গাছে বেঁধে অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর চোখে মরিচের গুঁড়া

আপডেট : ১২ জুন ২০১৯, ০৮:৩২ পিএম

শেরপুরের নকলায় জমিসংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে ডলি খানম (২২) নামে এক অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর চোখে মুখে মরিচের গুঁড়া ছিটিয়ে গাছে বেঁধে নির্যাতন করে গর্ভের সন্তান নষ্টের অভিযোগ উঠেছে।

সোমবার রাতে নির্যাতনের ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ হলে তা ভাইরাল হয়ে যায়। ডলি খানম পৌর শহরের কায়দা এলাকার দরিদ্র কৃষক শফিউল্লাহর স্ত্রী। সে চন্দ্রকোনা কলেজের ডিগ্রি শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী।

ভিডিও ভাইরাল হবার পর মঙ্গলবার রাতে নির্যাতনের শিকার ওই গৃহবধূকে থানায় নিয়ে আসে পুলিশ।

নির্যাতিত গৃহবধূর অভিযোগের প্রেক্ষিতে ৯জনকে আসামি করে একটি মামলা নিয়েছে পুলিশ। এই ঘটনায় বুধবার সকালে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

নির্যাতনের শিকার ওই গৃহবধূ ও তার স্বামী শফিউল্লাহর অভিযোগ, নকলা পৌর শহরের কায়দা গ্রামের মৃত হাতেম আলীর ছেলে মো. শফিউল্লাহর সাথে জমি নিয়ে তার সহোদর বড়ভাই আবু সালেহ (৫২), নেছার উদ্দিন (৪৮) ও সলিম উল্লাহর (৪৪) বিরোধ ও দেওয়ানি মোকদ্দমা চলছিল।

গত ১০ মে সকালে ওই এলাকার গোরস্থান সংলগ্ন শফিউল্লাহর দখলি জমির ইরি-বোরো ধান আবু সালেহ ও তার লোকজন লাঠিসোটা নিয়ে কাঁটতে গেলে শফিউল্লাহ বাঁধা দেয় বলে অভিযোগ নির্যাতিতার। পরে প্রতিপক্ষের ধাওয়ায় ওইখান থেকে চলে গেলে আবু সালেহর নেতৃত্বে একদল লোক ধান কাটতে শুরু করলে শফিউল্লাহর ৩ মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ডলি খানম বাঁধা দিতে গেলে আবু সালেহর হুকুমে তার ছোটভাই সলিমউল্লাহ, ভাইবউ লাখী আক্তারসহ অন্যান্যরা তাকে ঘেরাও করে ফেলে। এক পর্যায়ে তার চোখে মুখে মরিচের গুঁড়া ছিটিয়ে দিয়ে তাকে টানা-হেচড়া করে গাছের সাথে বেঁধে ফেলে এবং পাশের অন্য গাছের সাথে টানা দিয়ে বেঁধে ফেলে তার ২ পা।

পরে পুলিশ খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় ডলি খানমকে উদ্ধার এবং ঘটনায় জড়িত আবু সালেহ ও তার ছোট ভাই-বউ লাখী আক্তারকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়।

কিন্তু চিকিৎসার কথা বলে ডলি খানমকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানোর পর হঠাৎ করেই ছাড়া পেয়ে যায় আটক ২ জন। এদিকে নির্যাতনে ডলি খানমের রক্তক্ষরণ শুরু হয় এবং তাকে ১৬ মে পর্যন্ত ৭দিন চিকিৎসা দেওয়ার পরও তার অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় জেলা সদর হাসপাতালে রেফার করা হয়। সেখানেও ২২ মে পর্যন্ত ৭ দিন চলে তার চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা।

পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা যায়, নির্যাতনের কারণে ডলি খানমের অকাল গর্ভপাত হয়েছে।

ওই ঘটনায় শফিউল্লাহ ৩ জুন শেরপুরের আমলী আদালতে আবু সালেহসহ ৫ জনকে স্ব-নামে ও আরও অজ্ঞাতনামা ৫/৭ জনকে আসামি করে একটি নালিশী মামলা দায়ের করলে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শরীফুল ইসলাম খান ভিকটিমের এমসি তলব সাপেক্ষে ঘটনার বিষয়ে তদন্তপূর্বক ১০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য জামালপুরের পিবিআইয়ের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার প্রতি নির্দেশ প্রদান করেন।

নির্যাতিতা গৃহবধূর স্বামী শফিউল্লাহ বলেন, জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে তার বড়ভাই নেছার উদ্দিনের ইন্ধনে তার স্ত্রী লাখী আক্তার এবং অপর ২ ভাই আবু সালেহ ও সলিমউল্লাহসহ তাদের ভাড়াটে লোকজন তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ডলি খানমকে নির্যাতন চালিয়ে গর্ভের সন্তান নষ্ট করে দিয়েছে।

এ ঘটনায় অভিযুক্ত আবু সালেহ’র সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি মুঠোফোনে বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ মিথ্যা ও বানোয়াট। আমি শুধু তাকে বেঁধে রেখে থানায় খবর দিয়েছি। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করেছে। আমার নামে ও আমার পরিবারকে হয়রানির জন্য এ মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে জামালপুর পিবিআইয়ের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সীমা রাণী সরকার বলেন, মামলাটি এখনও হাতে পাইনি। পেলে অবশ্যই দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গর্ভের সন্তান নষ্টের ব্যাপারে শেরপুর জেলা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার নাহিদ কামাল কেয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য ভিকটিমকে ময়মনসিংহ রেফার করেছি। এখনো রিপোর্ট হাতে পাইনি। হাতে পেলে বোঝা যাবে, নির্যাতনের কারণে গর্ভের সন্তান নষ্ট হয়েছে কি না।

শেরপুরের সহকারী পুলিশ সুপার বিল্লাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভিডিওটি দেখেই ওই গৃহবধূকে থানায় আনা হয়। এরপর তার অভিযোগের প্রেক্ষিতে মামলা দায়ের করা হয়েছে। ইতোমধ্যে একজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়া চলছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত