রোহিঙ্গা ঢল ও মাদক পাচারের অন্যতম পথ সেন্টমার্টিন

আপডেট : ০৯ এপ্রিল ২০১৯, ০৯:০২ এএম

মিয়ানমার থেকে আবারও রোহিঙ্গা ঢল ও সেন্টমার্টিনের সর্বদক্ষিণের প্রবালদ্বীপ ও শাহপরীর দ্বীপ দিয়ে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ও মাদক পাচারের তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে একটু দূরের এই দ্বীপটির নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে গত রবিবার সেখানে ভারী অস্ত্রশস্ত্রসহ সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি মোতায়েন করা হয়। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, দ্বিতীয় দিন গতকাল সোমবার থেকেই কার্যক্রম শুরু করেছে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা। ২২ বছর পর এই দ্বীপে স্থায়ী বর্ডার আউট পোস্ট (বিওপি) স্থাপনের কাজও শুরু হয়েছে।

দীর্ঘদিন পর হলেও সরকারের এই সিদ্ধান্ত ইতিবাচক বলে মনে করছেন কূটনীতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। তারা বলেন, এটা একটা স্বাভাবিক ঘটনা। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি অনুসারে প্রতিরক্ষার স্বার্থে একটি গণতান্ত্রিক দেশ তার সীমানায় এই ধরনের বাহিনী মোতায়েন করবে, এটাই সঠিক। বরং এত বছর এখানে বিজিবি ছিল না, এটাই অস্বাভাবিক। টেকনাফে বিজিবির ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সরকার মোহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গোয়েন্দা তথ্য ও সরকারি সিদ্ধান্তের কারণে এটি করা হচ্ছে। সবকিছু বিবেচনা করে গোয়েন্দা রিপোর্ট, সরকারি রিপোর্ট এবং বর্ডার গার্ডের সুপারিশেই বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ঢল নামার সঙ্গে সঙ্গে টেকনাফকে কেন্দ্র করে ইয়াবা পাচার বেড়ে গেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ড থেকে একটু দূরে এই দ্বীপটির নিরাপত্তা আমাদের জন্য বড় একটা বিষয়। তাই আমরা নিরাপত্তা বৃদ্ধি করেছি। ভারী অস্ত্রশস্ত্রসহই আমরা সেটা করেছি।’

ভারী অস্ত্র সম্পর্কে বিজিবির ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক বলেন, ‘একটা দেশের নিরাপত্তার প্রশ্ন যখন আসে তখন একটা নিরাপত্তা বাহিনী বা প্যারামিলিটারি বাহিনী কী অস্ত্র মোতায়েন করেছে তা কখনোই ডিসক্লোজ করে না।’

নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার মতো কিছু ঘটেনি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কিন্তু পার্শ্ববর্তী দেশ কোনো চাপ যাতে আমাদের ওপর তৈরি করতে না পারে সেই বিষয়টা মাথায় রেখে ফোর্স মোতায়েন করা হয়।’

লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোস্তাফিজুর আরও বলেন, ‘মিয়ানমার থেকে মাদক পাচারের অন্যতম রুট হিসেবে যেহেতু ওই এলাকাটা ব্যবহৃত হয়, সেটা বন্ধ করতে হবে। মালয়েশিয়াগামী যেসব রোহিঙ্গা রয়েছে তাদের যাতায়াত রোধ করতে হবে। চোরাচালান রোধ করাও একটা উদ্দেশ্য। এই বিষয়গুলো মাথায় রেখেই সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে এখানে বিজিবি মোতায়েন হবে।’

নিরাপত্তা বিশ্লেষক লে. কর্নেল ফোরকান আহমাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সেন্টমার্টিনকে মিয়ানমারের দাবি করা অযৌক্তিক এবং ভারী অস্ত্রসহ বিজিবি মোতায়েনের সরকারের সিদ্ধান্ত সঠিক।’ মানবাধিকার কর্মী নুর খান বলেন, ‘সরকার বিজিবি মোতায়েন করেছেন, এটা নিরাপত্তার জন্য জরুরি ছিল। মিয়ারমারের মতো দেশ প্রতিবেশী হলে সতর্ক থাকাটা জরুরি।’

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেন, ‘রোহিঙ্গারা মানবপাচারের শিকার হচ্ছে। মাদকের পরিমাণ ওই এলাকায় বেড়ে গেছে। নিরাপত্তার জন্যই বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।’

সেন্টমার্টিন দ্বীপের একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, তারা মাসখানেক আগে বিষয়টি জেনেছেন। এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী নিয়োজিত ছিল এখানে। পরে তা টেকনাফে সরিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেন্টমার্টিন দ্বীপকে মিয়ানমার বেশ কয়েকবার তাদের মানচিত্রে উপস্থাপন করে নিজেদের বলে দাবি করার অপচেষ্টা করে। এরকম বাস্তবতায় এ দ্বীপের নিরাপত্তা রক্ষায় ২২ বছর পর রবিবার থেকে পুরোদমে কাজ শুরু করেছে বিজিবি। এখন কোস্টগার্ডের পাশাপাশি বিজিবি সদস্যরাও সীমান্ত-নিরাপত্তায় দ্বীপটিতে দায়িত্ব পালন করবে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আলী শিকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মিয়ানমারের সঙ্গে রোহিঙ্গা ইস্যুতে নতুন প্রেক্ষাপটে বিজিবি মোতায়েনের সিদ্ধান্তঠিক হয়েছে। এতে এমন ভাবার কারণ নেই, দেশটির সঙ্গে আমরা সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছি। সেন্টমার্টিনের অবস্থান এবং কৌশলগত কারণেই কোস্টগার্ড এবং নৌবাহিনীর পাশাপাশি বিজিবির দরকার। মিয়ানমার সারা পৃথিবী থেকেই একটা বিচ্ছিন্ন দেশ। তারা কোনো ধরনের আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা করে না। তাই বাংলাদেশের প্রতিরক্ষার স্বার্থেই বিজিবির স্থায়ী পূর্ণ বর্ডার আউট পোস্ট হওয়া দরকার ছিল।’

সাবেক রাষ্ট্রদূত ড. ওয়ালী উর রহমান বলেন, মিয়ানমার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এড়াতে নানা কৌশল নেয়। যখনই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয় সামনে আসে তখনই তারা রাখাইনে অবশিষ্ট রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন চালায়। গত সপ্তাহেও এরকম ঘটনা ঘটেছে এবং খবর এসেছে মিয়ানমার থেকে আরও রোহিঙ্গা সেন্টমার্টিন দিয়ে প্রবেশ করার পথ খুঁজছে। এ ছাড়া উখিয়া ও টেকনাফের সীমান্তে ইয়াবার পাচার ঠেকাতে কড়াকড়ি করায় সেন্টমার্টিনকে তারা নতুন রুট হিসেবে বেছে নিয়েছে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত একেবারেই সময়োপযোগী।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত