তারিখ একই। সাল আলাদা। দলও ভিন্ন। একটা ব্রাজিল। অন্যটা আর্জেন্টিনা।
১৯৫৮ সালের ২৯ জুন সুইডেনকে হারিয়ে প্রথম বিশ্বকাপ জিতেছিল ব্রাজিল। আর ১৯৮৬ সালের আজকের দিনেই (সাবেক) পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জিতেছিল আর্জেন্টিনা।
৫৮-র বিশ্বকাপেই পেলের উদয়। বয়স তখন ১৭। বিশ্বকাপ জেতার পর তাকে নিয়ে মাতামাতি হয়েছিল খুব। আবেগে সতীর্থদের কাঁধে উঠে কান্নায় ভেঙে পড়েন। দেশে ফেরার পর সাও পাওলো থেকে পেলেকে নিয়ে আসা হয়েছিল বাউরুতে। চার দিকে লেখা হয়েছিল ‘বয় ফ্রম বাউরু’। শহরের মেয়র পেলেকে একটা গাড়ি উপহার দিয়েছিলেন। ওটাই পেলের জীবনের প্রথম গাড়ি।
সেই ব্রাজিল দলে ছিলেন ডিডি আর ভাভার মতো অভিজ্ঞরা। সঙ্গে পেলে আর গ্যারিঞ্চার মতো তরুণ তুর্কিদের পেয়ে রীতিমতো অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছিল ব্রাজিল। জন্ম থেকেই গ্যারিঞ্চার মেরুদ- বাঁকা ছিল। বাঁ পা ছিল ডান পায়ের চেয়ে কয়েক ইঞ্চি ছোট। এই সব প্রতিকূলতা জয় করেই বিশ্বকাপে খেলতে নেমেছিলেন তিনি। প্রথম ম্যাচটি ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে। এতটাই ভালো খেলেছিলেন যে রুশ ডিফেন্ডারও বলতে বাধ্য হন, ‘ও কি রাবার দিয়ে তৈরি! শরীর অতটা বাঁকিয়ে ড্রিবল করছে কীভাবে?’ প্রথম মিনিটেই ডানপ্রান্ত দিয়ে তিন জন রুশকে কাটিয়ে বল মারেন পোস্টে। পরের মিনিটে দুজনকে কাটিয়ে পেলেকে গোল করার সুযোগ করে দেন। প্রথম ম্যাচ থেকে ফাইনাল পর্যন্ত চলে পেলে-গ্যারিঞ্চার যুগলবন্দি। ফাইনালে সুইডেনের বিরুদ্ধে ভাভাকে দিয়ে জোড়া গোল করিয়েছিলেন গ্যারিঞ্চা। দুটি গোল করেছিলেন পেলেও। অন্যটি জাগালো। সব মিলিয়ে ৫-২ গোলের জয়।
৫৮-র বিশ্বকাপে তবু পেলে-গ্যারিঞ্চার যুগলবন্দি ছিল। ৮৬-র বিশ্বকাপ একা জিতিয়েছেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা। ৭৮ সালের সাফল্য ৮২-তে ধরে রাখতে না পারায় বিদায় নিতে হয় মেনোত্তিকে। আর্জেন্টিনার কোচ হন কার্লোস বিলার্দো। যিনি প্যাসারেলাকে সরিয়ে দলের অধিনায়কত্ব তুলে দেন ম্যারাডোনার হাতে। আত্মজীবনীতে এ কথা লিখেছেন ম্যারাডোনা, ‘সব কোচেরই আলাদা অধিনায়ক থাকে বোধহয়। মেনোত্তির যেমন ছিল প্যাসারেলা। ও সময় কারও সাধ্য ছিল না প্যাসারেলাকে কিছু বলার। ছোটখাটো কথা উঠলেও মেনোত্তি এমন প্রতিক্রিয়া দিতেন, সবাই বুঝে যেতেন তার এক নম্বর কে। বিরাশির বিশ্বকাপের পর মেনোত্তি দায়িত্ব ছাড়েন, আসেন বিলার্দো। এসেই যখন বিলার্দো আমাকে অধিনায়ক হিসেবে চেয়েছিলেন, মনে হয়েছিল, আমাকেও বিলার্দোর এক নম্বর হতে হবে।’
মেক্সিকোতে সত্যি সত্যিই এক নম্বর হয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন ম্যারাডোনা। শুরুটা ভালো হয়নি। সেই বিশ্বকাপের দুটি প্রস্তুতি ম্যাচের একটিতে হারে আর্জেন্টিনা। অন্যটাতে গোলশূন্য ড্র করে। এতেই সমালোচনা শুরু হয়। টিম মিটিংয়ে প্যাসারেলা অভিযোগ করেন, ‘দলের সামনে কী দৃষ্টান্ত রাখছে অধিনায়ক? এই কি বিশ্বকাপে খেলতে আসা দলের শৃঙ্খলার নমুনা? ডিয়েগো ড্রাগাসক্ত, অন্যদেরও ড্রাগ নিতে শেখাচ্ছে।’ উত্তরে ম্যারাডোনা বলেছিলেন, ‘আমি ড্রাগ নিই তা অস্বীকার করার কারণ নেই, কিন্তু পরিষ্কার করে বলে দিতে চাই, মেক্সিকোতে আসার পর আর নিইনি।’ এরপর প্যাসারেলার বিরুদ্ধে দলবিরোধী কাজের অভিযোগ তোলেন ম্যারাডোনা। এবং সেই মিটিংয়ের পরই ডায়রিয়ার অজুহাতে কোনো ম্যাচ না খেলে মেক্সিকো থেকে দেশে ফিরেছিলেন ৭৮-র বিশ্বকাপ জয়ী অধিনায়ক। এতে ভালোই হয়েছিল। দলের মধ্যে গ্রুপিংয়ের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়।
তৃতীয় কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছিল ইংল্যান্ড-বনাম আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচেই হাত আর পায়ের জাদু দেখিয়েছিলেন ম্যারাডোনা। ৫১ মিনিটে তার ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলের বিতর্ক চিরকালীন হয়ে দাঁড়ায়। এর চার মিনিট পরের গোলটা তো কিংবদন্তি। নিজেদের অর্ধে বল ধরে, ইংল্যান্ডের চার ডিফেন্ডারকে পেরিয়ে গোলরক্ষক পিটার শিলটনকেও কাটিয়ে গোল দিয়েছিলেন ম্যারাডোনা। অনেকের বিবেচনায় শতাব্দীর সেরা গোল। আত্মজীবনীতে ম্যারাডোনা মজার এক মন্তব্য করেছেন গোলটি নিয়ে, ‘কী ভয়ানক বিচ্ছু নেগ্রো এনরিকে, ভাবতেও পারবেন না। গিয়েছিল গোসল করতে। ফিরে এসে শুনল ভালদানোর সঙ্গে কথা বলছি, বাকিরাও গোলটা নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত। তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে অমøান বদনে বলে ফেলল, সবাই গোল নিয়ে এত হইচই করছ, কই আমাকে কেউ অভিনন্দন জানালে না তো? যে পাসটা বাড়িয়েছিলাম, দিয়েগোর গোল না করে উপায় ছিল?’
পশ্চিম জার্মানিকে ৩-২ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল আর্জেন্টিনা। না ম্যারাডোনা কোনো গোল করেননি। বেলজিয়ামের বিপক্ষে সেমিফাইনালে তিনি জোড়া গোল করেছিলেন। ফাইনালে ৫৬ মিনিটের মধ্যে দুই গোলে এগিয়ে গিয়েছিল আর্জেন্টিনা। এরপর ৭৪ আর ৮২ মিনিটে গোল শোধ করেন রুমেনিগে আর ফোলার! তারপর যা হয়েছিল তা ম্যারাডোনার আত্মজীবনীতে লেখা আছে, ‘২-২ এর পর সত্যিই ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। তবু, ওদের অবসন্ন পাগুলো দেখে ভরসা পেয়ে সেন্টার স্পটে বল বসিয়ে সবাইকে চিৎকার করে বলেছিলাম, জিতব আমরাই। জিততেই হবে।’ ম্যাচ শেষ হওয়ার ৬ মিনিট বাকি তখনো। আর্জেন্টিনার অর্ধে থেকে বুরুচাগার সামনে বল বাড়িয়ে দিলেন ম্যারাডোনা। গোল। দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হলো আর্জেন্টিনা।
