শাকিব খানের ‘পাসওয়ার্ড’ ছবির বিরুদ্ধে সেন্সরবোর্ডে নকলের অভিযোগ

আপডেট : ১৭ জুন ২০১৯, ০৮:৩৪ পিএম

ঈদুল ফিতরে মুক্তি পায় শাকিব খান প্রযোজিত ও অভিনীত চলচ্চিত্র ‘পাসওয়ার্ড’। মালেক আফসারী পরিচালিত এ ছবিটির বিরুদ্ধে মুক্তির পরপরই নকলের অভিযোগ ওঠে। দর্শকেরা ছবিটির সঙ্গে কোরিয়ান ছবি ‘টার্গেট’ এর মিল খুঁজে পান। কিন্তু ছবির পরিচালক মুক্তির আগে ঘোষণা করেছিলেন ছবিটি মৌলিক। নকল ধরিয়ে দিতে পারলে তিনি ১০ লক্ষ টাকা পুরস্কার দেবেন। এ নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে চলছিল শোরগোল। তারই ধারাবাহিকতায়  এবার ‘পাসওয়ার্ড’ ছবির বিরুদ্ধে সেন্সরবোর্ডে অভিযোগ করলেন চলচ্চিত্রকর্মী আনন্দ কুটুম। তার একটি কপি দেশ রূপান্তরের হাতে এসেছে।

সেন্সরবোর্ডে পাঠানো অভিযোগপত্রে আনন্দ কুটুম লেখেন, ‘মুক্তির আগে থেকেই সিনেমাটির বিরুদ্ধে নকলের অভিযোগ ওঠে। যদিও পরিচালক চ্যালেঞ্জ করেছেন পাসওয়ার্ড- তামিল বা তেলেগু সিনেমার নকল নয় এবং সিনেমাটি যে নকল তা কেউ প্রমাণ করতে পারলে ১০ লক্ষ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। কিন্তু মুক্তির পরে হলে গিয়ে সিনেমাটি দেখার পর সাউথ কোরিয়ান সিনেমা 'দ্য টার্গেট' এর সঙ্গে পাসওয়ার্ড সিনেমার হুবহু মিল খুঁজে পাওয়া যায়৷ দ্য টার্গেট সিনেমাটি ২০১৪ সালে মুক্তি প্রাপ্ত একটি কোরিয়ান সিনেমা। সিনেমাটি আগেই দেখা ছিল, ফলে পাসওয়ার্ডের সঙ্গে দ্য টার্গেটের মিলগুলো সহজেই চোখে ধরা পরে। গত কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে পাসওয়ার্ড সিনেমা নকল নিয়ে প্রতিবেদন প্রচার/প্রকাশ হয়। কিন্তু অবাক বিষয় হলো, এরপরও পরিচালক মালেক আফসারী সিনেমাটিকে নকল বলতে নারাজ। সম্প্রতি তিনি বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে বলেছেন- "আমি দশটি সিনেমা দেখে একটি সিনেমা বানাই। তাই এটা নকল নয়, গবেষণা।" তার এই বক্তব্য একই সঙ্গে হাস্যকর নয় এবং সমগ্র জাতির প্রতি প্রহসন। যার প্রেক্ষিতে আমি সেন্সর বোর্ডের নিকট অভিযোগ আনতে বাধ্য হয়েছি এবং একই সাথে এই অভিযোগ খতিয়ে দেখার জন্য সবিনয় আবেদন করছি।’

আনন্দ কুটুম ছবিটির বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগ তোলেন। অভিযোগ পত্রে তিনি ৮ টি অভিযোগ উপস্থাপন করেন। তার অভিযোগগুলো হলো-

image

গণপ্রজাতন্ত্রী সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সব সময় সিনেমা বান্ধব মনোভাব প্রকাশ করে থাকেন। সেখানে সিনেমা নির্মাণ নিয়ে দর্শকের সঙ্গে এমন ফাঁকিবাজি কতটা সংগত? ইন্টারনেটের এই যুগে এই সব জোচ্চুরি খুব দ্রুত ছড়িয়ে পরে, বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে আমি মনে করি-

১৷ পাসওয়ার্ড সিনেমার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোথাও উল্লেখ করা নেই যে এটা কোরিয়ান সিনেমা- দ্য টার্গেটের কপিরাইট নিয়ে (রিমেক করা) নির্মিত।

২। পাসওয়ার্ড সিনেমার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোথাও উল্লেখ করা নেই যে কোন বিদেশি সিনেমার ছায়া অবলম্বনে নির্মিত।

৩। পাসওয়ার্ড সিনেমার গল্প পুরোটাই কোরিয়ান সিনেমা- দ্য টার্গেটের গল্পের নকল। যা পুনঃ সেন্সরে অবশ্যই ক্লিয়ার হতে পারবেন।

৪। লোকেশন ভিন্ন হলেও দুটো সিনেমার দৃশ্যধারণ একই ভাবে করা হয়েছে।

৫। গল্প, দৃশ্য, শট, অ্যাকশন নকলের পাশাপাশি প্রপসের ক্ষেত্রেও নকল করার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।

৬। যখন কোনো পরিচালক একটা ভিনদেশি সিনেমা নকল করেও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ও গণমাধ্যমে বলেন এটা নকল নয়, গবেষণা, তখন পরবর্তী প্রজন্মের নির্মাতারা আশাহত হন। একই কাজ অন্য কোনো পরিচালক করলে তা প্রতিরোধ করার রাস্তা কোথায়?

৭। অন্যের সিনেমা নকল করে (গল্প এবং দৃশ্যধারণ) তা নিজের নামে চালিয়ে দেয়া কতটুকু আইনসম্মত? এটা কি নিয়ম বহিঃভূত নয়?

৮। কোরিয়ান সিনেমার দৈর্ঘ্য ১ ঘণ্টা ৩৭ মিনিট। পাসওয়ার্ডের দৈর্ঘ্য ২ ঘণ্টা ১৭ মিনিট। এই কারণে পাসওয়ার্ড নকল নয়, এমনটা দাবি করেন পরিচালক মালেক আফসারী। উল্লেখ্য- গান আর কয়েকটি দৃশ্য বাদ দিয়ে পাসওয়ার্ড পুরোটাই কোরিয়ান সিনেমা- দ্য টার্গেটের নকল।

 

এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আনন্দ কুটুম বলেন, ‘পাসওয়ার্ড চলচ্চিত্রটি পরিকল্পিত ভাবে কপি পেস্ট একটি সিনেমা। যাকে স্পষ্ট ভাষায় বলা যায় জোচ্চুরি। এই এই জোচ্চুরি নিয়ে মালেক আফসারী বিন্দুমাত্র লজ্জিত নয়। এমতাবস্থায় আমাদের করণীয় কী? অফিশিয়ালি সেন্সর বোর্ডকে জানানো হয়েছে এই জোচ্চুরির কথা। সঙ্গে প্রমাণ হিসেবে দেওয়া হয়েছে কোরিয়ান পরিচালক চ্যাং পরিচালিত দ্য টার্গেট চলচ্চিত্রটি। এখন দেখার অপেক্ষা যে সরকার এই জোচ্চুরির বিষয় কি পদক্ষেপ নেয়। দিনের আলোতে নির্লজ্জের মতো অন্যের সৃষ্টিকে চুরি করার বিষয় সরকারের ব্যাখ্যা কী তা শোনার অপেক্ষায় আছি এখন। মালেক আফসারির মত পরিচালকদের এই বার্তাটুকুই আমরা পৌঁছে দিতে চাই যে, দেশ এতটা অথর্ব হয়ে পারেনি যে এখানে যা ইচ্ছা তাই বলে দেওয়া যায়। যা ইচ্ছা তাই চুরি করে হজম করে ফেলা যায়। কপি সিনেমা নিয়ে আমার ব্যক্তিগত কোনো মাথাব্যথা নেই। মাথাব্যথা নেই শাকিব খানের ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জনেও। আমার প্রধান কনসার্ন হল, যে কেউ চাইলেই কি এ দেশে যে কারও শিল্প চুরি করে বা হুবহু কপি করে নিজের নামে চালিয়ে দিতে পারে?’’

১৭ জুন, সোমবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে সেন্সর বোর্ডের সচিব বরাবর অভিযোগ দাখিল করেছেন উল্লেখ করে আনন্দ কুটুম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সারা বিশ্বেই এক দেশের ছবি অন্য দেশে রিমেক হয় বা কপি করে কিন্তু সেটা অনুমতি নিয়ে করে। বাংলাদেশে যেটা হচ্ছে কপি করলেও কেউ মূল ছবির প্রযোজনা সংস্থা থেকে অনুমতি নেন না। তার থেকেও বড় কথা ছবি নকল করেও মালেক আফসারীর মতো পরিচালকরা বড় গলায় এটাকে মৌলিক বলে উল্লেখ করেন। এভাবে তো একটা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি চলতে পারে না। এর থেকে নতুন প্রজন্ম কি শিখছে। এটার বিরুদ্ধে এই মুহূর্তেই যদি ব্যবস্থা না নেওয়া হয় তাহলে এটা মহামারি রূপ নেবে। শুধু তাই নয়, বহির্বিশ্বের কাছে আমাদের রেপুটেশনও নষ্ট হচ্ছে। কারণ কোরিয়ান ওই নির্মাতা যখন জানবেন যে তার ছবিটি হুবহু নকল করা হয়েছে তখন বাংলাদেশ সম্পর্কে তার মনোভাবটা কি হবে। সেটাও ভাবতে হবে। এই সব কারণ বিবেচনা করেই একজন চলচ্চিত্র কর্মী হিসেবে আমি এই অভিযোগ দায়ের করেছি। এখন সেন্সরবোর্ড কি করবে সেটা তারই ভালো জানে।’

এ প্রসঙ্গে সেন্সর বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান নিজামুল কবীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা অভিযোগপত্র পেয়েছি। এখন ছবিটি আমরা পুরোটাই দেখব। দেখে যদি মনে হয় ছবিটি নকল তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। আর যদি দেখা যায় কিছু কিছু অংশ নকল তাহলে ওই অংশটুকু কেটে ফেলে দিতে বলব। ছবিটি যদি পুরোপুরি নকল হয় তাহলে ছবিটি ব্যান করে দেওয়া হবে।’

কবে নাগাদ ব্যবস্থা নেবেন জানতে চাইলে সেন্সরবোর্ড চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমাদের পরবর্তী সভার এজেন্ডায় এই বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হলে আমরা এটা নিয়ে আলোচনা করব। তবে ঠিক কবে নাগাদ হবে সেটা বলতে পারব না।’

উল্লেখ্য, ‘পাসওয়ার্ড’ ছবিতে শাকিব খান ও বুবলী ছাড়াও আরও অভিনয় করেছেন মিশা সওদাগর, ইমন, অমিত হাসান ও ডন। এসকে ফিল্মসের সঙ্গে ছবিটির সহ-প্রযোজক হিসেবে আছেন মো. ইকবাল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত