বহুল বিতর্কিত সিরাজই হলেন চবির ছাত্র উপদেষ্টা!

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০১৯, ১০:৩৫ পিএম

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) প্রক্টর থাকাকালীন অধ্যাপক সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে উঠেছিল ছাত্র হত্যায় মদদ দেওয়ার অভিযোগ। ছাত্রলীগের মধ্যে গ্রুপিং বাঁধিয়ে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

একটি গ্রুপকে নিজের পক্ষে রেখে শত অন্যায়কে তিনি বৈধতা দিতেন বলেও রয়েছে অভিযোগ।

যার বিরুদ্ধে এত অভিযোগ সেই শিক্ষককেই এবার  ছাত্র উপদেষ্টার পদে নিয়োগ দিয়েছে বর্তমান প্রশাসন।

বৃহস্পতিবার দুপুরে বর্তমান ছাত্র উপদেষ্টা আহমদ সালাহউদ্দিনকে পদত্যাগে করিয়ে নানা অভিযোগে বিতর্কিত সিরাজ উদ দৌলাকে এ পদে নিয়োগ দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন৷

এর আগে  ২০১৩ ও ২০১৪ সালে নানা অনিয়মে অভিযুক্ত প্রক্টর সিরাজ উদ দৌলার পদত্যাগের দাবিতে দিনের পর দিন বন্ধ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়। চবির সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ারুল আজিম আরিফ দায়িত্বে থাকাকালীন প্রক্টর পদে সিরাজ উদ দৌলাকে নিয়োগ দিয়ে হয়েছিলেন সমালোচিত।

বর্তমান উপাচার্য ড. শিরীণ আখতার ছাত্র উপদেষ্টা পদে নিয়োগ দেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে চলছে নানা সমালোচনা। ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের মধ্যেও বিরাজ করছে চাপা ক্ষোভ।

অভিযোগ রয়েছে, ২০১৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর ছাত্রলীগকর্মী তাপস সরকারকে চবি শাহ আমানত হলে গুলি করে হত্যা করে শাটল ট্রেনের বগিভিত্তিক  একটি গ্রুপের নেতাকর্মীরা৷  তৎকালীন প্রক্টর সিরাজ উদ দৌলা ছিলেন ওই গ্রুপের নিয়ন্ত্রক। এ ঘটনার পর প্রক্টরের পদত্যাগের দাবিতে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ারুল আজিম আরিফকে তার কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে ছাত্রলীগ৷ ওই দিন উপাচার্য দপ্তরে ইটপাটকেলও নিক্ষেপ করে তারা।

জানতে চাইলে নিহত ছাত্রলীগ কর্মী তাপস সরকারের মা অঞ্জলি রানী সরকার ‘কান্না জড়িত কণ্ঠে’ দেশ রূপান্তরকে বলেন, তাপসের হত্যায় মদদদাতা শিক্ষক ও হত্যাকারীরা যদি বড় দায়িত্বে থাকে তাহলে বিচার তো হবে না। এখন তাপসের রাজনৈতিক বড় ভাই রেজাউল হক রুবেল ছাত্রলীগের সভাপতি। আমি রুবেলসহ তাপসের বন্ধুদের বলব তারা যেন এদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে৷

চবি ছাত্রলীগের সভাপতি রেজাউল হক বলেন, যেহেতু উপাচার্য  ম্যাম তাকে দায়িত্ব দিয়েছেন। তাই এ বিষয় নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।

অভিযোগ রয়েছে, প্রক্টর সিরাজের ছত্রচ্ছায়ায় পরিচালিত গ্রুপটির কর্মীরা ২০১৪ সালের ৫ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরির সামনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সহসম্পাদক ও চবি ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাসির হায়দার বাবুলের গলায় জুতার মালা দেয়। এ সময় লাইব্রেরি অডিটোরিয়ামে প্রয়াত উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু ইউসুফের স্মরণ সভা ছিল ৷ এ ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হলে জড়িতদের কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ থেকে স্থায়ী বহিষ্কার করা হয়৷

অভিযোগ রয়েছে, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কৃত হলেও এদের নিয়ে তার অফিসে বসে থাকতেন সিরাজ উদ দৌলা। এমনকি প্রক্টরের গাড়িতে চড়েও ঘুরত তারা।

তখন প্রক্টর পদ থেকে সিরা উদ দৌলার পদত্যাগ দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় টানা সাত দিন অবরোধ করে রাখে ছাত্রলীগ। এ সময় প্রক্টর সিরাজ উদ দৌলার পদত্যাগ দাবিতে সংবাদ সম্মেলন, স্মারকলিপি প্রদানসহ নানা কর্মসূচি পালন করে তারা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নেতাদের অভিযোগ, প্রক্টর সিরাজের ছত্রচ্ছায়ায় ক্যাম্পাসে দাপিয়ে বেড়াত একটি অংশ। তাদের হাতে হাতে শোভা পেত  'সেভেন পয়েন্ট সিক্স ফাইভ' মডেলের পিস্তল। প্রতি রাতে তারা হল থেকে ফাঁকা গুলি ছুড়ে ক্যাম্পাসে আতঙ্ক ছড়াত। সেভেন পয়েন্ট সিক্স ফাইভ মডেলের পিস্তলের গুলিতে তাপস নিহত হন বলে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে জানা গেছে।

আরো অভিযোগ রয়েছে, তাপস সরকার হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত প্রধান আসামি আশরাফুজ্জামান আশার নেতৃত্বে পুরো ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণ করতেন তখনকার প্রক্টর সিরাজ উদ দৌলা। আশাকে দিয়েই তিনি গড়ে তুলেছিলেন নিজস্ব বাহিনী।

ছাত্রলীগের সাবেক নেতাদের অভিযোগ, আশার নেতৃত্বে নিজের গ্রুপ প্রতিষ্ঠিত করতে একপর্যায়ে প্রক্টর সিরাজ উদ দৌলা ছাত্রলীগের বড় একটি অংশকে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেন।

এ ছাড়া চাঁদাবাজির সংবাদ প্রকাশ করায় চবি সাংবাদিক সমিতির কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার এবং সাংবাদিকদের হত্যা, মারধর ও পঙ্গু করারও হুমকি দেয় তারা।

সাংবাদিক সমিতিতে তালা ঝোলানোর ঘটনায় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ চার নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করলেও প্রক্টর সিরাজ উদ দৌলা এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সূত্রে জানা যায়, গত ১১ নভেম্বর সিরাজ উদ দৌলাকে নিয়োগ দিতে বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করে সিরাজ উদ দৌলার অনুসারী কয়েকজন ছাত্র-শিক্ষক৷ওই দিন প্রক্টরের গাড়িতে করে ক্যাম্পাসে ঘুরতে দেখা যায় সিরাজ উদ দৌলাকে। এমনকি প্রক্টর অফিসেও তিনি অফিস করেন। তাকে প্রক্টরের গাড়িতে ঘুরতে থেকে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে জোর প্রতিবাদ জানানো হয় বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য বরাবর। ছাত্রলীগের তোপের মুখে তাকে প্রক্টরের পদে নিয়োগ দেওয়া থেকে বিরত থাকেন উপাচার্য।

পরে বৃহস্পতিবার দুপুরে তাকে ছাত্র উপদেষ্টা পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।

ছাত্রলীগের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে জানান, সিরাজ উদ দৌলার নাম গুগলে লিখে সার্চ দিলেই তার অন্যায়- অপকর্মের নানান তথ্য সমৃদ্ধ নিউজের লিংক উঠে আসে৷ শত শত নিউজই বলে দেয় উনি কেমন প্রকৃতির লোক ছিলেন৷ একজন অপরাধীদের প্রশ্রয়দানকারীকেই কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা করতে হবে? বিশ্ববিদ্যালয়ে কি এই দায়িত্ব পালনের যোগ্য আর কোনো মানুষ নেই?

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) কে এম নুর আহমদ বলেন, উপাচার্য মহোদয়ের আদেশে লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক সিরাজ উদ দৌলাকে ছাত্র উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক সিরাজ উদ দৌলা বলেন, 'অভিযোগ তো যে কেউ দিতে পারে। তবে অভিযোগ দিলে সেটা লিখিত ভাবে দিতে হবে। তোমাকে কেন বলবে? আমি এ বিষয়ে কিছু বলব না, তুমি যা ইচ্ছা লিখে দাও'।

এ বিষয়ে উপাচার্যকে কয়েকবার ফোন দিলেও তিনি কথা বলেননি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত