গোলকিপারকে বোকা বানানো সহজ মালদিনিকে নয়

আপডেট : ২৬ জুন ২০২০, ০৭:২৭ এএম

১৯৮৫। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট তখন রোনাল্ড রিগ্যান। সোভিয়েত শাসন করছেন মিখাইল গর্ভাচেভ। ইথিওপিয়ার দুর্ভিক্ষ, ইউরোপিয়ান কাপ ফাইনালে দাঙ্গা, ক্রিমিনাল কেস তদন্তে ডিএনএ’র ব্যবহার, জেমস বন্ডের চরিত্র থেকে রজার মুরের সরে যাওয়া সবই হয়েছিল সেই বছরটায়। ওটা পাওলো মালদিনির ফুটবল অভিষেকের বছরও।

২৫টা মৌসুম আর হাজারখানেক পেশাদার ম্যাচ খেলে ৪১ বছর বয়সে মালদিনি যখন অবসর নেন তখন পৃথিবীর দিগন্ত থেকে ঠা-াযুদ্ধের বিভীষিকা মিলিয়ে গেছে। ডিয়েগো ম্যারাডোনা তো বটেই, রোমারিও-বেবেতোরাও ফুরিয়ে গেছেন। ফুটবলে রাজত্ব করছেন মেসি-রোনালদো। এবং মালদিনি হয়ে উঠেছেন ফুটবলের জীবন্ত কিংবদন্তি। 

প্রায় দুই যুগ ধরে এসি মিলান রক্ষণের অতন্দ্র প্রহরী ছিলেন মালদিনি। সুযোগ এবং অর্থের হাতছানি থাকা সত্ত্বেও অন্য ক্লাবে যাননি। সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে এসি মিলানের হয়ে রেকর্ড ৯০২ ম্যাচ খেলেছেন। জিতেছেন ৭টি সিরি আ। একটি ইতালিয়ান কাপ। পাঁচটি চ্যাম্পিয়নস লিগ এবং তিনটি ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ইউরোপিয়ান কাপ বা উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনাল খেলার রেকর্ড তার অধিকারে। ২০০৯-এ অবসরের পর তার ৩ নম্বর জার্সি জাদুঘরে রেখে দিয়েছে এসি মিলান। পেলে-ম্যারাডোনার জার্সি সংরক্ষণের মতো ব্যাপার আরকি। অবসর ঘোষণার সময় ‘বুট জোড়া তুলে রাখায় কষ্ট হচ্ছে কি-না’ প্রশ্নে মালদিনি বলেছিলেন, ‘সারা জীবন এসি মিলানে খেলেছি বলে আমি খুব ভাগ্যবান। অসাধারণ একটা দল। আমার পরিবারকেও সব সময় পাশে পেয়েছি। সবকিছু নিখুঁতভাবে শেষ হয়েছে। যা করতে চেয়েছিলাম, তাই পেরেছি।’

সর্বকালের সেরা লেফটব্যাক। ক্লাবের হয়ে এত পুরস্কার। অথচ দেশের হয়ে কিছুই জিততে পারেননি। ১৯৮৮ থেকে ২০০২ পর্যন্ত সবগুলো বিশ্বকাপ এবং ইউরো খেলেছেন ইতালির হয়ে। ২০০৬-এর বিশ্বকাপ দলে ছিলেন না। কিন্তু আজ্জুরিরা চ্যাম্পিয়ন হলো সে বছরই। ‘তখন আমি আমেরিকায়। ইউরোপ থেকে অনেক দূরে। দল সেমিফাইনালে ওঠার আগে তেমনভাবে খেলা দেখিনি। ফাইনাল দেখেছিলাম। আন্দ্রে পিরলোদের জিততে দেখে খুশি হয়েছিলাম। সামান্য হতাশও লেগেছিল। কারণ আমরাও ফাইনাল খেলে জিততে পারিনি’ আফসোস মালদিনির কণ্ঠে।

২০০০-এর ইউরো ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে হেরেছিলেন মালদিনিরা। সেই শোক কাটিয়ে উঠতে পারলেও ভুলতে পারেননি নব্বই আর চুরানব্বইয়ের বিশ্বকাপ ব্যর্থতা। মালদিনি বলেছিলেন, ‘অমø-মধুর একটা অভিজ্ঞতা হয়েছিল নব্বইয়ে। একটাও গোল না খেয়ে আমরা সেমিফাইনালে উঠেছিলাম। সেখান থেকে বিদায়। যেভাবে খেলছিলাম তাতে ফাইনালে ওঠা উচিত ছিল। ’৯৪-এর বিশ্বকাপে আমাদের শুরুটা হয়েছিল খুব বিশ্রিভাবে। প্রথম ম্যাচে আয়ারল্যান্ডের কাছে হেরেছিলাম। নরওয়ের সঙ্গে পরের ম্যাচে আমরা গোলরক্ষককে তুলে নিতে বাধ্য হই। এমন বাজে শুরুর পর ফাইনালে উঠে পেনাল্টিতে হারি। ব্যাজ্জিও এবং বারেসি ইনজুরি নিয়ে খেলেছিলেন। এটাই ফুটবল।’

মাত্র ১৬ বছর বয়সে এসি মিলানে অভিষেক। সিনিয়র টিমে অভিষেক ২ বছর পর। মালদিনি লেফটব্যাক হিসেবে খেলতেন কিংবদন্তি ডিফেন্ডার ফ্রাঙ্কো বারেসির পাশে। বারেসি মিলান ত্যাগের পরই লেফটব্যাক থেকে সেন্টারব্যাক পজিশনে খেলতে থাকেন। বিনীতভাবে বলতেন, ‘যা কিছু শেখার আমি বারেসির কাছেই শিখেছি।’ মাত্র ১৯ বছর বয়সে ইতালির নীল জার্সিতে মালদিনির অভিষেক। এরপর ট্যাকেল, ম্যান মার্কিং, ক্লিয়ারেন্স কিংবা দলের প্রয়োজনে আক্রমণে উঠে গিয়ে নজর কেড়েছেন। লোকে বলত, ‘গোলকিপারকে বোকা বানানো সহজ, মালদিনিকে নয়।’

আরেক কিংবদন্তি সিজার মালদিনির ঘরে ১৯৬৮’র আজকের দিনে জন্ম পাওলোর। ছেলে খেলা শুরু করেছিলেন বাবার পরিচয়ে। ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত সিজার যখন ইতালি দলের ম্যানেজার, পাওলো তখন সেই দলের খেলোয়াড়। বিখ্যাত বাবার পরিচিতি ছাপিয়ে ততদিনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সেই প্রতিষ্ঠা এমনই উঁচুদরের ছিল যে সিজারের মতো বাবাও জুনিয়র মালদিনির পরিচয়ে পরিচিত হতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। 

ইতালির হয়ে মোট ১২৬ ম্যাচ খেলেছেন মালদিনি, যার ৭৪টিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে সব মিলিয়ে হাজারের বেশি ম্যাচ খেলেছেন অথচ ক্যারিয়ারে লাল কার্ড দেখেছিলেন মাত্র একবার! মালদিনির পজিশনিং প্রজ্ঞা এতটাই নিখুঁত ছিল যে প্রতি দুই ম্যাচে একটিতে ট্যাকল করতেন। আর্সেনালের পল মারসন এসি মিলানের বিপক্ষে উয়েফা সুপার কাপে (১৯৯৫) খেলার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘ওই ম্যাচে মালদিনি আমাকে মার্ক করছিল। পুরো ম্যাচে আমি একবারও বলে লাথি মারতে পারিনি। অবিশ্বাস্য খেলেছিল। পুরো ক্যারিয়ারে যতজন খেলোয়াড়ের মুখোমুখি হয়েছি তাদের মধ্যে মালদিনিই সেরা।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত