ছেলেদের পরনে বাহারি রংয়ের পাঞ্জাবি আর মেয়েদের কপালে লাল টিপ ও পরনে লাল রংয়ের শাড়ি। চারদিকে রঙিন পতাকা, লাল ও নীল ব্যানারে শিক্ষার্থীদের ছুটে চলা। কারও মাথায় বাহারি ক্যাপ, কারও হাতে ঢোল ও তবলা। কেনই বা হবে না। ভালোবাসা, আবেগ ও অনুভূতির ১৭৫ একরের জন্মদিন যে আজ। তাইতো নবরূপে সেজেছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সেই সঙ্গে সেজেছে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরাও। আজ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।
বছরের এই দিনটির জন্য ১৭৫ একরের ১৬ হাজার শিক্ষার্থী অপেক্ষায় থাকে। সেই সঙ্গে অপেক্ষায় থাকে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। দিনের শুরুতেই শিক্ষার্থীরা রুচিসম্মত পোশাক পরে নিজ বিভাগে উপস্থিত। গন্তব্য বিভাগের হয়ে আনন্দ শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করা।
সকল বিভাগ, আবাসিক হল, প্রশাসন, প্রকৌশল অফিস, জনসংযোগ অফিস, পরিবহন অফিসসহ নিজস্ব ব্যানারে আনন্দ শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করে। সকলে একত্রিত হলে আলোর মিছিলে পরিণত হয় ক্যাম্পাস।
শোভাযাত্রায় ঢোল ও তবলার তালে চলে জন্মদিনের স্লোগান। সঙ্গে চলে ফটোগ্রাফারদের ক্লিক ক্লিক শব্দ।
এভাবে শোভাযাত্রাটি ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে প্রশাসনিক ভবনের সামনে গিয়ে মিলিত হয়। সেখানে কেক কাটা হয়। এরপর শুরু হয় আলোচনা সভা। এছাড়াও দিনব্যাপী নানা আয়োজনে পালিত হবে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।
৪১ বছরের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি:
আজ ৪১ বছরে পা দিয়েছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়। গত ৪০ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাপ্তির ঝুড়ি অনেকটাই পূর্ণ হয়েছে। স্বাধীনতাত্তোর ১৯৭৯ সালের ২২ নভেম্বর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের। চরম সংকটাপন্ন মুহূর্ত মোকাবিলা করতে হয়েছে প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকেই। এর মধ্যে পার হয়েছে ১১ জন উপাচার্য।
বর্তমানে ৮টি অনুষদের অধীন ৩৪টি বিভাগে চলছে পাঠদান। বাংলা বিভাগের আওতায় প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু চেয়ার’। যেখানে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বিস্তর পঠন, পাঠন ও গবেষণা চলবে। শত প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে নির্মাণ হয়েছে বঙ্গবন্ধুর মুর্যাল ‘মৃত্যুঞ্জয়ী মুজিব’। যা দেশের দ্বিতীয় উচ্চতম বঙ্গবন্ধুর মুর্যাল।
মুক্তিযুদ্ধের উপর বিস্তর জ্ঞান অর্জনে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে মুক্তিযুদ্ধ কর্নার, বঙ্গবন্ধু কর্নার এবং একুশে কর্নার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
এছাড়াও সেশনজটের গ্লানি থেকে মুক্ত হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। গত আগস্ট মাসে একনেকের মাধ্যমে পেয়েছে ৫ শত ৩৭ কোটি ৭ লাখ টাকার মেগা প্রকল্প। এর আওতায় নির্মিত হবে ৯টি দশতলা ভবন। তৈরি হবে একটি কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান গবেষণাগার। ওই মেগা প্রকল্পের অধীনে কিছু ভবনের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের কাজ চলমান রয়েছে।
আন্তর্জাতিকীকরণের পথে এগিয়ে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। বর্তমানে অর্ধশতাধিক বিদেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। আগামী পাঁচ বছরের জন্য পাশ হয়েছে অর্গানোগ্রাম। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবময় ইতিহাস চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি হয়ে যাওয়া ৪র্থ সমাবর্তন। রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের উপস্থিতিতে এতে অংশ নিয়েছিলেন এগারো হাজার শিক্ষার্থী।
এত প্রাপ্তির মাঝেও কিছু অপ্রাপ্তির কথাও আছে। আবাসন সংকট এর মধ্যে অন্যতম। বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৭ হাজার। তবে মোট আটটি আবাসিক হলে শিক্ষার্থী বাস করছেন প্রায় আট হাজার। এর মধ্যে ছাত্রদের পাঁচটি আর ছাত্রীদের তিনটি।
আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাবনা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হলেও তা আজও সম্ভব হয়নি। ফলে পরিবহন নির্ভরতা দিন দিন বাড়ছে। বছর বছর শিক্ষার্থী বাড়লেও আবাসিক হলের অপর্যাপ্ত রয়েই যাচ্ছে। যার কারণে প্রত্যেক বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ব্যয়ের দশ শতাংশ গুনতে হয় পরিবহনের পেছনে। এছাড়াও শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের গবেষণা কাজ, অঞ্চলভিত্তিক রাজনীতিসহ বেশকিছু বিষয় কাটিয়ে উঠতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয়টি।
শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, বিশ্ববিদ্যালয়টি সম্পূর্ণ আবাসিক হবে। গবেষণাকাজে প্রশাসন তাদের মানসিক ও আর্থিকভাবে সহযোগিতা করবে। একইসঙ্গে দুই অঞ্চলের গণ্ডি পেরিয়ে ছাত্র রাজনীতি করার সুযোগ পাওয়া।’
এ বিষয়ে ভিসি প্রফেসর ড. হারুন-উর-রশিদ আসকারীর প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪১তম জন্মদিনে আমাদের প্রত্যাশা হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক মানের হিসেবে গড়ে তোলা। একইসঙ্গে আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পূর্ণতা দেওয়া। এ ছাড়া অবকাঠামো এবং একাডেমিক কারিকুলামগত সংস্কার সাধিত হয়েছে।
