বছরের সঙ্গে এবার দশকটাও বিদায় নিচ্ছে। হিসাবের খাতায় ঘটনার সংখ্যা তাই বেশিই হওয়ার কথা। দশককে পাশে সরিয়ে হিসাবটা বছরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে চাই আমরা। প্রসঙ্গ ক্রিকেট। আরও সুনির্দিষ্টভাবে বললে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট। অবধারিতভাবেই বাংলাদেশের সাফল্য-ব্যর্থতার কথা আসবে, তবে এই পর্বে নয়। অন্য বিশেষ পর্বে। এ লেখা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বছরের সেরা ঘটনা নিয়ে সাজানো হলো-
ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ
ক্রিকেটের ধাত্রীভূমি ইংল্যান্ড, যারা কোনোদিন বিশ্বকাপ জেতেনি- এমনটাই লেখা হতো ২০১৮ সাল পর্যন্ত। এ বছর আর তা লেখার সুযোগ নেই। লর্ডসে এবার বিশ্বকাপ জিতেছে ইংলিশরা। এমনভাবে জিতেছে যে মহাকাব্যিক ফাইনালের গায়ে কলঙ্কের দাগও লেগেছে। কীভাবে লাগল সেই গল্পটাই শুরু করা যাক।
অনেকের মতেই ওয়ানডে ইতিহাসের সেরা ম্যাচ ছিল এবারের বিশ্বকাপ ফাইনাল। টুর্নামেন্ট শুরু হয়েছিল জুনে। ইংল্যান্ডের সামারে। কী বৃষ্টি! অনেক ম্যাচ পরিত্যক্ত হলো। কিছু হলো সংক্ষিপ্ত। আর ভারত-নিউজিল্যান্ড সেমিফাইনাল হলো দু’দিন ধরে। ভারতকে বিদায় করে ফাইনাল খেলেছিল নিউজিল্যান্ড। স্বাগতিক ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ ফাইনালে উঠেছিল অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে। ১৪ জুলাই লর্ডসে ফাইনাল। কিউই অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসন টস জিতে আগে ব্যাটিং নিয়েছিলেন। ওপেনার হেনরি নিকোলসের ৫৫ আর টম লাথামের ৪৭ রানে ভর করে নিউজিল্যান্ড ৮ উইকেটে ২৪১ রান তুলেছিল। এই স্কোর দেখে অনেকেই ভেবেছিলেন সহজেই জিতবে ইংল্যান্ড।
বাস্তবে বিশ্বকাপের ফাইনাল এতটাই কঠিন হয়েছিল যে, ক্রিকেটের ইতিহাসে অমর হয়ে রইল। বেন স্টোকসের অপরাজিত ৮৪ আর জশ বাটলারের ৫৯ রানে ইংল্যান্ডও থেমেছিল ২৪১ রানে। অর্থাৎ ‘টাই’। কিন্তু এই ‘টাই’ হওয়ার পেছনে আসল কারণ ছিল শেষ ওভারের চতুর্থ বলে ঘটা সেই মহাবিতর্কিত ওভার থ্রো। মার্টিন গাপটিলের ওভারথ্রো থেকে ৬ রান না পেলে হয়তো নিউজিল্যান্ড জিতত বিশ্বকাপ। গাপটিল থ্রোটা ঠিক জায়গাতেই করেছিলেন। কিন্তু বেন স্টোকসের ব্যাটে লেগে তা বাউন্ডারি পেরিয়ে গেল। যেখানে ২ রান হওয়ার কথা সেখানে ইংল্যান্ড অতিরিক্ত বাউন্ডারিসহ পেয়ে যায় ৬। আইসিসির নিয়ম মানলেও ৫ রান হওয়ার কথা। কারণ, ফিল্ডার যখন স্ট্রাইকিং এন্ডে বল ছোড়েন তখন মাত্র ১ রান হয়েছে। ভাগ্যের সাহায্য পাওয়ায় ম্যাচ ‘টাই’।
অবিশ্বাস্যভাবে সুপার ওভারও টাই। শেষে বাউন্ডারির সংখ্যা গণনার মতো বিতর্কিত নিয়মে চ্যাম্পিয়ন স্বাগতিক ইংল্যান্ড। অনেকেই বলেছিলেন আইসিসির উচিত ছিল দুই দলকে যৌথ চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা। ফাইনালে আম্পায়ারিংয়ের সমালোচনা করে ইতিহাসের অন্যতম সেরা আম্পায়ার সাইমন টওফেল বলেছিলেন- ‘ছয় রান নয়, পাঁচ রান পাওয়া উচিত ছিল ইংল্যান্ডের। আমি অন্যের দোষ নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী নই। তবে আশা করি এমন ভুল যেন আর না হয়।’
নিতান্ত ভাগ্যের ছলনায় ফাইনাল হেরে উইলিয়ামসন বলেছিলেন, ‘ব্যাপারটা লজ্জার। তাই না? বিশেষ করে ম্যাচের ওই সময়ে। ম্যাচ নিয়ে বলতে পারি, একটা রানে হার তো নয়। ম্যাচে অনেক মুহূর্ত আছে যেখানে দু’দলের মধ্যে কোনো তফাতই ছিল না। জিততে পারত যেকেউ। হয়তো এটা আমাদের দিন ছিল না। নয়তো এত কাছে এসে এভাবে আটকে যেতে হয়!’
লর্ডসের সেই ফাইনাল এখন ইতিহাস। এমন এক ইতিহাস যার তুলনা এক দিনের ক্রিকেটে নেই।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ভারতের টেস্ট সিরিজ জয়
এই ঐতিহাসিক ঘটনা শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালের শেষে। অ্যাডিলেডে প্রথম টেস্ট জিতে অস্ট্রেলিয়া সফর শুরু করে বিরাট কোহলির ভারত। ৪ টেস্টের সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট ছিল পার্থে। বল ট্যাম্পারিংয়ে জড়িয়ে নিষিদ্ধ ডেভিড ওয়ার্নার-স্টিভেন স্মিথ নেই অস্ট্রেলিয়া দলে। তবুও জয় পায় অস্ট্রেলিয়া। সমতা সিরিজে।
অ্যাডিলেডের তৃতীয় টেস্টে আবার জয় পায় ভারত। নতুন বছরের শুরুতে হয়েছিল সিডনি টেস্ট। ভারত এমন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে ছিল যে কেবল ড্র করলেই ইতিহাস হবে। এমন প্রেক্ষাপটে সিডনি টেস্ট ড্র হয়েছিল। বিরাট কোহলির দল অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট সিরিজ জিতেছিল ২-১-এ। কেবল ভারতীয় ক্রিকেট নয় উপমহাদেশের জন্যও সেই জয় ছিল বিরল। কারণ শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান তো বটেই, ভারতও এর আগে কোনোদিন অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট সিরিজ জয়ের সাহস দেখাতে পারেনি।
বছরের শুরুতে পাওয়া সাফল্যের ধারাবাহিকতা টেস্টে ধরে রেখেছেন বিরাট কোহলিরা। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশ হিসাবে উইন্ডিজ সফরে গিয়ে দুই টেস্টের সিরিজ ২-০তে জিতেছে তারা। এরপর ঘরের মাঠে দক্ষিণ আফ্রিকা (৩-০) এবং বাংলাদেশকে (২-০) হোয়াইটওয়াশ করেছে।
বেন স্টোকসের অলৌকিক ইনিংস
লর্ডসে বিশ্বকাপ ফাইনালে অসাধারণ ইনিংসের রেশ কাটতে না কাটতেই হেডিংলিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অপরাজিত ১৩৫ রানের মহাকাব্যিক টেস্ট ইনিংস খেলেন বেন স্টোকস। তার সেই ইনিংসের কারণেই শেষ টেস্ট জিতে পাঁচ টেস্টের অ্যাশেজ ড্র করতে পেরেছিল ইংল্যান্ড।
মেঘাচ্ছন্ন হেডিংলিতে প্রথম ইনিংসে মাত্র ১৭৯ রানে গুটিয়ে যায় অস্ট্রেলিয়া। অথচ একপর্যায়ে তাদের রান ছিল ২ উইকেটে ১৩৬। এখান থেকে জোফরা আর্চারের ঝড়ের মুখে ভেঙে পড়েন অজিরা। আর্চার ৪৫ রানে ৬ উইকেট নিয়েছিলেন। প্রথম ইনিংসে ইংল্যান্ডের অবস্থা ছিল আরও করুণ। জশ হ্যাজেলউড (৫/৩০) আর প্যাট কামিন্সের (৩/২৩) আগুনে মাত্র ৬৭ রানে ভস্ম হয় ইংল্যান্ড।
এরপর মারনাস লাবুশেনের ৮০ রানের ওপর ভর করে স্বাগতিকদের সামনে ৩৫৯ রানের টার্গেট দিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। পঞ্চম দিনে জয়ের জন্য ইংল্যান্ডের দরকার ২০৩ রান। হাতে ৭ উইকেট। ৭৭ রান করে অধিনাযক জো রুট কপালে চিন্তার ভাঁজ তুলে বিদায় নেন। কিন্তু বেন স্টোকস দাঁড়িয়ে যান। ৪ উইকেটে ২৪৫ থেকে ইংল্যান্ডের স্কোর ৯ উইকেটে ২৮৯ হলেও ক্রিজে ছিলেন বাঁহাতি স্টোকস। নবম উইকেট পতনের পরও চাই ৭৩ রান।
জ্যাক লিচকে নিয়ে আক্রমণ শুরু করলেন স্টোকস। লায়ন, কামিন্স, হ্যাজেলউডদের তিন ওভারে নিলেন ১৩, ১১ আর ১৯। জয়ের জন্য ইংল্যান্ডের যখন ১৭ রান দরকার, কামিন্সের বলে ডিপ ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে ক্যাচ দিলেন স্টোকস। মারকাস হ্যারিস ধরতে পারলেন না। পরের ২ বলে বাউন্ডারি।
নাটকের তখনো বাকি। পরের ওভারে এলবিডব্লিউ আবেদনে রিভিউ নিলেন অধিনায়ক টিম পেইন। আউট তো হলোই না উল্টে অস্ট্রেলিয়ার একমাত্র রিভিউটিও শেষ। এর প্রভাব পড়ল পরে। বল করতে এলেন লায়ন। স্ট্রাইকে স্টোকস। এলবিডব্লিউর জোরালো আবেদন। আম্পায়ার জোয়েল উইলসন সারা দিলেন না। টিভি রিপ্লে দেখে বোঝা গেল আউট ছিলেন স্টোকস। কিন্তু রিভিউ নেই অস্ট্রেলিয়ার।
এরপর জ্যাক লিচের রান আউট মিস করে জেতার শেষ সুযোগও হাতছাড়া করলেন লায়ন। সিঙ্গেল নিয়ে স্কোর সমান করেন লিচ। পরের বলে শট কাভার দিয়ে বাউন্ডারি মেরে টেস্ট জিতে নেন স্টোকস।
নিজের কাছেই অবিশ্বাস্য লাগছিল স্টোকসের, ‘সহজাত মানসিকতা নিয়ে ব্যাট করে গিয়েছি। শেষ পর্যন্ত লড়াই করেছি। মাঠ ছাড়িনি। সর্বোচ্চ পর্যায়ে চ্যালেঞ্জটা নিয়েছি। সেটা যেভাবে শেষ হয়েছে, তার চেয়ে ভালো আর কিছু হতে পারে না। আসলে আজকের দিনটা সত্যিই অবিশ্বাস্য। আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না। সারা দিন এভাবে রান করে যেতে হলেও আমি তৈরি ছিলাম।’
কনকাশন
বিদায়ী বছরের ক্রিকেট ‘কনকাশন’-এর জন্যও মনে রাখবে সবাই। জোফরা আর্চারের বলে লর্ডস টেস্টে ঘাড়ে আঘাত পেয়েছিলেন স্টিভেন স্মিথ। আইসিসির অনুমতি নিয়ে প্রথমবারের মতো পরিবর্তিত খেলোয়াড় (মারনাস লাবুশেন) নামায় অস্ট্রেলিয়া। পরের টেস্টে বিশ্রাম নিতে হয় স্মিথকে। ইডেনে দিবারাত্রির টেস্টে কনকাশনের শিকার হয়েছিলেন বাংলাদেশের লিটন দাস ও নাঈম হাসান।
টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ
এ বছরই ভারতের উইন্ডিজ সফর দিয়ে শুরু হয়েছে দুই বছরের টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ। তিন সিরিজ জিতে শীর্ষে ভারত (৭ ম্যাচে ৩৬০ পয়েন্ট)। ৮ ম্যাচ থেকে অস্ট্রেলিয়া ২১৬ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে। আজ থেকে শুরু মেলবোর্ন টেস্টে নিউজিল্যান্ডকে হারালে তাদের সংগ্রহে ঋদ্ধ হবে আরও ৪০ পয়েন্ট।
অন্যান্য
২০১৯ সালকে ভারতীয় বোলারদের হ্যাটট্রিকের বছরও বলা যায়। ক্রিকেটের তিন সংস্করণ মিলিয়ে হ্যাটট্রিক করেছেন ৪ ভারতীয়- মোহাম্মদ শামি, জাসপ্রিত বুমরাহ, দীপক চাহার ও কুলদীপ যাদব। ২২ জুন সাউদাম্পটনে আফগানিস্তানের বিপক্ষে বিশ্বকাপের ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেছিলেন শামি। ৩১ আগস্ট উইন্ডিজের বিপক্ষে জ্যামাইকা টেস্টে বুমরাহ। ১০ নভেম্বর বাংলাদেশের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টিতে দীপক চাহার। এছাড়া ওয়ানডে সিরিজে উইন্ডিজের বিপক্ষে বিশাখাপত্তমে ১৮ ডিসেম্বর সর্বশেষ হ্যাটট্রিকটি করেন চায়নাম্যান বোলার কুলদীপ।
ছোট দলের বড় রেকর্ড
বিশ্বরেকর্ড গড়ে নজর কেড়েছিল চেক রিপাবলিক। রোমানিয়ার রাজধানী বুখারেস্টে প্রথমে ব্যাট করে নির্ধারিত ২০ ওভারে ২৭৮ রান করেছিল চেকরা। জবাবে মাত্র ২১ রানে অলআউট হয়ে ২৫৭ রানের বিশাল ব্যবধানে হেরে লজ্জার রেকর্ড গড়েছিল তুর্কিরা। টি-টোয়েন্টিতে বেশি রান তোলার রেকর্ডের সঙ্গে বড় ব্যবধানে জেতার রেকর্ড গড়ে হঠাৎ আলোচিত হয়ে ওঠে চেকরা।
পাকিস্তানে টেস্ট ক্রিকেট
এই ঘটনা বছরের শেষটাকে আলোকিত করে। ১০ বছরেরও বেশি সময় পর নিজেদের মাটিতে টেস্ট ক্রিকেট খেলার স্বাদ পায় পাকিস্তান। ২০০৯ সালের ৩ মার্চ লাহোরে শ্রীলঙ্কার টেস্ট দলের ওপর সন্ত্রাসী হামলার পর কোনো দল টেস্ট খেলতে আর পাকিস্তানে যায়নি। সেই শ্রীলঙ্কাই সফর করে পাকিস্তান। করাচিতে তাদেরকে হারিয়ে ১৩ বছরেরও বেশি সময় পর নিজেদের মাটিতে টেস্ট জয়ের স্বাদ পায় পাকিস্তান।
