে পিবিআই।

পিবিআই জানায়, হত্যাকাণ্ডে জড়িত সজল ওরফে পিচ্চি সজলকে ৯ ফেব্রুয়ারি সকালে বাগেরহাট জেলার মোরেলগঞ্জের আমতলা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেওয়া তথ্য নিয়ে একইদিন সন্ধ্যায় রাজধানীর শ্যামপুর এলাকা থেকে হোসেন বাবু ওরফে হোন্ডা বাবুকেও গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় আটককৃতদের হেফাজত থেকে হত্যায় ব্যবহৃত ২টি চাকু উদ্ধার করা হয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এস আই আল-আমিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, মাদক ব্যবসায়ী টাইগার সজিবের আপন ভাই পারভেজকে হত্যার উদ্দেশ্যে তার শরীরে এক শ থেকে দেড় শ ছুরিকাঘাত করেছিল আসামিরা। তারপরও পারভেজ প্রাণে বেঁচে যায়। সে অন্য একটি মামলায় কারাগারে আছে। তবে নিরপরাধ রাসেলের ফুসফুসে ছুরিকাঘাত করায় তিনি আর বাঁচতে পারেননি। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যায়।

পিবিআইয়ের বিশেষ পুলিশ সুপার আবুল কালাম আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাসেল ছিলেন সহজ-সরল গ্রামের মানুষ। এলাকায় কৃষি কাজ করতেন। পূর্বপরিচিত সজল তাকে চাকরির লোভ দেখিয়ে ঢাকায় নিয়ে এসে আর চাকরি দিতে পারেনি। এ নিয়ে তাদের দু’জনের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এর জের ধরেই পারভেজ খুনের টাকায় ভাড়াটে খুনিদের সহায়তায় রাসেলকে হত্যা করেছে সে।

তিনি বলেন, এলাকার মাদক ব্যবসায়ী পিংকীর পরিকল্পনায় মূলত  আরেক মাদক ব্যবসায়ী টাইগার সজিব ও তার ভাই পারভেজকে হত্যার জন্য ৫ লাখ টাকার চুক্তি হয় হোন্ডা বাবু ও সজলের সঙ্গে। এরা ১৭ হাজার টাকা অগ্রিম নিয়ে আরও ৩ ভাড়াটে খুনিকে সঙ্গে করে সজিবের ভাই পারভেজকে ডেকে নিয়ে যায়। এ সময় তাদের সঙ্গে ছিল রাসেল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশে সবাই ঘিরে ধরে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়।

তিনি বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা পিংকি। তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া জুয়েল নামে আরও একজন জড়িত। তাকেও ধরার চেষ্টা চলছে। আলামিন নামে আরেক আসামি অন্য মামলায় কারাগারে আছে। পারভেজও ভিন্ন মামলায় কারাগারে আছে।

পিবিআইয়ের কর্মকর্তারা জানান, সজল ওরফে পিচ্চি সজলের বাড়ি বাগেরহাট জেলার মোরেলগঞ্জে। তার এক ভাই বিয়ে করেছেন খুলনার রূপসা এলাকায়। সেই সুবাদে সেখানে তার যাতায়াত ছিল। সেখানকার ৭ম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক মেয়েকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে বিয়ে করে। সেখান থেকেই ভিকটিম রাসেলের সঙ্গে পরিচয়। সেই সূত্র ধরেই তাকে চাকরি দেওয়ার কথা বলে ২০১৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর অক্টোবর ঢাকায় নিয়ে আসে। এরপর  ১১ অক্টোবর রাত ১১টার দিকে সজল ফোন করে রাসেলের মাকে। বলে রাসেল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুরিকাঘাতে আহত হয়ে মারা গেছে।

তখন ভিকটিম রাসেলের মা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে গিয়ে ডান পাঁজরে পিঠের দিকে ব্যান্ডেজ অবস্থায় তার ছেলের লাশ শনাক্ত করেন।

এ  ঘটনায়  রাসেলের  মা রাশিলা বেগম (৪০) বাদী হয়ে ২০১৫ সালের ১৩ অক্টোবর অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে কদমতলী থানায় মামলা করেন। কদমতলী থানা পুলিশের তদন্তে অপরাধ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হইলেও খুনিদের পরিচয় শনাক্ত করতে না পেরে আদালতে ফাইনাল রিপোর্ট দিয়ে দেয়।

খুনের ঘটনার রহস্য উদঘাটিত না হওয়ায় উক্ত চূড়ান্ত রিপোর্টের বিরুদ্ধে ভিকটিমের মা বিজ্ঞ আদালতে না-রাজির আবেদন করেন। পরে বিজ্ঞ আদালতের আদেশে পিবিআই, ঢাকা মেট্রো (উত্তর) এর এসআই/মো. আল-আমিন শেখ মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে।

তিনি মামলার তদন্ত করতে গিয়ে ভিকটিমের গ্রামের বাড়ি খুলনা জেলার রূপসা থানা এলাকাসহ ঢাকা মহানগরীর কদমতলী এলাকায় ব্যাপক তদন্ত করেন।

হোসেন বাবু ওরফে হোন্ডা বাবু ও সজল ওরফে পিচ্চি সজলের বিরুদ্ধে যাত্রাবাড়ী, শ্যামপুর ও কদমতলী থানায় মাদক, অস্ত্র, হত্যা ও ডাকাতির ঘটনায় পায় দেড় ডজন মামলা রয়েছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত