দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াহিদা খানম ও তার বাবা ওমর আলীর ওপর হামলায় ঘটনা নতুন মোড় নিয়েছে। যদিও দিনাজপুরের সচেতন নাগরিকরা বলছেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত রাঘব-বোয়ালদের আড়াল করতেই ‘নতুন তথ্য’ হাজির করা হচ্ছে।
শনিবার বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য জানান, ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াহিদা খানম ও তার বাবা ওমর আলীর ওপর হামলা করেছে ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়েরই চাকরিচ্যুত রবিউল ইসলাম (৪৩) নামের এক কর্মচারী। রবিউল ইসলাম ইউএনওর ওপর হামলায় স্বীকারোক্তি দিয়েছেন পুলিশ জানায়। গত ১১ সেপ্টেম্বর ইউএনও অফিসের ওই চতুর্থ শ্রেণির চাকরিচ্যুত কর্মচারীকে আটক করেছে পুলিশ।
এর আগে রংপুরে র্যাবের পক্ষ থেকে ইউএনওর ওপর হামলার ঘটনায় বহিষ্কৃত যুবলীগ নেতা আসাদুল ইসলাম ও রং মিস্ত্রি নবীরুল ইসলাম এবং সান্টু কুমার বিশ্বাসকে আটক করে র্যাব। র্যাবের পক্ষ থেকে তখন জানানো হয়েছিল, যুবলীগ নেতা আসাদুল, নবীরুল ও সান্টু এই ঘটনার সাথে জড়িত। আটককৃত তিন আসামি তাদের জবানবন্দিতে চুরির উদ্দেশ্যে ইউএনও ও তার বাবাকে হামলা করেন।
র্যাবের চুরির উদ্দেশ্যে ইউএনওর ওপর হামলার বিষয়টি নিয়ে দেশব্যাপী সমালোচনা শেষ হতে না হতেই ইউএনওর ওপর হামলার বিষয়ে পুলিশের নতুন এক চমক সামনে চলে এসেছে। শনিবার রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য বলেন, সিসিটিভির ফুটেজ ও হামলার ঘটনায় ব্যবহৃত জিনিসপত্রের আলোকে আমরা বেশ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। আমরা একজন ব্যক্তিকে আটক করেছি। সে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা স্বীকার করে বক্তব্য প্রদান করেছে। তার বক্তব্যের প্রেক্ষিতে আমরা বেশ কিছু আলামতও উদ্ধার করেছি। সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে সেটির সঙ্গে আমরা মিলিয়ে দেখছি। আজকে (শনিবার) তাকে আমরা বিজ্ঞ আদালতে প্রেরণ করব এবং আমরা তার রিমান্ড চাইব। রিমান্ডে নিয়ে আসে তাকে আমরা আরও জিজ্ঞাসাবাদ করব। ঘটনা সংক্রান্তে সম্পূর্ণ তথ্য সেটি সংগ্রহ করার চেষ্টা করব।
ইউএনওর ওপর হামলার বিষয়ে একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী জড়িত থাকার বিষয়টি নেহাত রাঘব বোয়ালদের আড়াল করার উদ্দেশ্যেই বলে মনে করছেন অনেকেই। স্থানীয়রা বলছেন, ইউএনওর ওপর হামলা করতে যে সাহস প্রয়োজন সেটা একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর হবে এটা অবিশ্বাস্য! আর যদিও সেটা হয়েও থাকে তাহলে এর পেছনে বড় বড় রাঘব-বোয়ালদের হাত আছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দিনাজপুর-৬ আসনের একজন ভোটার দেশ রূপান্তরকে বলেন, এটা কি সত্য ঘটনা হতে পারে? আমার তো বিশ্বাস হয় না! কর্মচারী টাকা চুরি করার জন্য ইউএনওকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা করার সাহস পাবে না। এখানে রাজনৈতিক কোন উদ্দেশ্য আছে।
এ বিষয়ে দিনাজপুর নাগরিক উদ্যোগ কমিটির সভাপতি আবুল কালাম আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, একজন মালি এ রকম ঘটনা ঘটাবে এটা অসম্ভব! এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এই ঘটনায় যারা মাস্টারমাইন্ড তাদেরকে খুঁজে বের করতে হবে। আমার বিশ্বাস পুলিশের সেই ক্ষমতা আছে। পুলিশকে আরও গভীরে যেতে হবে। ঘোড়াঘাটের ইউএনও ওয়াহিদা এসিল্যান্ডেরও দায়িত্ব পালন করতেন। ঘোড়াঘাটে খাস জমি, আর্মিদের জমি, বালু মহাল, অবৈধ দখলদারিসহ বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন ইউএনও ওয়াহিদা। গোলমাল তো এগুলো নিয়েই।
তিনি আরও বলেন, কয়েক দিন আগে বিরামপুরের ইউএনওকে বদলি করা হয়েছিল। বিরামপুরের ইউএনও একটা অবৈধ ড্রেজার মেশিন পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। এই ঘটনার কারণে ইউএনওকে বদলি করার চেষ্টা চালানো হয়েছে। যদিও পরবর্তীতে বদলির আদেশ বাতিল হয়েছে। এগুলো কারা করাচ্ছেন? এর আগে নবাবগঞ্জের ইউএনওকে মারপিট করা হয়েছিল, ঘোড়াঘাট থানার ভেতরে গুলি চালানো হয়েছিল। এগুলোর সাথে জড়িত কারা? তাদের খুঁজে বের করে আনতে হবে।
আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও ত্রাণ পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক আলতাফুজ্জামান মিতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গোটা তদন্তের বিষয়টায় একটার সঙ্গে আরেকটার মিল নেই। পুরো বিষয়টাই অসংগতিপূর্ণ। আরও কোন বিষয় সামনে আসবে কিনা সেটাও দেখার বিষয়। আমাদের ক্ষোভ প্রকাশ করা ছাড়া কোন উপায় নাই। চুরির পরে চাকরিচ্যুত একজন মানুষ ইউএনওর ওপর হামলা চালাতে পারে, এটা আমার কাছে মনে হয় না। বরং এর পেছনে কারা জড়িত তাদেরকে খুঁজে বের করতে হবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে।
