মাতারা সাইক্লোনের ২৮ বলে ৭৬ রানের দিন

আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০২০, ০৩:৩৪ এএম

কলম্বো থেকে ১৬০ কিমি দক্ষিণের শহর মাতারা। নীল সাগরের কোলে প্রবাল দিয়ে ঘেরা দ্বীপ। এখানেই জন্ম সনাৎ জয়াসুরিয়ার। তার ক্রিকেটার হয়ে ওঠার পেছনে একটা গল্প আছে।

মাতারার সাগরকুলে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে হলে ছোট্ট জয়াসুরিয়াকে একটা শর্ত মানতে হতো। বল হারিয়ে গেলে কিনে দিতে হবে। কারণ সমবয়সিদের চেয়ে সনাৎ এতটাই জোরে বল মারতেন যে তা কুল ছেড়ে সাগরে গিয়ে পড়ত। হারিয়েও যেত। কোনোদিন বাবার কাছে চেয়েচিন্তে পয়সা নিয়ে বল কিনে ফেরত দিতেন সনাৎ। সম্ভব না হলে মন খারাপ করে বসে থাকতেন। সন্ধ্যাবেলা অবশ্য জয়াসুরিয়ার আদর বেড়ে যেত। কারণ সাগরের গভীরে মাছ ধরতে যাওয়া নৌকাগুলোর ফেরার সময় হতো তখন। আর কার নৌকা আগে ফিরছে তাই দেখতে ডাক পড়ত জয়াসুরিয়ার। সবাই বুঝে গিয়েছিল ছোট্ট ছেলেটার চোখের দৃষ্টি অন্য ছেলেদের চেয়ে প্রখর। সনাৎ জয়াসুরিয়ার বড় ক্রিকেটার হওয়ার পেছনে প্রখর ‘দৃষ্টিশক্তির’ ভূমিকা ছিল অনেক বেশি।

ক্রিকেটে তিনি যে ‘পিঞ্চ হিটিংয়ের’ বিপ্লব এনেছিলেন তা আসলে হ্যান্ড-আই কম্বিনেশনের ফল। ১৯৯৬’র বিশ্বকাপে প্রতিপক্ষের ওপর সুনামির মতো আছড়ে পড়েছিলেন জয়াসুরিয়া। ৭ এপ্রিল এমনই একটা দিন। ১৯৯৬ সালের এই দিনে সিঙ্গাপুরের ক্রিকেট ক্লাব মাঠে সিঙ্গার কাপের ফাইনালে আছড়ে পড়েছিল ‘মাতারা সাইক্লোন’। মাত্র ২৮ বলে ৭৬ রানের ইনিংস খেলেছিলেন জয়সুরিয়া। সেদিন মাত্র ১৭ বলে হাফ সেঞ্চুরি করেছিলেন তিনি, যা ছিল দ্রুততম হাফ সেঞ্চুরির রেকর্ড, ১৯ বছর পরে তা ভেঙে দেন দক্ষিণ আফ্রিকার এবি ডি ভিলিয়ার্স।

সিঙ্গার কাপ ফাইনালে শ্রীলঙ্কার প্রথম উইকেট পড়ে ৭০ রানের মাথায়। আকিব জাভেদের বলে কোনো রান না করেই আউট হয়েছিলেন রুমেশ কালুভিতারানা। অন্য প্রান্তে ৬৬ রানে ব্যাট করছিলেন জয়াসুরিয়া। অতিরিক্ত থেকে এসেছিল ৪ রান। ওয়াকার ইউনিস ও আকিব জাভেদ বুঝতে পারছিলেন না কোথায় বল ফেলবেন। শেষ পর্যন্ত ৭৬ রানের মাথায় ওয়াকারের বলে সাঈদ আনোয়ারের হাতে ধরা পড়েন জয়াসুরিয়া। এমন ঝড়ের পরেও কিন্তু ফাইনালটি জিতেছিল

পাকিস্তানই। প্রথমে ব্যাট করে ৪৮.৩ ওভারে ২১৫ রানে অল আউট হয়েছিল পাকিস্তান। দলের পক্ষে একমাত্র হাফ সেঞ্চুরিটি করেছিলেন ইজাজ আহমেদ। ৭৫ বলে ৫১ রান করার পর জয়াসুরিয়ার বলে বোল্ড হন। রমিজ রাজা ৩৭ রান করে আউট হয়েছিলেন। দুই ওপেনার আমির সোহেল ও সাঈদ আনোয়ার ব্যর্থ হন। চামিন্দা ভাস ও মুত্তিয়া মুরালিধরন দুটি করে উইকেট নিয়েছিলেন। ২১৬ রানের টার্গেটে খেলতে নেমেই ঝড় তোলেন জয়াসুরিয়া। পাকিস্তানি সমর্থকরা তাই দেখে টিভির সুইস অফ করেছিলেন, পরে যদিও তাদের আফসোসে পুড়তে হয়েছিল। অশাঙ্ক গুরুসিংহের ২০ ও হাসান তিলকারত্নের ৩৩ ছাড়া পাকিস্তানি বোলারদের সামনে আর কেউ দাঁড়াতে পারেননি। অরবিন্দ ডি সিলভা করেছিলেন ৪। অধিনায়ক অজুর্না রানাতুঙ্গা খাতাই খুলতে পারেননি। সাকলাইন মুশতাক ও আতা-উর-রেহমান তিনটি করে উইকেট নিয়েছিলেন। পাকিস্তান সিঙ্গার কাপ জিতেছিল ৪৩ রানে। ম্যাচসেরা হয়েছিলেন সাকলাইন। তবে ৭৬ রানের ইনিংস খেলে ক্ষণিকের বিভ্রম তৈরি করেছিলেন জয়াসুরিয়া।

কয়েকদিন আগে নিজের ইউটিউব চ্যানেলে ইনজামাম-উল-হক তিন ক্রিকেটারের কথা বলেছেন যারা খেলাটাকে চিরদিনের মতো বদলে দিয়েছেন। তাদের একজন জয়াসুরিয়া। অন্য দুজন ভিভ রিচার্ডস ও এবি ডি ভিলিয়ার্স। লঙ্কান বাঁ-হাতি ওপেনার সম্পর্কে ইনজামামের মন্তব্য- পিঞ্চ হিটিংয়ের মাধ্যমে চিরদিনের মতো একদিনের ক্রিকেট বদলে দেন জয়াসুরিয়া।

মাতারা সাইক্লোন কিন্তু শুরু থেকেই এমন ছিলেন না। ক্যারিয়ারের প্রথমার্ধে জয়াসুরিয়া ছিলেন বাঁ-হাতির ফিঙ্গার স্পিনার যে কিনা অল্পস্বল্প ব্যাট করতে পারে। ক্যারিয়ারের দ্বিতীয়ার্ধে তিনি ছিলেন ভয়-ডরহীন বিস্ফোরক ওপেনার ও দারুণ কার্যকরী বোলার। ’৯৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল যার প্রমাণ। ১৩ মার্চ ভারতের বিপক্ষে ইডেনে সেদিন ব্যাটে রান না পেলেও বল হাতে দলের জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। টেস্ট-ওয়ানডে মিলে ৪৪০ উইকেট আছে তার। রান করেছেন ২০ হাজারের ওপর। সেঞ্চুরি করেছেন ৪২টি। তবে জয়াসুরিয়া এসব পরিসংখ্যান ছাপিয়ে অন্য উচ্চতায় আসীন এক ক্রিকেট গণনায়ক। ’৯২-এর বিশ্বকাপে পিঞ্চহিটিং শুরু করা মার্ক গ্রেটব্যাচের সফল উত্তরসূরিও। এতটাই সফল যে ’৯৬ বিশ্বকাপ থেকে পিঞ্চহিটিংয়ের জন্মদাতা হিসেবে কেউ আর গ্রেটব্যাচকে মনে রাখেনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত