ব্রাফেট-তাণ্ডবে এদিন স্টোকসও হয়েছিলেন ম্লান

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২০, ১১:৫৮ পিএম

নতুন শতাব্দীতে এমন ফলপ্রসূ বছর ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটে দ্বিতীয়বার আসেনি।  কখনো আসবে কি না তা নিয়েও সন্দেহ আছে। ২০১৬ সালে তিন তিনটি বিশ্বকাপ জিতেছিল উইন্ডিজ। নারীদের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সঙ্গে তারা জিতেছিল অনূর্ধ্ব-১৯ এবং পুরুষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপও।

ইডেনে ২০১৬ সালের ৩ এপ্রিল টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতেছিল ড্যারেন স্যামির দল। এমনই অনন্য ভঙ্গিমায় জিতেছিল যে, কপিল দেব- যার নেতৃত্বে ১৯৮৩ তে ভারতের কাছে ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ ফাইনাল হেরেছিল সর্বজয়ী উইন্ডিজ, তিনি ভেবে নিয়েছিলেন- সুদিন ফিরবে ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটে। যেমনটা ছিল উইন্ডিজ সেই অবস্থায় ফেরেনি, তবে দুঃসময় কটেনি বলে বিশ্বকাপ জয়ের সাফল্য তো আর মুছে যেতে পারে না। কী দুরন্ত ফাইনালটাই না খেলেছিল উইন্ডিজ। শেষ ওভারে টানা চার ছক্কা মেরে দলকে বিশ্বকাপ এনে দিয়েছিলেন কার্লোস ব্রাফেট। নতুন তারকার জন্ম হয়েছিল ইডেনে।

১৫৬ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে থাকা উইন্ডিজের শেষ ওভারে দরকার ছিল ১৯ রানের। বল হাতে নিয়েছিলেন বেন স্টোকস। ওভার শুরু করতে যাওয়ার আগে তিনি জানতেন না কী ঝড় অপেক্ষা করছে তার জন্য। প্রথম তিন বলে তিন ছক্কা মেরে স্কোর সমান করলেন অসুর শক্তির ব্রাফেট। এরপর ১৫৫ থেকে ছক্কা মেরে তুলে নিলেন জয়। এমন উদ্ধত ক্যারিবিয়ান মেজাজ ক্রিকেট মাঠে অনেক দিন দেখা যায়নি। বিধ্বস্ত স্টোকস মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছিলেন। তাকে সান্ত্বনা দিতে ছুটে এসেছিলেন ‘জীবন্ত ধ্বংসস্তূপে’ পরিণত ইংল্যান্ড অধিনায়ক ওয়েন মরগান। যখন তিনি স্টোকসের হাতে বল তুলে দিয়েছিলেন তখন ঘুণাক্ষরেও এমন পরিণতির কথা ভাবতে পারেননি। পারবেন কী করে, ডেথ ওভারে স্টোকসের চেয়ে ভালো বিকল্প সেই টুর্নামেন্টেই ছিল না। এই ইংলিশ অলরাউন্ডারকে বলা হতো ‘ডেথ ওভারের রাজা।’ পরিসংখ্যানও সেই সাক্ষ্য দেয়। স্টোকস সেই সময় ১৬-২০ ওভারে প্রায় ৫০ শতাংশ ডট বল করেছিলেন! তাই মরগান নিশ্চিন্তই ছিলেন স্টোকসের হাতে বল তুলে দিয়ে। কিন্তু স্রেফ দুই মিনিটে মরগানের আস্থা চূড়ান্ত হতাশার অন্ধকারে নিক্ষেপ করেছিলেন ব্রাফেট। প্রথম চার বলে ২৪ রান তুলে বিশ্বকাপ ছিনিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। ইডেনে ক্যারিবিয়ান ঝড় দেখার পর অধিনায়ক মরগান ছিলের বিধ্বস্ত নাবিকের মতো। সংবাদ সম্মেলনে স্টোকসকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, ‘জয়ের আনন্দ যদি সবাই ভাগাভাগি করে নিতে পারি, তাহলে স্টোকসের দুঃখটাও ভাগ করে নিচ্ছি। বেনের তো কোনো দোষ দেখি না আমি। আমার মনে হয় না আমরা বোলিং-ব্যাটিং-ফিল্ডিংয়ে কোনো ভুল করেছি। আমি আমার খেলোয়াড়দের নিয়ে গর্বিত।  ক্রিকেট খেলাটাই এমন। মাঝে-মধ্যে বড্ড নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে।’

ইডেনের ফাইনাল খেলতে নামার আগে উইন্ডিজকে বলা হচ্ছিল ওয়ানম্যান টিম।  বলা বাহুল্য ক্রিগ গেইল ছাড়া কাউকে গোনায় ধরছিল না মিডিয়া। ফাইনালে সেই ভুল ভাঙেন ২০১২ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক। কলম্বোতে মারলন স্যামুয়েল খেলেছিলেন ৭৮ রানের ইনিংস। ইডেনে তার ব্যাট থেকে আসে ৮৫ রান। ম্যাচ সেরাও হয়েছিলেন। দর্শকের চোখে অবশ্য নায়ক ছিলেন ব্রাফেট। এই দুজনের জন্য অধিনায়ক হিসেবে দুটি বিশ্বকাপ জয়ের (উইন্ডিজের হয়ে অধিনায়ক হিসেবে ক্লাইভ লয়েডই কেবল দুটি বিশ্বকাপ জিতেছেন) রেকর্ড গড়ার পর ড্যারেন স্যামি বলতে পেরেছিলেন, ‘সবাই তো বলছিল আমরা নাকি একজনের দল। তা প্রথম ম্যাচে সেঞ্চুরির পর ক্রিস (গেইল) তো আর কিছু করতে পারেনি। তারপরও আমরা ঠিকই এগিয়ে গেলাম। কারণ, আমাদের মধ্যে বিশ্বাস ছিল।’

ইডেনে টস হেরে আগে ব্যাট করে নির্ধারিত ওভারে ৯ উইকেটে ১৫৫ রান করেছিল ২০১০ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ী ইংল্যান্ড। ৩৬ বলে ৫৪ রান করেছিলেন জো রুট।  ৩৬ রান করেছিলেন জশ বাটলার। জবাবে খেলতে নেমেই উইকেট হারাতে থাকে উইন্ডিজ। ১১ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে ধুঁকতে থাকা উইন্ডিজের হাল ধরেন স্যামুয়েল। এক প্রান্ত আগলে রেখে ৬৬ বলে ৮৫ রানে অপরাজিত ছিলেন তিনি।  অন্য প্রান্তে চার-ছক্কার তা-ব চালিয়ে ১০ বলে ৩৪ রান করেন অপরাজিত ছিলেন ব্রাফেট। দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতে সোনালি অতীত ফেরানোর ইঙ্গিত দিয়েছিল ক্যারিবিয়ানরা। তাই দেখে কপিল দেব লিখেছিলেন, ‘ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানরা শুধু খেলে না, বিনোদিতও করে। সব সময়ই কেমন যেন একটা অনিশ্চয়তা। খুব খারাপ অবস্থা থেকেও তারা জিতে যেতে পারে। আবার একদম জয়ের খুব কাছে এসেও ফিরে যেতে পারে খালি হাতে। কিন্তু উইন্ডিজের ক্রিকেট এখন বেশ পরিণতই মনে হচ্ছে। পাইপলাইনে আছে তরুণ প্রতিভাবান ক্রিকেটারের যথেষ্ট জোগান। এটাই তাদের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিচ্ছে। আবার বিশ্ব ক্রিকেট শাসন করতে তৈরি ক্যারিবিয়ানরা।’

কপিল দেবের কথা এখনো সত্যি হয়নি। প্রতিভার জোগান এখনো অফুরান উইন্ডিজে। কিন্তু তারা বিচ্ছিন্ন দ্বীপমালার মতো নিজেরা বিচ্ছিন্ন তারকা হয়েছেন।  দল হয়ে উঠতে পারেননি এখনো।

সংক্ষিপ্ত স্কোর

ইংল্যান্ড : ২০ ওভারে ১৫৫/৯

ওয়েস্ট ইন্ডিজ : ১৯.৪ ওভারে ১৬১/৬

ফল : ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৪ উইকেটে জয়ী

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত