ভারতের দ্বিতীয় বিশ্বকাপে শচিনের স্বপ্নপূরণ

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২০, ০১:১১ এএম

এর চেয়ে জীবন্ত ফাইনাল নিশ্চয়ই আরও আছে। কিন্তু বিশ্বকাপ জয়ের গণঅভিব্যক্তি প্রকাশের এমন নজির দ্বিতীয়টি আছে বলে মনে হয় না। ১৩০ কোটি মানুষ সেদিন আনন্দে নেচে উঠেছিল। ২০১১ সালের ২ এপ্রিল দ্বিতীয় ওয়ানডে বিশ্বকাপ জিতেছিল ভারত। মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে থেকে আলোর রোশনাই ছড়িয়ে পড়েছিল কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত।

আর রচিত হয়েছিল এমন কিছু ইতিহাস, যা অমর হয়ে আছে। বহুকাল থাকবেও। অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনির ছক্কা, গৌতম গম্ভীরের ইস্পাতকঠিন ৯৭ আর মাহেলা জয়াবর্ধনের অপরাজিত ১০৩। প্রখ্যাত ক্রিকেট সাংবাদিক অ্যান্ড্রু মিলার ৮৮ বলের সেই ইনিংসকে ‘পোয়েটিক’ বর্ণনা করেছিলেন। পতাকা হাতে সতীর্থদের কাঁধে কাঁধে শচিনের মাঠ পরিক্রমার দৃশ্যটাকে বলেছিলেন, ‘গৌরবের জীবন্ত প্রকাশ।’ গত দুই দশকের সেরা স্পোর্টিং মোমেন্ট বিবেচিত হয়েছে লরিয়াসের বিচারে।

স্বপ্নপূরণের পর আর শচিন টেন্ডুলকার সেদিন বলেছিলেন, ‘যেকোনো খেলোয়াড়ের জীবনে বিশ্বকাপ সর্বোচ্চ প্রাপ্তি। এই বিষয়ে সংশয়ের অবকাশ নেই। এই কারণে আমি বলি, আমার ক্রিকেটজীবনে দুটি অধ্যায়। একটা ২০০৭ পর্যন্ত। অন্যটা শুরু হয়েছিল ঠিক ২০০৭ বিশ্বকাপে হারের পর থেকে। চার বছর ধরে আমি পরিশ্রম করেছিলাম ২০১১ বিশ্বকাপ জেতার লক্ষ্য নিয়ে। (২০০৭-এ) উইন্ডিজ থেকে দেশে ফিরেই আমি ট্রেনিং শুরু করে দিয়েছিলাম। কারণ, মাথায় ঘুরত একটাই জিনিস একবার বিশ্বকাপ জিততেই হবে।’ স্বপ্নপূরণের দিনে শচিনকে নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি বিরাট কোহলি কাঁধে তুলে নেন। কেন নিয়েছিলেন সেই প্রশ্নের উত্তরে কোহলির মন্তব্যটা অমর হয়ে আছে, ‘২২ বছর একটা জাতির প্রত্যাশার ভার তিনি নিজের কাঁধে বহন করেছেন। তাকে কাঁধে নেওয়ার এটাই সময়।’

লিটল মাস্টারের শেষ বিশ্বকাপ ছিল সেটা। ২০০৭-এর মিশন চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়। পোর্ট অব স্পেনে বাংলাদেশের কাছে হেরেছিল ভারত। সেই হার নকআউটের আগে তাদের বিদায় নিশ্চিত করে দেয়। ‘বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। ক্রিকেটই ছেড়ে দিতে চেয়েছিলাম। প্রায় অবসরই নিয়ে নিচ্ছিলাম। মনে হয়েছিল, আর আমি প্রিয় খেলাটাই উপভোগ করতে পারব না। সেই সময় এক দিন স্যার ভিভিয়ান রিচার্ডস ফোন করে চল্লিশ মিনিট ধরে আমাকে বোঝালেন। বললেন তোমার মধ্যে অনেক ক্রিকেট বাকি আছে এখনো। ছাড়বে কেন? দাদা অজিত বোঝাল। এই সব মানুষ আমাকে ফের শক্তি জোগাতে থাকল। তাতেই আমার মনে পরিবর্তন হলো। আমি নতুন করে শপথ নিই ২০১১ বিশ্বকাপ জিততেই হবে। তার জন্য যা যা করার দরকার, করব। ভোর সাড়ে ৫টায় উঠে আমি মাঠে যেতাম ট্রেনিং করতে। যাতে কেউ আসার আগেই আমার কাজটা নিঃশব্দে সেরে ফেলা যায়। কতদিন হয়েছে, আমি বেরিয়ে আসার সময় গ্রাউন্ডসম্যানদের সঙ্গে দেখা হয়েছে। তারা তখন মাঠে ঢুকছেন। কিছুদিন পর থেকেই আমি আবার সব কিছু উপভোগ করা শুরু করলাম। জীবনে কোনো কিছু করতে গেলে একটা কারণ দরকার হয়। আমার ক্রিকেট খেলার কারণটা হারিয়ে যেতে বসেছিল ২০০৭ বিশ্বকাপে হেরে গিয়ে। সেটা আবার ফিরতে শুরু করল। ক্রমশ আমার মধ্যে গেঁথে যেতে থাকল একটা মন্ত্র ২০১১ বিশ্বকাপ জিততেই হবে’ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন শচিন।

শচিনের এই প্রতিজ্ঞা ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা ভারতীয় দলের মধ্যে। যুবরাজ সিং ২০১১ বিশ্বকাপের সময় ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন। রক্তবমি করতেন। তবু পারফরম্যান্সে ভাটা পড়েনি। ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং সব বিভাগে নিজেকে উজাড় করে দলকে টেনেছিলেন। টুর্নামেন্ট সেরাও হন। ধোনি যখন ছক্কা মেরে জয়সূচক (২৭৫) রান করেন, অন্য প্রান্তে তখন যুবরাজ। উদ্বেল আবেগে ধোনিকে জড়িয়ে ধরে কান্নার দৃশ্যটাও অমর হয়ে থাকবে। ফুসফুসে ক্যানসারে ভোগা যুবরাজ অবসরের সময় বলেছিলেন, ‘২০১১ সালে বিশ্বকাপের সেরা ক্রিকেটার হওয়া, চার ম্যাচে সেরা হওয়া ছিল আমার কাছে একটা স্বপ্নের মতো। কিন্তু সেই মধুর মুহূর্ত ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল- যখন জেনেছিলাম আমার ক্যানসার হয়েছে। তখন আমি ক্যারিয়ারের শিখরে। ব্যাপারটা সাফল্যের আকাশ ছুঁয়ে আলোর গতিতে শক্ত মাটিতে ছিটকে পড়ার মতোই। দ্রুতই এসব ঘটেছিল।’

২ এপ্রিল মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়েতে ফেবারিট হয়েই খেলতে নেমেছিল ভারত। টস জেতেন লঙ্কান অধিনায়ক কুমার সাঙ্গাকারা। আগে ব্যাটিং নেন। মাহেলা জয়াবর্ধনের কাব্যিক সেঞ্চুরিতে ৬ উইকেটে ২৭৪ করে শ্রীলঙ্কা। তাড়া করতে নেমে ভারত বিপদে পড়েছিল। শূন্যতেই ফেরে শেবাগ। এরপর লাসিথ মালিঙ্গার বাইরের বলে খোঁচা দিয়ে ১৮ রানে প্যাভিলিয়নে ফেরেন শচিন। ৩১ রানে ওপেনারদের হারিয়ে ভারতের বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন তখন মøান হওয়ার জোগাড়। এখান থেকেই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প লিখতে শুরু করেন গম্ভীর ও কোহলি। ৩৫ রানে কোহলি আউট হলে ব্যাটন তুলে নেন অধিনায়ক ধোনি। আস্তে আস্তে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের কাক্সিক্ষত মুহূর্তের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে ভারত। শেষ পর্যন্ত ১০ বল হাতে রেখে ৬ উইকেটে ফাইনাল জেতে তারা।

১৯৮৩ সালে লর্ডসের ব্যালকনিতে কপিল দেবের হাতে ছিল ভারতের প্রথম বিশ্বজয়ের ট্রফি। ২৮ বছর পর দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জেতে ভারত। ২২ বছর নিজেকে উজাড় করে ট্রফিটা তুলে ধরেন শচিন। আরও বলেন, ‘সত্যিই তো আমার বাইশ বছর লেগে গিয়েছিল বিশ্বকাপ জিততে। ক্রিকেট থেকে বিদায় নেওয়ার আগে এই ট্রফি আমি দুই হাতে ধরতে চেয়েছিলাম। সেই কারণেই আমি বলি, আমার ক্রিকেটজীবনের দ্বিতীয় যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৭ সালে। ওই বছরটা আমার জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সময়। আর ২০১১ এনে দিয়েছে সব চেয়ে আলোকিত মাহেন্দ্রক্ষণ। চার বছরে ক্রিকেট আমাকে মুদ্রার দুটি পিঠই দেখিয়ে দিয়েছিল।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত