মোদি-শাহ যেখানে জনসভা করেছিলেন, সেখানেই হার!

আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৯:০৩ এএম

ভারতের ঝাড়খণ্ডের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল সম্পর্কে বলা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ যে সব জায়গায় জনসভা করেছিলেন, তার বেশির ভাগ এলাকাতেই তাদের দল বিজেপি হেরেছে।

আনন্দবাজার পত্রিকা জানায়, ঝাড়খণ্ডের পাঁচ দফার ভোটে মোট নয়বার প্রচারণায় এসেছিলেন মোদি। রাজ্য জুড়ে তার বিশাল বিশাল প্রচারণা উপকরণ। মোদির মতোই নয়বার প্রচারণায় আসেন বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ।

রাঁচিতে বসে বিজেপি নেতারা দাবি করেছিলেন, মোদি-ম্যাজিকে ভর করেই ফের ক্ষমতায় আসবেন তারা। যেমনটা হয়েছে কয়েক মাস আগের লোকসভা নির্বাচনে। ১৪টি লোকসভা আসনের ১১টিতেই জেতে বিজেপি। একটিতে তৎকালীন জোটসঙ্গী আজসু। বিজেপি নেতারা মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে বলেছিলেন, ‘‘আব কি বার, ৬৫ পার।’’

কিন্তু সোমবার ফল প্রকাশের পরে দেখা গেল, ৮১ আসনের মধ্যে বিজেপির ঝুলিতে এসেছে ২৫টি। যা আগেরবারের চেয়ে ১২টি কম। বিজেপি ছেড়ে নির্দলীয় হিসেবে দাঁড়ানো সরযূ রাইয়ের কাছে হেরেছেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী রঘুবর দাস। অন্য দিকে, ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা (জেএমএম) জোট পেয়েছে ৪৭টি আসন। তার মধ্যে হেমন্ত সোরেনের দল একাই ৩০টি। কংগ্রেসের আসন ১৬, আরজেডির ১।

ভোটের হাওয়া স্পষ্ট হওয়ার পরে সাংবাদিকের কাছে হার স্বীকার করে নেন রঘুবর। বলেন, ‘‘এটা আমার হার, বিজেপির নয়।’’ কিন্তু রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা মনে করছেন, রাজ্য জুড়ে রঘুবরের ভাবমূর্তি ধাক্কা খেয়েছে বুঝতে পেরে ভোটের সব দায়দায়িত্বই কার্যত নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলেন বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতারা।

মোদি-শাহ দুজনেই প্রচার করেছেন কাশ্মীরে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলোপ, রামমন্দির নির্মাণ, তিন তালাক রদ, সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) চালু করার সাফল্য-গাথা। কিন্তু ভোটের ফল বলছে, সেই প্রচারকে অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছে হেমন্তের ‘জল-জঙ্গল-জমি’-র অধিকারের লড়াই। আদিবাসী-ওবিসি-সহ অন্যেরাও ভোট দিয়েছেন নিজের অপ্রাপ্তির হিসেব কষেই। তাই রাজ্যের ২৬ শতাংশ আদিবাসী ভোট ছাপিয়ে জেএমএম জোটের প্রাপ্ত ভোট প্রায় ৩৭ শতাংশ। বিজেপির একটি সূত্র জানায়, মোদী-শাহ যে-সব জায়গায় জনসভা করেছিলেন, তার বেশির ভাগ এলাকাতেই দল হেরেছে।

সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধেও ঝাড়খণ্ডবাসী ভোট দিয়েছেন বলে পর্যবেক্ষকদের অভিমত। এই বিল পাশ হওয়ার পরে দু’দফায় ১৮টি আসনে ভোট হয়েছিল রাজ্যে। রাত পর্যন্ত পাওয়া হিসেবে এর মধ্যে ১২টিতেই ভরাডুবি হয় বিজেপির। অন্যদিকে সাঁওতাল পরগনায় প্রচারে গিয়ে হেমন্ত স্পষ্ট বলে এসেছিলেন, জেএমএম জিতলে ঝাড়খণ্ডে সিএএ বা এনআরসি কিছুই হবে না।

গত পাঁচ বছরে আদিবাসীদের অবস্থা আরও খারাপ হওয়ার জন্য সবাই দায়ী করেছেন রঘুবর-সরকারের নীতিকেই। আদিবাসীদের ক্ষোভের আগুনে আরও ঘি ঢেলেছে জমি-নীতি। আদিবাসীদের জমি বৃহৎ পুঁজিপতিদের হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়টিকে মেনে নিতে পারেননি বিজেপির একাংশও। বিজেপির সঙ্গ ছেড়ে ভোটে লড়েছে কুর্মি সম্প্রদায়ের দল অল ঝাড়খণ্ড স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (আজসু)।

‘আদিবাসী বিরোধী’ বিশেষণ দিয়ে ভোটের আগে রঘুবরের একটি ভিডিও ‘ভাইরাল’ হয়। সেখানে মুখ্যমন্ত্রীকে বলতে শোনা যায়, ‘হাম আদিবাসী-মুক্ত ঝাড়খণ্ড বনায়েঙ্গে।’ অবশ্য পরে তিনি বলেন, ‘প্লাস্টিক-মুক্ত ঝাড়খণ্ড’ বানানোর কথা বলতে গিয়ে আদিবাসী শব্দটি হঠাৎ-ই বেরিয়ে গেছে।

এই অবস্থায় বিজেপির শেষ ভরসা ছিল দু’টি। আদিবাসী এলাকায় আরএসএস-এর সংগঠন এবং তাদের জনসেবামূলক প্রকল্প। আর মোদি-ম্যাজিক। কিন্তু কাজে আসেনি কিছুই।

এ দিকে হেমন্ত সোরেনকে অভিনন্দন জানিয়ে করা টুইটে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “সিএএ-এনআরসি নিয়ে প্রতিবাদের মধ্যেই এই ভোট হয়েছে। এই রায় নাগরিকদের পক্ষে।” জবাবে হেমন্ত বলেন, “এটা ছিল গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতা এবং সামাজিক ভাবে সকলকে নিয়ে চলার লড়াই।” টুইটে জেএমএম জোটকে অভিনন্দন জানিয়েছেন মোদিও। পাশাপাশি অনেক বছর ধরে বিজেপিকে সেবা করার সুযোগ দেওয়ার জন্য ঝাড়খণ্ডবাসীকে ধন্যবাদ দেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত