মটু-পাতলু ভালোবাসত দিলু রোডের আগুনে নিহত রুশদী

আপডেট : ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১০:১৮ পিএম

‘রুশদী নানু বাসায় থাকে। সেদিন যখন ওকে নিয়ে আসব দেখি ও বই পড়ছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম কী পড়ছ মা? ‘নটু পানতু’ (মটু-পাতলু) তারপর আমাকে গল্প শুনিয়েছে। ‘এনে ওই নটু এলিয়েন আছে! দেখছাও (দেখেছ)। ‘নটু-পানতু কালার করছে আমি মুছেছি তো’।

পরদিন আমি খুশি হয়ে আসার সময় বইটা নিয়ে আসতে চাইলাম কিন্তু সে আনবে না। ওর একটাই কথা, ‘নানু বাসায় পড়বে তো!’

আদরের একমাত্র চার বছরের ছেলেকে একেএম রুশদীর বই পড়ার আগ্রহ দেখে ফেসবুকে এই স্ট্যাস্টাস দিয়েছিলেন বেক্সিমকো ফার্মার হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস জান্নাত।

বৃহস্পতিবার ভোরে মগবাজারের দিলু রোডের ৪৫/এ বাড়ির নিচ তলায় আগুন লাগার পর তিন তলার বাসা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামার চেষ্টাকালে মায়ের কোল থেকে দাউ দাউ আগুনে পুড়ে মারা যায় ছেলে রুশদী। আগুনে ঝাঁপ দিয়ে ছেলেকে বাঁচাতে দিয়ে শ্বাসনালিসহ ৯৫ শতাংশ পুড়েছে মা জান্নাতের শরীরও।

ছেলে ও স্ত্রীকে বাঁচাতে আগুনে ঝাঁপ দিয়ে বাবা শহিদুল কিরমানী রনিরও শ্বাসনালিসহ শরীরের ৪৫ শতাংশ পুড়েছে। তার অবস্থাও আশঙ্কাজনক। একমাত্র ছেলের মৃত্যুর পর মা-বাবাও এখন জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে।

জান্নাত দৈনিক কালের কণ্ঠ পত্রিকার প্রোডাকশন ম্যানেজার একেএম শহীদুল্লার পুত্রবধূ ও ভিআইভিপি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের হিসাব ব্যবস্থাপক ও ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএমএবি) প্রভাষক শহিদুল কিরমানি রনির স্ত্রী।

জান্নাত-রনি দম্পতির একমাত্র ছেলে রুশদী। জান্নাত বেক্সিমকো ফার্মায় যোগ দেওয়ার আগে কাজ করতেন সিমেন্ট কোম্পানি হোল সিমে।ইনস্টিটিউটের চিকিৎসকরা জানান, আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে রুশদী। তাকে চেনার কোনো উপায় নেই।

এই বছরই রুশদী স্কুলে প্লেগ্রুপে ভর্তি করা হয়েছে। সর্বনাশা আগুন তাকে বাঁচতে দেয়নি।

জান্নাতের চাচাতো বোন উমরুল ফুরাত দেশ রূপান্তরকে জানান, সকালে খবর শুনেই তিনি কলাবাগানের বাসা থেকে হাসপাতালে এসেছেন।

তিনি বলেন, ‘যত দূর শুনেছি, ভোরে দিলু রোডে ওই বাসার গ্যারেজে থাকা গাড়িতে আগুন লাগার পর টায়ার বিস্ফোরণের বিকট শব্দে দুজনের ঘুম ভাঙে। গ্যারেজে গাড়ি ছিল ৫টি। আগুন লেগেছে বুঝতে পেরে মা তার ছেলেকে কোলে নিয়ে ৩য় তলার বাসা থেকে বের হয়। তার সঙ্গে সঙ্গে রনিও ছিল। সিঁড়ি দিয়ে নিচের দিকে নামার সময় আরেকটি বিস্ফোরণ হয়। তখনই কোল থেকে পড়ে যায় রুশদী। সিঁড়িতে পড়ে গড়িয়ে নিচের দিকে পড়ে যাচ্ছিল রুশদী। তাকে বাঁচাতেই দুজনে আগুনে ঝাঁপ দেয়। আগুনের কালো ধোঁয়ায় তারা চেতনা হারিয়ে জ্ঞান হারায়। জ্ঞান ফিরে আসার পর শরীরে আগুন নিয়েই বাইরে বের হয়। আর নিচে পুড়ে কয়লা হয়ে যায় রুশদী।’

জান্নাতের চাচাতো ভাই আবু জায়েদ ইবনে হক বলেন, তৃতীয় তলায় তারা দুটি রুম নিয়ে থাকত। আগুন লাগার পর অন্য ভাড়াটিয়ারা সিঁড়ি দিয়ে ছাদের দিকে উঠতে থাকে। তবে রুশদীর মা-বাবা ঘুমের ঘোরে তাৎক্ষণিক বুঝতে না পেরে সিঁড়ি দিয়ে নিচের দিকে নামার চেষ্টা করে। ভেবেছিল নিচের গেট দিয়েই বেরিয়ে যেতে পারবে। তারা যদি বেড রুমেই থাকত, তাহলেও হয়তো কোনো ক্ষতি হতো না। আগুনে শুধু তাদের বাসার শুধু ড্রয়িং রুম পুড়ছে। দুটি বেডরুম অক্ষত আছে।

তিনি জানান, শহিদুলকে ছেলের মৃত্যুর খবর দেওয়া হয়েছে। তার মাকে বিষয়টি জানানো হয়নি। বললেও কী হবে জানি না। জানি না কী হয়।

শহীদুলের গ্রামের বাড়ি নরসিংদী জেলার শীবপুর উপজেলার ইটনা গ্রামে। একেএম শহীদুল্লাহ বৃহস্পতিবার গিয়েছিলেন হাসপাতালে। বিপুলসংখ্যক আত্মীয়স্বজনও ছিলেন সেখানে। রাত ৮টায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত নিহত রুশদীর লাশ কেউ গ্রহণ করেনি। লাশ গর্গেটর মরচুয়ারিতে রাখা হয়েছে।

শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট এর সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, শহিদুলের শরীরের ৪৩ শতাংশ ও জান্নাতুলের শরীরের ৯৫ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। তাদের শ্বাসনালিও পুড়ে গেছে। দুজনই জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। এই অবস্থা থেকে রিকভারি করা সম্ভাবনা খুব কম থাকে। তবুও আমরা আমাদের সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাব। তাদের আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে।

৪৫/এ, দিলু রোডের পাঁচতলা ওই বাড়িতে বৃহস্পতিবার ভোরে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে লাগা আগুনে শিশু রুশদীসহ তিনজন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন আফরেন জাহান যুথি ভিকারুন নিসা নুন স্কুলের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ও আব্দুল কাদের ভবনের দ্বিতীয় তলায় থাকা একটি বায়িং হাউসের অফিস সহকারী। আগুনে রুশদীর মা-বাবা ছাড়াও আরও দুজন সামান্য দগ্ধ ও লাফিয়ে পড়ে একজন গুরুতরও আহত হয়েছেন। আগুন লাগার সময় ভবনটি প্রায় অর্ধশত বাসিন্দা ছিলেন। তারা সবাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভবন থেকে বেরিয়ে আসেন। কিছু লোকজনকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা উদ্ধার করে। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত