সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি পাগলাবাড়ির সামনে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে নিহত ব্যক্তি নিজের মেয়েকে দেখতে এসেছিলেন। তিনি জন্ম থেকেই কথা বলতে পারতেন না বলে স্বজনরা জানিয়েছেন।
নিহত সিরাজ ভোলার লালমোহন উপজেলার মুগিয়া বাজার এলাকার আব্দুর রশিদের ছেলে। তিনি রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। চার ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সিরাজ বড়।
রবিবার দুপুরে সিদ্ধিরগঞ্জের সাইলোগেইট বটতলা এলাকায় সিরাজের নামাজে জানাজা শেষে নিহতের স্বজনরা এসব জানান।
এর আগে শনিবার সকালে মিজমিজি পাগলাবাড়ির সামনে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে অজ্ঞাত পরিচয় (২৫) এক যুবক নিহত হন। পরে রাতে ফেসবুকে ছবি দেখে থানায় গিয়ে লাশ শনাক্ত করে নিহতের পরিবার। তারা জানায়, সিরাজ ছেলেধরা নয় বরং বাক্প্রতিবন্ধী এবং সে তার নিজের মেয়েকে দেখতে গিয়েছিলেন।
আজ জানাজা শেষে সিরাজের ছোট ভাই আলম জানান, “আমার ভাই ছেলেধরা না। নিজের মেয়ের সঙ্গে লুকিয়ে দেখা করতে গিয়েছিল। নিজের কাছে টাকা ছিল না। তাই একটি মোবাইলের দোকান থেকে ১০০ টাকা ধার করে মেয়ের জন্য বিস্কুট, চিপস নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু, স্ত্রী শামসুন্নাহার তার বর্তমান স্বামীকে দিয়ে মানুষকে ভুল তথ্য দিয়ে সিরাজকে হত্যা করেছে।”
আলম জানান, গত আট মাস আগে একমাত্র মেয়েকে নিয়ে অন্য ছেলের সঙ্গে পালিয়ে যায় সিরাজের স্ত্রী। এরপর থেকেই একা হয়ে যান বাক-প্রতিবন্ধী সিরাজ। বাক-প্রতিবন্ধী সিরাজ স্ত্রীকে ভুলে গেলেও মেয়েকে ভুলতে পারেননি। তাই প্রতিদিনই মেয়ের খোঁজ নিতে চেষ্টা চালিয়ে গেছেন সিরাজ। একপর্যায়ে দুই মাস আগে সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি আলামিননগর এলাকায় কাজ করতে গিয়ে রাস্তায় মেয়ে মিনজুকে দেখতে পান । সেই থেকে তিন-চার দিন পরপরই সকালে স্কুলে যাওয়ার রাস্তায় মেয়েকে দেখতে যেতেন সিরাজ। এ ধারাবাহিকতায় গত ২০ জুলাই সকালে মেয়েকে দেখতে যান সিরাজ। আর সেই দেখাই হয় বাবা-মেয়ের শেষ দেখা।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে শামসুন্নাহারের বর্তমান স্বামী আব্দুল মান্নান সোহেলের মোবাইলে যোগাযোগ করলে তার ফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।
সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন শাহ পারভেজ জানান, ২০ জুলাই সকালে গণপিটুনির ঘটনায় নিহত ও আহতের পৃথক দুটি ঘটনায় দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। সিরাজ হত্যা মামলায় ৭৬ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত আরও ২০০ জনকে আসামি করা হয়।
সিরাজ হত্যা মামলার বাদী এসআই সাখাওয়াত হোসেন জানান, সিরাজের ভাইয়েরা দাবি করছে উদ্ধারকৃত মেয়েটি তাদের ভাতিজি। তবে এক নারী মেয়েটিকে নিজের বলে দাবি করছেন। এ নিয়ে তদন্ত চলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তদন্ত শেষে বিস্তারিত বলা যাবে।
এদিকে আজ দুপুরে শহরের চাষাঢ়ায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নারায়ণগঞ্জের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও বর্তমান ছেলে ধরা গুজব ছড়ানোকে কেন্দ্র করে এক ব্রিফিংয়ে জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) হারুন অর রশিদ বলেন, “গত ২০ জুলাই সিদ্ধিরগঞ্জে ৩০ বছরের যে যুবককে গণপিটুনিতে মারা হয়েছে সে বাক্প্রতিবন্ধী ছিল। ছেলেধরা বিষয়টি গুজব ছিল। আর এই গুজবে এলাকাবাসী জড়িত।”
যারা এই গুজব ছড়াচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, “ইতিমধ্যে কয়েকজনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে। এলাকার কিছু গণ্যমান্য ব্যক্তি নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য এই গুজব ছড়াচ্ছেন। আমরা তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। সেই তদন্ত অনুসারে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
