সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ১ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

আহমদিয়া জলসা ঘিরে সংঘর্ষ-ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ, আহত ৫০

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৯:২০ এএম

পঞ্চগড়ে আহমদিয়া মুসলিম জামাতের পূর্বঘোষিত বার্ষিক সালানা জলসা বন্ধের দাবিতে মঙ্গলবার রাতে পঞ্চগড় শহর ও আশপাশের এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। রাত ৯টা থেকে সোয়া ১১টা পর্যন্ত হামলা-সংঘর্ষ চলে। এতে অর্ধশতাধিক আহত হন।

কাদিয়ানী বিরোধী বিক্ষুব্ধ জনতা শহরে ও জেলা শহরের আহমদনগরে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ চালায়। মহাসড়ক দুই ঘণ্টা ধরে অবরোধ করে রাখলে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ, কয়েক রাউন্ড রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে।

কাদিয়ানী বিরোধী বিক্ষুব্ধ জনতার একটি দল সদর উপজেলার আহমদনগরে আহমদিয়া মুসলিম জামাতের বাড়িঘর ও দোকানপাটে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ চালায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিচার্জসহ কয়েক রাউন্ড রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে।

হামলা-সংঘর্ষে পুলিশসহ উভয়পক্ষের অর্ধশতাধিক আহত হয়। গুরুতর আহতদের রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

ঘটনার পর রংপুর বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আবদুল্লাহ সাজ্জাদ, অতিরিক্ত ডিআইজি মজিদ আলী, জেলা প্রশাসক সাবিনা ইয়াসমিন ও পুলিশ সুপার মো. গিয়াসউদ্দিন আহমদ, পঞ্চগড় ১৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মহিউস সুন্নাহ, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এহেতেশাম রেজা, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাঈমুল হাছানসহ জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতদের দেখতে যান।

এসময় তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন।

রাত সাড়ে ১১টার দিকে পরিস্থিতি শান্ত হয়। শহরে ও আহমদনগর এলাকায় পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। বর্তমানে জেলা শহরসহ ওই এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।

রাত সাড়ে ৮টার দিকে সম্মিলিত খতমে নবুওয়ত সংরক্ষণ পরিষদ, ঈমান আকিদা রক্ষা কমিটি ও পঞ্চগড় যুব সমাজ নামে কয়েকটি সংগঠনসহ তৌহিদী জনতা ও কাদিয়ানী বিরোধী বিক্ষুব্ধ জনতার ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে।

মিছিল শেষে তারা পঞ্চগড় শহরের শেরেবাংলা পার্ক মোড় সংলগ্ন পঞ্চগড়-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করে। অবরোধের ফলে মহাসড়কের উভয় পাশে শত শত যানবাহন আটকা পরে।

এসময় কাদিয়ানী বিরোধী লোকজন আহমদনগর এলাকায় যেতে চাইলে পুলিশ করতোয়া ব্রিজের ওপর তাদের পথরোধ করে। পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে বিক্ষুব্ধ লোকজন লাঠিসোঁটা নিয়ে আহমদনগরের দিকে রওনা হলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়।

একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ লোকজন পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করলে পুলিশও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে পুলিশ ও মুসল্লিদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া চলে। এতে পুলিশ ও বিক্ষুব্ধ লোকজন আহত হয়।

পুলিশ ও জনতার ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার একপর্যায়ে কাদিয়ানী বিরোধী বিক্ষুব্ধ অপর একটি দল শহরের রাজনগর এলাকা দিয়ে করতোয়া নদী পার হয়ে আহমদিয়া মুসলিম জামাতের আহমদনগর এলাকায় গিয়ে বাড়িঘর দোকানপাটে হামলা চালায়।

তারা আহমদিয়া মুসলিম জামাতের ১০/১২টি বাড়িঘর ও দোকানপাটে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এসময় তাদের হামলায় আহমদিয়া জামাতের কমপক্ষে ৩০ জন আহত হয়। এসময় আতঙ্কে পঞ্চগড় বাজারের প্রায় সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়।

এর আগে জেলা প্রশাসন পরিস্থিতি মোকাবেলায় মঙ্গলবার রাত ৮টায় তৌহিদী জনতা ও বিভিন্ন সংগঠনের নেতাদের নিয়ে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে বৈঠকের আয়োজন করে। বৈঠকে জলসা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সালানা জলসা স্থগিতের ঘোষণার পরও বিক্ষুব্ধ জনতা মহাসড়ক অবরোধসহ আহমদনগরে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটায়।

অবশ্য রাত সোয়া ১১টার দিকে পঞ্চগড়ের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ গোলাম আজম পঞ্চগড় বাজার জামে মসজিদের মাইকে জেলা প্রশাসন কর্তৃক জলসা অনুষ্ঠানের অনুমতি বাতিলের সিদ্ধান্ত জানিয়ে সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বানসহ কারো প্ররোচনায় বিভ্রান্ত না হয়ে সবাইকে বাড়ি ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করেন।

আহমদনগর মুসলিম জামাতের প্রেসিডেন্ট তাহের যুগল দাবি করেন, তাদের ৪০ জনের মত লোক আহত হয়েছে। বেশ কয়েকটি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে ও ভাঙচুর চালানো হয়েছে। জলসার অনেক মালামাল ভাঙচুর করা হয়েছে।

পঞ্চগড় সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. প্রদীপ কুমার বণিক জানান, আহত হয়ে ২১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে মনে হয়েছে।

জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার সাদাত সম্রাট বলেন, পৌর মেয়র তৌহিদুল ইসলাম ও আন্দোলনকারী সংগঠনের নেতৃবৃন্দকে নিয়ে আমরা অবস্থানরত লোকজনকে প্রশাসন কর্তৃক জলসা স্থগিতের কথা জানাই। কিন্তু তারা নানাভাবে বিভ্রান্ত হয়ে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করে রাখে। পরবর্তীতে কিছু লোকজন করতোয়া নদী পার হয়ে শহরতলির আহমদ নগরে জলসা স্থলে যায়।

পঞ্চগড় থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবু আক্কাস আহমদ জানান, রাতে জেলা প্রশাসন জলসা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে তার আগেই বিভিন্ন স্থান থেকে মুসল্লি ও সাধারণ মানুষ বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে। তাদের ছত্রভঙ্গ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও শান্ত করতেই পুলিশ রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে।

তিনি বলেন, একই সময় কিছু মানুষ বিকল্প পথে শহরতলির আহমদনগরে গিয়ে পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের কয়েকটি ঘরবাড়ি ও জলসাস্থলের বেশ কিছু উপকরণ ভাঙচুর করে।

পুলিশ সুপার গিয়াস উদ্দিন আহমদ জানান, মুসল্লিদের বিচ্ছিন্ন একটি দল এ হামলা করেছে। আমরা বিষয়টি তদন্ত করে দেখছি কারা কারা এর সঙ্গে জড়িত। তাদের বিরুদ্ধে আমরা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

উল্লেখ্য, আগামী ২২ থেকে ২৪ ফেব্রুয়ারি সদর উপজেলার ধাক্কামারা আহমদনগর এলাকায় বার্ষিক সালানা জলসা আহ্বান করে আহমদিয়া মুসলিম জামাত।

এই জলসা বন্ধের দাবি জানিয়ে গত ৪ ফেব্রুয়ারি সম্মিলিত খতমে নবুয়ত সংরক্ষণ পরিষদ পঞ্চগড় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে। আহমদিয়া মুসলিম জামাতও জলসার বিষয়ে স্থানীয় সাংবাদিকদের নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত