আটলান্টিক উপকূলেও ছড়িয়ে পড়ছে আমাজনের ধোঁয়া

আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০১৯, ০৭:১০ পিএম

ভয়াবহ দাবানলে পুড়ছে ব্রাজিলের আমাজন জঙ্গল। পৃথিবীর ফুসফুস হিসেবে পরিচিত সুবিশাল রেইন ফরেস্টটির হাজার হাজার জায়গায় আগুন জ্বলছে। গত এক দশকেও এ রকম ভয়াবহ দাবানল দেখা যায়নি সেখানে।

বিবিসি বাংলা জানায়, দাবানলের আগুন আগুন থেকে কুণ্ডলী পাকিয়ে ওঠা ধোঁয়া আমাজনের গোটা এলাকা জুড়ে এবং আশপাশে ছড়িয়ে পড়েছে।

সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ব্রাজিলের উত্তরাঞ্চলে রোরাইমা, একার, রনডোনিয়া এবং আমাজোনাস রাজ্যে, পাশাপাশি মাতো গ্রোসো ডো সুল এলাকাতেও। দেশটির সবচেয়ে বড় রাজ্য আমাজোনাস্ জরুরি অবস্থা জারি করেছে।

এ দিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপারনিকাস অ্যাটমসফিয়ার মনিটরিং সার্ভিসের (ক্যামস্) জানিয়েছে, আমাজনের দাবানলের ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছে আটলান্টিকের উপকূল পর্যন্ত। এমনকি ২০০০ মাইলেরও (৩২০০ কি.মি) বেশি দূরে সাও পাওলোর আকাশ এই ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে গেছে।

এই আগুন থেকে ব্যাপক পরিমাণ কার্বন ডাইঅক্সাইড নির্গত হচ্ছে, যার পরিমাণ এ বছর ২২৮ মেগাটনের সমপরিমাণ দাঁড়িয়েছে। ক্যামস্ সংস্থাটি বলছে, এই পরিমাণ ২০১০-এর পর সবচেয়ে বেশি।

এই ধোঁয়া থেকে কার্বন মনোক্সাইডও নির্গত হচ্ছে। কাঠ পোড়ালে সচরাচর এই গ্যাস নির্গত হয়।

ক্যামস্ যে মানচিত্র প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যাচ্ছে খুবই চড়া মাত্রায় বিষাক্ত এই গ্যাস কার্বন মনোক্সাইড দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল ছাড়িয়ে এখন আরও দূরে ছড়িয়ে পড়ছে।

আমাজন অরণ্যাঞ্চলে তিরিশ লাখ প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদ রয়েছে। সেখানে বসবাস করেন ১০ লাখ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ। এই বনাঞ্চল বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ন্ত্রণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই বিশাল অরণ্যাঞ্চলের গাছপালা প্রতি বছর কয়েক মিলিয়ন টন কার্বন শুষে নিয়ে বিশ্বের উষ্ণায়ন মোকাবিলা করে।

কিন্তু গাছ যখন কাটা হয়, অথবা পুড়িয়ে ফেলা হয়, তখন যে কার্বন গাছের মধ্যে সঞ্চিত থাকে তা বায়ুমণ্ডলে আবার মিশে যায় এবং উষ্ণমণ্ডলীয় এসব বৃক্ষের কার্বন শুষে নেওয়ার ক্ষমতা হ্রাস পায়।

৭.৪ বর্গ কিলোমিটার এলাকা বিস্তৃত আমাজন বেসিনের আরও বেশ কিছু দেশ এ বছরের ব্যাপক দাবানলের কবলে পড়েছে।

এদিকে আমাজনের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে বলিভিয়ার পূর্বাঞ্চলেও। দেশটির সরকার এই দাবানল নেভানোর কাজে সহায়তা করার জন্য একটি বিমানের মাধ্যমে অগ্নি নির্বাপক যন্ত্র ভাড়া করেছে।

 প্রায় ছয় বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে রয়েছে বলিভিয়ার বনাঞ্চল। ওই এলাকায় পাঠানো হয়েছে অতিরিক্ত জরুরিকালীন কর্মী। এবং আগুনের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য পশুপাখিদের জন্য অভয়ারণ্য তৈরি করা হচ্ছে।

ব্রাজিলে আমাজনের উষ্ণমণ্ডলীয় বনাঞ্চলে ২০১৯ সালে ব্রাজিলিয়ান স্পেস এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী রেকর্ডসংখ্যক দাবানলের ঘটনা ঘটেছে।

দ্য ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্পেস রিসার্চ বলছে তাদের উপগ্রহ থেকে সংগৃহীত তথ্যে দেখা যাচ্ছে ২০১৮-র একই সময়ের তুলনায় এ বছর আগুন লাগার ঘটনা ৮৫ শতাংশ বেড়েছে।

সরকারি হিসেব বলছে, এ বছরের প্রথম আট মাসে ব্রাজিলের জঙ্গলে ৭৫ হাজারের বেশি দাবানল হয়েছে। ২০১৩ সালের পর এই সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। পুরো ২০১৮ সালে বনাঞ্চলে মোট আগুন লাগার সংখ্যা ছিল ৩৯,৭৫৯।

ব্রাজিলের পর দ্বিতীয় সর্বাধিক আগুনের ঘটনা ঘটেছে ভেনেজুয়েলায়। সেখানে দাবানল হয়েছে ২৬ হাজারটি। তৃতীয় স্থানে রয়েছে বলিভিয়া যেখানে আগুনের ঘটনা ঘটেছে ১৭ হাজারের বেশি।

শুকনো মৌসুমে আমাজনের জঙ্গলে দাবানল একটা প্রচলিত ঘটনা। সেখানে শুকনো মৌসুমের সময়কাল জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত। এই দাবানল তৈরি হতে পারে প্রাকৃতিক কারণে, যেমন বাজ পড়লে। কিন্তু কৃষক এবং কাঠুরেরাও ফসল উৎপাদনের জন্য অথবা পশু চরানোর জন্য জমি পরিষ্কার করার কারণে জঙ্গলে আগুন দিয়ে থাকে।

আন্দোলনকারীরা বলছে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জেয়ার বলসোনারোর পরিবেশ বিরোধী কথাবার্তা এভাবে জঙ্গল সাফ করার কাজকে আরও উৎসাহিত করেছে।

এর জবাবে, বলসোনারো এর দায় চাপিয়েছেন বেসরকারি সংস্থাগুলোর ওপরে। তার অভিযোগ, বেসরকারি সংস্থাগুলো সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার জন্য নিজেরাই এই আগুনগুলো লাগিয়েছে।

পরে অবশ্য তিনি স্বীকার করেছেন যে এই দাবানল বন্ধ করার মতো সম্পদ সরকারের হাতে নেই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত