সাকিবের বিশ্বমঞ্চে পারফরম্যান্স ফ্লুক নয়

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০১৯, ১২:১৪ এএম

আইপিএলে মাত্র তিন ম্যাচে মাঠে নামার সুযোগ পেয়েছেন সাকিব আল হাসান। বাকি সময় বেঞ্চ গরম করার কাজ না করে অন্য ব্রতে ব্যস্ত রেখেছেন নিজেকে। নিজের সেরা বের করে আনার ব্রত। এ জন্য ফিটনেস নিয়ে প্রচুর খেটেছেন। ওজন কমিয়ে ফিরেছেন তরুণ সাকিবের অবয়বে। প্রিয় গুরু সালাহউদ্দিনকে উড়িয়ে নিয়েছেন মুম্বাইয়ে। নিবিড় অনুশীলনে নিজের ব্যাটিং দুর্বলতা কাটিয়ে তুলেছেন। অবশ্য ঈশ্বরপ্রদত্ত বোলিং নিয়ে খুব একটা ভাবতে হয়নি এই তারকা ক্রিকেটারকে।

সাকিব বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রতিভাবানদের একজন। ক্যরিয়ারে কখনোই কঠোর পরিশ্রমের শেকলে নিজেকে বাঁধেননি। তবুও ছিলেন বাকিদের চেয়ে এগিয়ে। আর এবার বিশ্বকাপে দলগতভাবে বড় লক্ষ্য তাড়া করতে নিজের চেনা গ-ি ভেঙে করেছেন সর্বোচ্চ পরিশ্রম। তার ফল হাতেনাতে পাওয়া তাই ছিল সময়ের ব্যাপার, পেয়েছেনও। বিশ্বকাপের ইতিহাসের সেরা অলরাউন্ড পারফরম্যান্সে ছাড়িয়ে গেছেন সবাইকে। ৮ ইনিংসের মধ্যে টানা দুই সেঞ্চুরির পাশে করেছেন পাঁচটি ফিফটি। এক আসরে শচীনের সাত ফিফটির রেকর্ড ছুঁয়েছেন। পাঁচ উইকেটও শিকার করেছেন। ব্যাট হাতে ৬০৬’র পাশে বল হাতে নিয়েছেন ১১ উইকেট। তার নিকটবর্তী পারফরম্যান্স হিসাব করলে ১৯৯৯ বিশ্বকাপের নিল জনসনের নাম। যার পারফরম্যান্স ছিল ৩৬৭ রানের পাশে ১২ উইকেট।

নিজের সর্বোচ্চটা দিয়েও দলকে সেমিফাইনালে তুলতে না পারার আক্ষেপ আছে সাকিবের কণ্ঠে, ‘দলের কথা ভাবলে হতাশ লাগে। তবে ব্যক্তিগতভাবে দারুণ বিশ্বকাপ কেটেছে আমার। নিজের পারফরম্যান্সে আমি সন্তুষ্ট। যে আশা নিয়ে বিশ্বকাপের প্রস্তুতি নিয়েছি তার পুরো ফল পেয়েছি।’ তবে শুধু প্রস্তুতি নয় কিছুটা ভাগ্যেও বিশ্বাসী সাকিব। নিজে বিশ্বাস করেন শুরুতে মোমেন্টাম না পেলে নিজেকে এই উচ্চতায় নিতে পারতেন না। আমি একটা মোমেন্টামের আশায় ছিলাম। তারপর তা ধরে রাখার ইচ্ছে ছিল। ভাগ্যিস দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে তা পেয়ে যাই।’

বিশ্বকাপের আগেও সাকিবকে বিদেশের মাঠে আটকানোর মোক্ষম অস্ত্র ছিল টানা বাউন্সারে আক্রমণ করা। তবে এবার দৃশ্যটা পালটে দিলেন সাকিব নিজেই। ইংল্যান্ড, উইন্ডিজদের মতো বোলারদের ডাক করেছেন। প্রয়োজনে প্রতি ম্যাচেই হুক করেছেন পুল করেছেন নির্ভয়ে। এবার আর উইকেট বিলিয়ে দিয়ে আসেননি। এছাড়াও এবার দলের কথা বিবেচনায় এনে রানিং বিটুইন দ্য উইকেটে হয়েছেন আগের চেয়ে ক্ষিপ্র। ব্যাটিংয়ের আমূল পরিবর্তন করে স্বীকৃত ব্যাটসম্যান হিসেবে র‌্যাংকিং-এ এগিয়েছেন দশ ধাপ। সাকিবের কাছে এবারের আসরে তার প্রিয় ইনিংস নিয়ে জানতে চাইলে বলেন, ‘আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে রান করা কঠিন ছিল। তবে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেঞ্চুরি আমার প্রিয় ইনিংস।’ ক্রিকেট বিশ্লেষকরাও সাকিবের এই ব্যাটিং সত্তার প্রশংসা করেছেন।

এবারের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে স্পিনারদের জন্য বলার মতো কিছু ছিল না। তবে স্পিনার হিসেবে সবচেয়ে উইকেট শিকারে সাকিব আছেন তাহিরের সঙ্গে শীর্ষে। সাউদাম্পটনে হালকা স্পিনিং ট্র্যাক পেয়ে আফগান ব্যাটসম্যানদের নিয়ে রীতিমতো ছেলেখেলা করেছেন। ২৯ রানেই নিয়েছেন ৫ উইকেট। এছাড়াও অন্যান্য ম্যাচেও প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানদের চাপে রেখেছেন। নিয়মিত ব্রেক থ্রু এনে দিয়েছেন।

লম্বা সময় ধরে চলা বিশ্বকাপের শেষ দিকে এসে কিছুটা মানসিক অবসাদে ভুগেছেন সাকিব। কিন্তু নিজের ফিটনেস আর মানসিক শক্তি দিয়ে পারফরম্যান্স করেছেন দলের স্বার্থে। নিজের ক্লান্তিকর অবসাদ নিয়ে সাকিব বলেন, ‘শেষ দু’ম্যাচে আমি কিছুটা মানসিকভাবে ক্লান্ত ছিলাম। তবে ফিটনেসের কল্যাণে উতরে গেছি। আসলে টানা একই কাজ করতে করতে কিছুটা একঘেয়েমি চলে আসছিল।’ তবে ক্রিকেটার সাকিব মাঠে নামলে অন্যসব বাধা যেন তুচ্ছ হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের জন্য সাকিবের নিবেদন নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো স্ুেযাগ নেই। দলের জন্য নিজের প্রয়োজনীয়তা সাকিব নিজেই উপলব্ধি করেন। তাইতো নিজেকে তুলে এনেছেন তিনে। চলিশোর্ধ্ব গড়ে রান করেছেন। বিশ্বকাপের জন্য নিজের মাঝে পরিবর্তন এনেছেন। তাই সাকিবের এই রান করা বা অলরাউন্ডিং পারফরম্যান্স নিছক ফ্লুক নয়। সম্ভবত এই বাঘ নিজেকে প্রমাণের জন্য সেরা মঞ্চকেই বেছে নিতে চেয়েছিলেন। তাই বিশ্বকাপে বিশ্ব নতুন করে শুনল সাকিব আল হাসান নামক বাঘের গর্জন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত