ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে (১৮) কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে হত্যা চেষ্টার মামলায় পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও কাউন্সিলর মুকছুদ আলমসহ পাঁচ আসামিকে ধরতে পারেনি পুলিশ। মামলা দায়েরের দুই দিনপরও তাদের গ্রেপ্তার না হওয়ায় নির্যাতিতার পরিবার ও স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
এজাহারভুক্ত আসামিদের মধ্যে পলাতকরা হলেন- সোনাগাজী পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মুকছুদ আলম (৪৫), পৌরসভার উত্তর চরচান্দিয়া গ্রামের আহসান উল্লার ছেলে নুর উদ্দিন (২০), একই গ্রামের ভূঞাবাজার এলাকার শাহাদাত হোসেন শামিম (২০), রহমত উল্লার ছেলে জাবেদ হোসেন (১৯) ও ছফরপুর গ্রামের হাফেজ আবদুল কাদের (২৫)।
অন্যদিকে, এই মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া আসামিরা হলেন- ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ও আমিরাবাদ ইউনিয়নের চরকৃষ্ণ গ্রামের মৃত কলিম উল্লার ছেলে এসএম সিরাজ উদ দৌলা (৫৫), ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক আবছার উদ্দিনের (৩৫), পৌরসভার তুলাতলি এলাকার আবুল বশরের ছেলে যোবায়ের আহম্মেদ (২০)।
গত ২৭ মার্চ নুসরাত জাহান রাফিকে নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে শ্লীলতাহানির অভিযোগে গ্রেপ্তার এসএম সিরাজ উদ দৌলা আটকের পরদিন সোনাগাজীর জিরো পয়েন্টে কাউন্সিলর মুকছুদুল আলমের নেতৃত্বে একটি বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধনে এজাহারভুক্ত কাউন্সিলর মুকছুদ আলম, নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামিম, জাবেদ হোসেন, হাফেজ আবদুল কাদের সেখানে উপস্থিত হয়ে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার নামে দায়ের করা মামলা তুলে নেওয়ার দাবিতে হুমকি দেন।
এরপর, তারা ওই মামলার বাদী ও নির্যাতিতা ছাত্রীর মা শিরিন আক্তার ও বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমানকে মামলা তুলে নিতে বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দেন বলে ৮ এপ্রিল ওই ছাত্রীকে অগ্নিদগ্ধ করে হত্যাচেষ্টার দায়ে করা মামলার এজাহারে উল্লেখ করেন মামলার বাদী ও নির্যাতিতার বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান।
এদিকে মাদ্রাসা ছাত্রীকে আগুন দিয়ে হত্যা চেষ্টার ঘটনার পাঁচ দিন অতিবাহিত হলেও অধ্যক্ষের মুক্তির দাবিতে মানববন্ধনে অংশ নেওয়া ও তাদের মামলা তুলে নিতে হুমকি দাতা এই ৫জন আটক না হওয়া শিক্ষার্থী-অভিভাবক ও স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। তাদের অভিযোগ, ঘটনার পর থেকে তারা প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করলেও পুলিশ তাদের আটক করেনি। সোমবার রাতে নাম উল্লেখ করে মামলা দায়েরের পর থেকে তারা আত্মগোপনে রয়েছেন।
বিষয়টি জানতে পৌর কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা মুকছুদ আলমের সাথে তার মোবাইল ফোনে বারবার কল করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে সোনাগাজী-দাগনভূঞা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম বলেন, এজাহারভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছে। ইতিমধ্যে পুলিশ এজাহারভুক্ত ৩ জনসহ ৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। অল্প সময়ের মধ্যে বাকিদেরও গ্রেপ্তার করা হবে।
অন্যদিকে মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে অগ্নিদগ্ধ করে হত্যা চেষ্টার ঘটনায় এ পর্যন্ত ৯জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃত অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাকে ৭ দিনের ও ওই মাদ্রাসার ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক আবছার উদ্দিন, সহপাঠী আরিফুল ইসলাম, নুর হোসেন, কেফায়াত উল্লাহ জনি, মোহাম্মদ আলা উদ্দিন ও শাহিদুল ইসলাম প্রত্যেককে ৫দিন করে রিমান্ড দিয়েছেন আদালত। এছাড়া অধ্যক্ষের ভাগনি উম্মে সুলতানা পপি ও যোবায়ের আহম্মেদকে আদালতে হাজির করে ৭ দিনের রিমান্ড চাইলে আদালত পরদিন (বৃহস্পতিবার) শুনানির দিন ধার্যকরে জেলহাজতে প্রেরণ করেন।
উল্লেখ্য, ৬ এপ্রিল শনিবার সকালে আলিম পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় যায় নুসরাত জাহান রাফি। মাদ্রাসার এক ছাত্রী তার বান্ধবী নিশাতকে ছাদের উপর কেউ মারধর করেছে এমন সংবাদ দিলে সে ওই বিল্ডিংয়ের চার তলায় যায়। সেখানে মুখোশপরা ৪/৫ জন তাকে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে মামলা ও অভিযোগ তুলে নিতে চাপ দেয়। সে অস্বীকৃতি জানালে তারা গায়ে আগুন দিয়ে পালিয়ে যায়।
এ ঘটনায় সোমবার রাতে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা ও পৌর কাউন্সিলর মুকছুদ আলমসহ ৮ জনের নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন অগ্নিদগ্ধ রাফির বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান।
এর আগে ২৭ এপ্রিল ওই ছাত্রীকে নিজ কক্ষে নিয়ে শ্লীলতাহানির অভিযোগে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাকে আটক করে পুলিশ। সে ঘটনার পর থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন। এ ঘটনায় ওই ছাত্রীর মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন।
