ছোটবেলায় খেলতেন খো-খো। একটু বড় হওয়ার পর হতে চেয়েছিলেন ক্রিকেটার। কিন্তু হয়ে গেলেন তীরন্দাজ। আর গতকাল সেই তীর-ধনুকের খেলায় সফল নিশানাভেদে হয়ে গেলেন দক্ষিণ এশিয়ার সেরা। সুমা বিশ্বাস এসএ গেমসে শতভাগ সফল আরচারি দলের হয়ে জিতেছেন মেয়েদের কম্পাউন্ড এককের স্বর্ণপদক। আগের দিন একই ইভেন্টের দলগত লড়াইয়ে স্বর্ণজয়ী বাংলাদেশ দলের সদস্য ছিলেন মাগুরার এই মেয়ে। অথচ পোখারায় হয়তো আরচারি খেলতে আসাই হতো না তার। তার যে স্বপ্ন ছিল বর্ণময় ক্রিকেটের হাতছানি।
ক্রিকেটে আছে সম্মান, প্রচার আর অর্থের হাতছানি। তাই এ দেশের ছেলে-মেয়েদের ঝোঁকই এখন ক্রিকেট নিয়ে। সুমাও ছিলেন তেমনই। ২০০৯ সালে আরচারি শুরুর করার আগে খেলতেন খো-খো এবং ক্রিকেট। খো-খো ভালো খেলতেন বলেই স্বপ্ন ছিল জাতীয় দলে খেলার। কিন্তু মনটা তার পড়ে থাকত ক্রিকেট মাঠে। এক বছর চেষ্টা করেছেন ক্রিকেটে প্রতিষ্ঠিত হতে। ভালো পেস বল করতেন। ২০০৯ সালে মিরপুরের বাংলা কলেজে পড়াকালীন ক্রীড়া শিক্ষকের মাধ্যমে মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্সে সাতদিনের একটি আরচারি অনুশীলন ক্যাম্পে অংশ নেন। তখন খেলতেন বাঁশের তৈরি বো দিয়ে। তীর-ধনুকের নিশানাবাজিটা ভালো হচ্ছিল, আর আরচার বড় ভাই আনোয়ার হোসেনও চাইতেন সুমা এই স্পোর্টসই চেষ্টা করুক। এভাবেই শুরু। ২০১৪ সালে পেয়ে যান বাংলাদেশ আনসারের চাকরি। আরচার খেলোয়াড় হিসেবেই স্থায়ী চাকরি পান তিনি। আর ২০১৮ সালে প্রথমবারের মতো ডাক পান জাতীয় দলের ক্যাম্পে। এভাবেই ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্নকে জলাঞ্জলি দিয়ে তিনি বনে যান আরচার। আর কাল তো ঢাকে পড়লেন ইতিহাসে। অথচ কাল নিষ্পত্তি হওয়ার চারটি ব্যক্তিগত ইভেন্টে কেবল তাকে নিয়েই কোচদের ছিল সংশয়।
‘আমার নিজের বিশ্বাস ছিল এককে সোনা জিতব। তবে অন্য কেউ ভরসা পাচ্ছিলেন না। আমি ছিলাম দলের চতুর্থ খেলোয়াড়। কারণ এখানে আসার আগের দিনও আমাকে পরীক্ষার টেবিলে বসতে হয়েছে। বিএ পরীক্ষার জন্য অনুশীলনও ঠিকভাবে করতে পারিনি। আরচারি এমন একটি খেলা যেখানে একদিন অনুশীলন না করলেই ফিটনেস থাকে না। জিয়া স্যার (সহকারী কোচ জিয়াউর রহমান) কাল (পরশু) বলছিলেন আমাকে নিয়ে চিন্তায় তিনি। রোমান সানা, ইতি খাতুন আর সোহেল রানার কথাই সংবাদ মাধ্যমকে বলছিলেন তিনি। এতে আমার জেদ বেড়ে যায়। দেশের জন্য সোনা জয়ের চাপ ছিল। তবে জিয়া স্যার আমার আদর্শ। তার কথায় অনেক উৎসাহ পাই’– বলছিলেন সুমা।
শ্রীলঙ্কার প্রতিপক্ষ অনুরাধা করুনারত্নেকে ১৪২-১৩৪ পয়েন্টে হারিয়ে সোনার পদক জিতেছেন সুমা। দড়্গিণ এশিয়ার সেরা হওয়ার পর এখন তিনি নিজেকে আরচার হিসেবে পরিচয় দিতেই নিশ্চয় বেশি পছন্দ করবেন। ক্রিকেটার হতে না পারার আক্ষেপ তাকে আর কুরে খাবে না। চার ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট সুমা। গায়ের রং শ্যামলা বলে মেয়ের বিয়ে নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন মা। হাসতে হাসতে সে কথাই বলছিলেন সুমা। ‘মা আমার খেলাধুলা পছন্দ করতেন না। তবে ভাইয়ের অনুপ্রেরণার আমি এতদূর আসতে পেরেছি।’
‘সোনার’ মেয়েকে নিয়ে নিশ্চয়ই এখন গর্ব করছেন মা।
