জীবিকার তাগিদে দক্ষিণ আফ্রিকা গিয়ে পোড়া লাশ হয়ে ফিরলেন কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার শাকিল মিয়া। পরিবারের সচ্ছলতা আনতে দুই বছর আগে ভিনদেশে পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি।
রবিবার ভোরে উপজেলার গৌরীপুর ইউনিয়নের পেন্নাই গ্রামে তার মরদেহ পৌঁছে।
শাকিলের বিকৃত মরদেহ দেখে রিকশা চালক বাবা হোসেন মিয়া, মা সামসুন নাহার ও স্ত্রী শান্তা বেগম নিজেদের ধরে রাখতে পারেননি। তাদের আহাজারিতে এলাকার আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠে।
বেলা ১১টায় পেন্নাই ঈদগাঁ মাঠে জানাজা শেষে দাফন সম্পন্ন করা হয়।
স্বজনরা জানান, দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গের নিকটবর্তী পামব্রিজ (কেতলেহং) এলাকায় গত সোমবার (২০ জানুয়ারি) আসরের নামাজের পর একদল সন্ত্রাসী শাকিলের দোকানে ঢোকে লুটপাট চালায়। প্রতিবাদ করলে তাকে বেধড়ক মারধর করে শাকিলকে ভেতরে রেখেই পেট্রল ঢেলে দোকানঘরটিতে আগুন ধরিয়ে হামলাকারীরা চলে যায়।
পরে স্থানীয় লোকজন শাকিলকে গুরুতর অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন।

বুধবার রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শাকিলের মৃত্যু হয়। রবিবার ভোরে শাকিলের লাশ পেন্নাই গ্রামে পৌঁছালে গোটা বাড়িই শোকে স্তব্ধ দেখা যায়। দেড় বছরের মেয়ে সিনথিয়াকে কোলে নিয়ে শাকিলের স্ত্রী শান্তা আক্তার বিলাপ করছেন। বাবা হোসেন মিয়া কাঁদতে কাঁদতে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। মা সামছুন নাহার, একমাত্র বোন লিপি আক্তার অঝোরে কাঁদছেন।
শান্তা আক্তারের প্রশ্ন, কে দেখবে তার একমাত্র মেয়েকে? দেশে থাকতে বিআরটিসি বাসের সুপারভাইজার হিসেবে চাকরি করে যা পেতেন, তা দিয়েই সংসার চলত। এরপর শান্তা একটু থামেন। আবার কান্নায় ভেঙে পড়েন। স্বজনেরা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
শাকিলের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, তাদের কোনো জায়গাজমি নেই। পারিবারিক আয় ও স্বজনদের দয়ায় ৭ লাখ টাকায় দুই বছর আগে শাকিল দক্ষিণ আফ্রিকা যান। সেখানে পৌঁছার পর দোকান কেনার জন্য সুদ আর বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা থেকে ঋণ তুলে আরও ৯ লাখ টাকা আবার পাঠাতে হয়।
হোসেন মিয়ার চার সন্তানের মধ্যে শাকিল সবার ছোট। শাকিলের বড় ভাই সোহেল মালয়েশিয়ায় এবং মেজো ভাই শরীফ মিয়া দক্ষিণ আফ্রিকা গিয়ে, খেয়ে না-খেয়ে কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। মা-বাবা আর স্ত্রী ভেবেছিলেন বিদেশে ব্যবসা করে শাকিল তাদের অভাব–অনটন দূর করবেন।
শাকিলের বাবা হোসেন মিয়া বলেন, রিকশা চালিয়ে ছেলেমেয়েদের বড় করেছি। এখন আর রিকশা চালাতে পারি না, ‘যখন যে কাজ পাই, সে কাজ করি। তার ওপরে ঋণের বোঝা। কী করব বুঝতে পারছি না!’
শাকিলের স্ত্রী শান্তা আক্তার বলেন, মৃত্যুর এক ঘণ্টা আগে তার সঙ্গে ফোনে কথা হয় শাকিলের। তিনি বলেছিলেন, তার ব্যবসা করতে খুবই ভয় লাগে। ঋণ শোধ হয়ে গেলে দেশে ফিরে আসবেন। আবার বাসের সুপারভাইজারের চাকরিতে যোগ দেবেন। ফিরে আসছেন ঠিকই, কিন্তু পোড়া লাশ হয়ে।
