খান মো. জহুরুল হক, রাজবাড়ী
দক্ষিণবঙ্গের প্রবেশদ্বার খ্যাত রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে নদী পার হতে আসা ঢাকামুখী পণ্যবাহী ট্রাক থেকে ফের শুরু হয়েছে চাঁদাবাজি। গায়ে কমিউনিটি পুলিশ লেখা পোশাক লাগিয়ে দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের ট্রাক বুকিং কাউন্টারের সামনে ২৪ ঘণ্টা পালাক্রমে অবস্থান করছে এসব চাঁদাবাজ। আর তাদের খপ্পরে পড়ে কাউন্টারে টিকিং সংগ্রহ করতে আসা পণ্যবাহী ট্রাকচালকদের মাথাপিছু গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। অভিযোগ উঠেছে, ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের পক্ষে আদায় করা হচ্ছে বাড়তি এই টাকা। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা এ অভিযোগ অস্বীকার করলেও সরেজমিনে দৌলতদিয়া ইউনিয়ন যুবলীগের দুই নেতাকে কমিউনিটি পুলিশের পোশাক পরে চাঁদার টাকা তুলতে দেখা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে আসা মাছ, মুরগি, পান, কলা ও ফলবাহী প্রতিটি ট্রাক ও পিকআপ থেকে ৩০০-৫০০ টাকা করে আদায় করছে চাঁদাবাজ চক্রের সদস্যরা। যারা স্থানীয়ভাবে দালাল নামে পরিচিত। গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হওয়ায় মাঝখানে কিছুদিন বিরতি দিয়ে এসব চিহ্নিত দালাল ফের পণ্যবাহী ট্রাক থেকে চাঁদাবাজি শুরু করেছে। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে মামলাও রয়েছে। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের ট্রাক বুকিং কাউন্টারের সামনে ৪ যুবককে কমিউনিটি পুলিশের পোশাক পরে অবস্থান করতে দেখা যায়। তারা হলেন দৌলতদিয়া ইউনিয়নের জলিল সরদারপাড়ার আনু ম-লের ছেলে সাইমউদ্দিন ম-ল, ২ নম্বর বেপারীপাড়ার আবুল মৃধার ছেলে মো. মুসা মৃধা, নুরু ম-ল পাড়ার ওয়াজদ্দিন বেপারীর ছেলে মাসুদ বেপারী ও ওমর আলী মোল্লা পাড়ার আবদুল হালিমের ছেলে ইব্রাহিম খলিল। তাদের মধ্যে কমিউনিটি পুলিশের পোশাক পরা সাইমউদ্দিন ম-ল দৌলতদিয়া ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ইব্রাহিম খলিল ৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) দৌলতদিয়া ঘাট শাখার সহব্যবস্থাপক মো. মাহাবুব হোসেন দেশ রূপান্তরকে জানান, দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌ-রুট দিয়ে ২৪ ঘণ্টায় যাত্রীবাহী ৬০০-৭০০ বাস, ৭০০-৮০০ ছোট-বড় ট্রাক ও ১ হাজার ১০০-১ হাজার ২০০ প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাস নদী পারাপার হয়ে থাকে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যাত্রীবাহী বাস, প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাস থেকে কোনো চাঁদা আদায় করা না হলেও প্রতিটি ট্রাক থেকে গড়ে ৩০০-৫০০ টাকা চাঁদা নেওয়া হয়। সেই হিসাবে ৮০০ ট্রাক থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা চাঁদা আদায় হচ্ছে। এই টাকা বিভিন্ন ভাগে ভাগ হয়ে থাকে। আর যারা কমিউনিটি পুলিশের পোশাক পরে টাকাগুলো নিচ্ছে, তারা প্রতিদিন পায় মাথাপিছু ৫০০-৬০০ টাকা।
দৌলতদিয়া ট্রাক বুকিং কাউন্টারের সামনে নিয়মিত পুলিশ প্রহরা থাকার পরও কমিউনিটি পুলিশ কেনÑ এমন প্রশ্নের উত্তরে গোয়ালন্দ ঘাট থানার ওসি মো. আশিকুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কাউন্টারে কমিউনিটি পুলিশের ব্যাপারে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই। তাদের এখানে কে দিয়েছে, তা আমি জানি না।’
তবে একই প্রশ্নের জবাবে কমিউনিটি পুলিশের পোশাক পরা মুসা মৃধা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজবাড়ী ট্রাফিক পুলিশ আমাদের এখানে রেখেছে। যে কারণে আমরা এখানে আছি। আমরা প্রতিটি ট্রাকচালকের কাছ থেকে ১০-২০ টাকা নিয়ে থাকি।’
আরেক চাঁদা আদায়কারী সাইমউদ্দিন ম-ল বলেন, ‘পুলিশের সহযোগিতার জন্য আমরা কাজ করছি। পুলিশ আমাদের এই পোশাক দিয়েছে। আমরা কোনো চাঁদাবাজ নই।’
চাঁদা আদায়কারীদের দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে রাজবাড়ী ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক মো. রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চাঁদাবাজি বন্ধ করতে কাউন্টারের সামনে কমিউনিটি পুলিশ রাখা হয়েছে। এই কমিউনিটি পুলিশ পণ্যবাহী ট্রাকচালকদের সহযোগিতা করবে। বিনিময়ে চালকরা খুশি হয়ে ১০-২০ টাকা দিলে সেই টাকা দিয়ে তারা চলবে।’
গোয়ালন্দ উপজেলা আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক মো. নুরুল ইসলামের অনুসারীরা ট্রাক বুকিং কাউন্টারের সামনে চাঁদাবাজি করছে বলে জানান দৌলতদিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. মোশারফ হোসেন প্রামাণিক। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দৌলতদিয়া ট্রাক বুকিং কাউন্টারে কোনো চাঁদাবাজি আমরা করতে দেব না। যদি কেউ করে তার দায় আমরা নিতে পারি না; বরং তাকে আইনের হাতে তুলে দেওয়ায় সহযোগিতা করব আমরা। তাদের শাস্তি আমরাও চাই।’
গোয়ালন্দ উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফকীর আমজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ট্রাক বুকিং কাউন্টারে চাঁদাবাজি হওয়ার ব্যাপারে কোনো আপস নেই। যারা চাঁদাবাজি করবে, তাদের প্রতিরোধ করব আমরা।’
অন্যদিকে গোয়ালন্দ পৌর আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মো. নজরুল ইসলাম ম-ল বলেন, ‘আওয়ামী লীগের নামে কেউ চাঁদাবাজি করলে তাকে ছাড় দেওয়া হবে না। আওয়ামী লীগে কোনো চাঁদাবাজের স্থান নেই। এ ব্যাপারে আমরা পুলিশকে সার্বিক সহযোগিতা করব।’
