বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নানাজনে নানাভাবে লিখেছেন; এবং যারা লিখেছেন তারা অনেকেই এমনভাবে লিখেছেন যেন বাংলাদেশের ইতিহাস ১৯৭১ সালেই শুরু হয়েছে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার মাধ্যমেই এই দেশ ও জাতির জন্ম হয়েছে। এমন খ-িত ধারণা মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী প্রজন্মের কাছে অত্যন্ত বিব্রতকর। তারা কার ইতিহাস বা কোন ইতিহাস সঠিক বলে গ্রহণ করবে? বাংলা ও বাঙালির ইতিহাস হাজার হাজার বছর ধরে বহমান। তবে গত শতকটি নিঃসন্দেহে বাঙালির জন্য খুবই ঘটনাবহুল। ১৯৪০-এর দশকে বাঙালি জাতির কাছে একটি বিশেষ সুযোগ এসেছিল যার উল্লেখ সকল ইতিহাস বইয়ে আছে, কিন্তু আমাদের বর্তমান প্রজন্ম তা কতটুকু জানে? এখানে আমি বাংলার স্বাধীনতা নিয়ে ১৯৪০-এর দশকে ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া ‘ক্যাবিনেট মিশন প্রস্তাব’-এর কথা আলোচনা করব। সে বিষয়ে হয়তো তরুণরা অনেকেই জানে না।
দক্ষিণ এশিয়ার গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় বাঙালির ইতিহাস অনেক পুরনো। তবে, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের সময় থেকে বাঙালি জাতির আলোচনা প্রবলভাবে সামনে উঠে আসে। উত্তরে হিমালয় ও দক্ষিণে বাংলা সাগরের মাঝে বাংলার এই ভূখ- চীনাদের কাছে বাঙ্গালাহ, আরবি ফার্সিতে বাংলা সুবা নামে পরিচিত ছিল। ভারতের অন্যত্র এবং বহির্বিশ্বে বাংলা নদীনালা ও জলাভূমির দেশ ও বাঙালি মাছেভাতে মানুষ বলে সবাই জানত। ব্রিটিশরা বাংলায় ঘাঁটি গেড়ে কলকাতা নগরীকে কেন্দ্র করেই তাদের সাম্রাজ্য বিস্তার করে। ব্রিটিশ ভারতের গভর্নর লর্ড কার্জন ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ করে রাজশাহী, ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের সঙ্গে আসামকে যুক্ত করে পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ হয়। বিহার ও উড়িষ্যা বাংলার প্রেসিডেন্সি ও বর্ধমান বিভাগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাংলা প্রদেশ হয়। লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ বাঙালির মনে অভূতপূর্ব জাতীয়তাবোধ সৃষ্টি করে হিন্দু-মুসলমান সবাইকে জড়িয়ে ফেলে। ঢাকাকেন্দ্রিক অধিকাংশ মুসলমান বঙ্গভঙ্গের পক্ষে এবং কলকাতাকেন্দ্রিক অধিকাংশ হিন্দু বঙ্গভঙ্গের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। অব্যাহত আন্দোলনের মুখে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়ে যায়।
বঙ্গভঙ্গ রদ বাংলার পূর্ব অংশের ঢাকাকেন্দ্রিক মুসলমানদের মনে প্রচ- ক্ষোভ সৃষ্টি করে। তারা কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দুদের প্রভাবমুক্ত হয়ে এবং নবসৃষ্ট পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে রাজধানী ঢাকায় প্রতিপত্তি করার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু বঙ্গভঙ্গ রদ করার পর ঢাকা আবার হিন্দু প্রভাবিত কলকাতার অধীনে চলে যায়। ব্রিটিশরা বঙ্গভঙ্গ রদ করার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লি শহরে নিয়ে যায়। এরপর সারা ভারতের রাজধানী হিসেবে দিল্লি কলকাতা থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়। কিন্তু কলকাতার জাতীয়তাবাদী বাঙালিরা তখন আশ্চর্যজনকভাবে এই ব্যাপারে তেমন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেননি।
বঙ্গভঙ্গ রদ বাঙালি অধ্যুষিত বিহার এবং আসামেও বিরূপ ফল দেয়। মিথিলা নামের বিহারের পূর্বাঞ্চল এবং সমগ্র আসাম ঐতিহাসিকভাবে বাংলা সংস্কৃতির প্রভাবিত অঞ্চল। মৈথিলী ভাষা এবং অসমিয়া ভাষা বাংলা অক্ষরে লেখা হয়। কিন্তু বঙ্গভঙ্গ রদের পর মিথিলা অংশ বিহারের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হলো। বাংলার পূর্বদিকে গোয়ালপাড়া এবং সিলেট জেলা আসাম প্রদেশের সঙ্গে যুক্ত হলো। ফলে বাংলা তার প্রভাবিত এলাকা থেকে বিযুক্ত হয়ে পূর্বের চেয়ে ছোট হয়ে যায় এবং এর ভেতরে হিন্দু-মুসলমান বিভেদও তীব্র আকার ধারণ করে। এই বিভেদ বাংলাভাষা ও বাঙালি জাতির অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে সৃষ্ট হিন্দু-মুসলমান বিভেদ দূর করার জন্য কলকাতার মেয়র চিত্তরঞ্জন দাশ ১৯২২ সালে ‘হিন্দু মুসলিম প্যাক্ট’ করেছিলেন। এ জন্য তাকে ‘দেশবন্ধু’ উপাধি দেওয়া হয়। এই প্যাক্ট হিন্দু-মুসলমান সকলের কাছেই গ্রহণযোগ্য ছিল। কিন্তু ১৯২৫ সালে তার অকালমৃত্যু হলে এই উদ্যোগেরও মৃত্যু হয়। এরপর ধর্মভেদ ও জাতিভেদ আরও প্রবল হয়ে বাঙালি সমাজে বিভেদের দীর্ঘস্থায়ী দেয়াল গড়ে তোলে। ব্রিটিশ সরকার ১৯৩৫ সালে ভারত শাসন আইন পাস করে যে নির্বাচনের ব্যবস্থা করে, তাতে ধর্মভিত্তিক এবং সমাজের নিম্নবর্গের পৃথক ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়। শেরে বাংলা একে ফজলুল হক এই আইনের বলেই বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন।
বিংশ শতাব্দীর তিরিশের দশকের শেষে ব্রিটিশ ভারতে জওয়াহেরলাল নেহরুর প্রভাবিত জাতীয় কংগ্রেস এবং মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রভাবিত মুসলিম লীগ প্রধান দুটি দল হিসেবে বেরিয়ে আসে। কংগ্রেস ভারতের মুসলমান ও হিন্দু উভয়ের স্বার্থরক্ষার দাবিদার হলেও মুসলিম লীগ ২৩ মার্চ ১৯৪০ লাহোর প্রস্তাবের মাধ্যমে মুসলমানদের জন্য পৃথক আবাসভূমির দাবি তোলে। বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা একে ফজলুল হক ঐ প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তাতে বলা হয়, ‘উপমহাদেশের যে সকল এলাকা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ, সে সকল এলাকা একত্রিত করিয়া স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ গঠন করিতে হইবে। এই রাষ্ট্রসমূহের অন্তর্ভুক্ত অংশগুলি হইবে স্বায়ত্তশাসিত এবং সার্বভৌম’। ঐ সময়ে ভারতের পূর্বাঞ্চলে বিহার, বাংলা ও আসামে এবং ভারতের পশ্চিমে সিন্ধু, পাঞ্জাব ও কাশ্মীর নিয়ে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল ছিল। কিন্তু মুসলিম লীগের গৃহীত লাহোর প্রস্তাব হিন্দু-মুসলমান বিরোধ তীব্রতর করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ব্রিটিশরা ভারত ছাড়ার উদ্যোগ নেয়। তারা ২৩ মার্চ ১৯৪৬ ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার ক্যাবিনেট মিশন প্রেরণ করে। ঐসময় বাংলার মুসলিম নেতারা এমন এক কাজ করেন যা ছিল চরম অদূরদর্শিতামূলক এবং বিপর্যয়মূলক। ৮ এপ্রিল ১৯৪৬ দিল্লিতে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের সভায় বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলা, সিন্ধু ও পাঞ্জাবকে একত্রিত করে চঅকওঝঞঅঘ গঠনের প্রস্তাব করেন। বলাই বাহুল্য ঐ সময় দক্ষিণ এশিয়ার মুসলমানদের একচ্ছত্র নেতা হয়ে গেছেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। জিন্নাহর চাপেই সোহরাওয়ার্দী এই প্রস্তাব আনতে বাধ্য হয়েছিলেন। যদিও চঅকওঝঞঅঘ শব্দের মূল দর্শনে পাঞ্জাব, আফগানিস্তান, কাশ্মীর, সিন্ধু এবং বেলুচিস্তানকে একত্রিত করে একটি রাষ্ট্রে পরিণত করার স্বপ্ন ছিল, তাতে বাংলার স্থান ছিল না। সোহরাওয়ার্দী উত্থাপিত প্রস্তাব পাস হয়ে গেলে লাহোর প্রস্তাবের কার্যকারিতা শেষ হয়ে যায়।
কিন্তু এরপরও সুযোগ ছিল। এবং এই সুযোগ দিয়েছিল খোদ ব্রিটিশ সরকারের ক্যাবিনেট মিশন। ব্রিটিশ মন্ত্রিসভার তিন সদস্যের ক্যাবিনেট মিশন ১৬ মে এবং ১৬ জুন ১৯৪৬ ভারতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের লক্ষ্যে দুটি প্রস্তাব দেয় যা ছিল নিম্নরূপ: (১) ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মুসলমান প্রধান প্রদেশগুলো নিয়ে ‘এ ইউনিট’, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মুসলমান প্রধান প্রদেশগুলো নিয়ে ‘সি ইউনিট’ এবং অন্যান্য হিন্দু প্রধান প্রদেশগুলো নিয়ে ‘বি ইউনিট’ গঠন করা হবে। ভারতে যে সকল দেশীয় রাজ্য আছে সেগুলো এই তিনটির যে কোনো ইউনিটে যোগদানের স্বাধীনতা দেওয়া হবে। এই তিনটি ইউনিট একটি শিথিল কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে থাকবে যা প্রতিরক্ষা, বৈদেশিক নীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করবে। (২) অথবা ব্রিটিশ ভারতকে ভেঙে হিন্দুস্তান এবং পাকিস্তান নামের দুটি রাষ্ট্রে পরিণত করা হবে। এই দুটি রাষ্ট্র একটি ফেডারেশন গড়তে পারবে।
ব্রিটিশ সরকারের ক্যাবিনেট মিশনের প্রথম প্রস্তাবটিই ছিল বাংলা তথা সমগ্র পূর্ব ভারতের জনগণের জন্য যথাযথ। এর মধ্যে বাংলা, বিহার ও আসাম পড়ত, যা ছিল ১৭৫৭ সালের নবাব সিরাজউদ্দৌলার বাংলা, যা ছিল ১৪৯৫ সালের হোসেন শাহের বাংলা, যা ছিলো ১৩৯০ সালের গিয়াসুদ্দিন আযম শাহের বাংলা, যা ছিল ১১৮০ সালের লক্ষ্মণ সেনের বাংলা, যা ছিল ৮১২ সালের দেবপালের বাংলা। কিন্তু বাংলার হিন্দু কি মুসলমান কোনো নেতাই তা বুঝলেন না। তাই ১৯৪৬ সালের ১০ জুলাই বোম্বাইয়ে দেওয়া এক বিবৃতিতে জওয়াহেরলাল নেহরু যখন ক্যাবিনেট মিশনের প্রথম প্রস্তাবটির সরাসরি বিরোধিতা করলেন তখন বাংলা থেকে কেউ টুঁ শব্দটিও করল না। ভারতীয় মুসলিম লীগের বাঙালি নেতারা বরং চরম হঠকারিতার সঙ্গে ঐ সময়েই মুসলমানদের জন্য পৃথক আবাসভূমি ‘পাকিস্তান’ বাস্তবায়নের দাবিতে ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’ ঘোষণা করেন। মুসলমান বাঙালিরা ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ সেøাগান দিয়ে কলকাতার রাস্তায় নেমে পড়ে। ঐদিন কলকাতায় ভয়াবহ হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা হয়। এরপর নোয়াখালীতে ও তারপর বিহারে দাঙ্গা হয়। ঐ হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা ও বিরোধিতা বাংলা ভাগ অবশ্যম্ভাবী করে তোলে।
কলকাতার ভয়াবহ দাঙ্গার পরও বাংলার ভবিষ্যৎ নিয়ে নেতাদের বোধোদয় হয়নি। সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে জিন্নাহর সম্পর্ক ক্রমশ খারাপ হয়ে গেলে ২৬ এপ্রিল ১৯৪৭ সোহরাওয়ার্দী নাটকীয়ভাবে গভর্নর জেনারেল মাউন্টব্যাটেনের কাছে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলার প্রস্তাব করেন। ৯ মে আবুল হাশিম ও কিরণশঙ্কর রায় মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে এ বিষয়ে আলাপ করেন। গান্ধী উৎসাহ দেখাননি। ২০ মে সোশ্যালিস্ট পার্টির নেতা শরৎচন্দ্র বসুর বাড়িতে স্বাধীন বাংলার প্রস্তাবকদের সভা হয়। কিন্তু ২৩ মে হিন্দু মহাসভার সভাপতি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে চিঠি দেন। চিঠিতে তিনি জিন্নাহর পাকিস্তানের দাবির বিপক্ষ নিয়ে বলেন, ‘ভারত ভাগ হোক আর না হোক বাংলা আর পাঞ্জাবকে ভাগ করতেই হবে’। তিনি ঐ পত্রে সার্বভৌম অবিভক্ত বাংলার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। জিন্নাহ ১৯৪৭ সালের ৫ আগস্ট সোহরাওয়ার্দীকে সরিয়ে খাজা নাজিমুদ্দিনকে পূর্ব বাংলা সরকারের মুখ্যমন্ত্রী করেন। এরপর ১৪ আগস্ট ১৯৪৭ ব্রিটিশ ভারত বিনা বাধায় ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামের দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র সৃষ্টি করে।
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর জেদ ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ফর্মুলায় ১৯৪৭-এ বাংলা ভাগ করে যে অংশ পাকিস্তানের অংশ হলো তাকে নেহরু পোকায় খাওয়া বা সড়ঃয-বধঃবহ চধশরংঃধহ বলেন। বাংলা ভাগের ফলে ১৯৪৭ পরবর্তী যে অঞ্চলকে নিয়ে পাকিস্তানের পূর্ব অংশ গঠিত হয়, সেটাকেই ‘মুসলিম বাংলা’ বলে অনেক সময় উল্লেখ করা হয়। তবে অবিভক্ত বাংলার মুসলিম প্রধান মুর্শিদাবাদ জেলা প্রথমে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হলেও পরে ভারতের এবং হিন্দুপ্রধান খুলনা জেলা প্রথমে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হলেও পরে পাকিস্তানের অংশ হয়ে যায়। আসামের সিলেট জেলা করিমগঞ্জ মহকুমা বাদে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। নবসৃষ্ট পাকিস্তান মুসলমানদের দেশ হলেও সেখানে বিপুলসংখ্যক হিন্দুদের বসবাস ছিল। তেমনি ভারতেও বিপুলসংখ্যক মুসলমানদের বসবাস ছিল। তাই দ্বিধাবিভক্ত বাংলা ও পাঞ্জাবে ভয়াবহ হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা বাধতে থাকে। এসব দাঙ্গায় লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয় এবং তাদের ঘরবাড়ি সহায়-সম্পত্তি ধ্বংস হয়। ১৯৫০ এর পর দুই বাংলার হিন্দু ও মুসলমান ব্যাপক হারে তাদের ভিটেমাটি ছেড়ে অপর পারে চলে যেতে থাকে। ১৯৪৭ সালের পূর্ব পাকিস্তান ১৯৭১ সালে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে হয়ে ওঠে স্বাধীন বাংলাদেশ।
অতীতের পূর্ব পাকিস্তান ও বর্তমান বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সীমারেখা উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্যকে ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিকভাবে মূল ভারত থেকে আড়াল করে রেখেছে। ব্রিটিশ আমলে ঐ রাজ্যগুলো অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশের এই বর্তমান ভূখ-ের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তাই যে পূর্ব পাকিস্তান ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ নামের স্বাধীন রাষ্ট্র হয়েছে, এই রাষ্ট্রের সীমারেখা এই এলাকার মানুষের কাছে এক
অপ্রাকৃতিক বাধা হয়ে আছে। এই সীমারেখার কারণে বাংলাদেশ ও ভারতের সঙ্গে অভিন্ন নদীগুলোর পানি ব্যবহার নিয়ে এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর জনগণের চলাফেরা ও বাণিজ্য নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে থেকে যাওয়া শরণার্থীদের নাগরিকত্ব নিয়ে যে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে, তাতে ১৯৪৬ সালের ক্যাবিনেট মিশনের ১ম প্রস্তাবটি প্রাসঙ্গিক হয়ে যায় বলে মনে হয়। আমাদের নেতারা যদি ঐ সময় ঐ প্রস্তাব গ্রহণ করতেন তাহলে আজ এই পরিস্থিতি হতো না।
লেখক
প্রকৌশলী ও চেয়ারম্যান, জল ও পরিবেশ ইনস্টিটিউট