বিশ্বকাপজয়ী গুরুসিংহেকে মনে রাখেনি কেউ

আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:৪৬ এএম

অশাঙ্ক প্রদীপ গুরুসিংহের আজ জন্মদিন। একদা শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটের ‘নাম্বার থ্রি’ পা রাখলেন ৫৪-তে। যারা গুরুসিংহের ঘন কালো দাড়ি-ঢাকা মুখ আর সলিড ব্যাটিং দেখেছেন তারা হয়তো আঁতকে উঠে বলতে পারেন, আহা সময় কত দ্রুত চলে যায়!

সময় দ্রুত প্রবহমানই বটে। না হলে ’৯৬-এর বিশ্বকাপ ফাইনাল কি খুব দূরের গল্প? লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে ৬৫ রানের ইনিংস খেলেছিলেন গুরুসিংহে। ২৪২ রান তাড়া করতে নেমে ১০৭ রানের ইনিংস দিয়ে ফাইনাল জিতিয়েছিলেন অরবিন্দ ডি সিলভা। ম্যাচসেরাও হয়েছিলেন। লোকে জানে তার কারণেই মার্ক টেইলরের অস্ট্রেলিয়া নতজানুভাবে বিশ্বকাপ হেরেছিল। ২৩ রানে জয়াসুরিয়া-কালুভিতারানার বিদায়ের পর গুরুসিংহের ৬৫ রানের ইনিংসকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দেয়নি কেউ। উইজডেন অ্যালমানাক কিন্তু গুরুসিংহের ‘একসেলারেটিং সাপোর্ট’ মনে রেখেছে।

শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটের উত্থানে বরাবর একসেলারেটরের ভূমিকা নিয়েছেন গুরুসিংহে। সেবারের বিশ্বকাপে তার গড় ছিল ৫১.১৬। দুটি আশি রানের ইনিংস ছিল। দল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর কোচ ডেভ হোয়াটমোরের প্রশংসা করেন গুরুসিংহে। উল্লেখ করতে ভোলেননি সাফল্যের কারিগর ডেভ। কথাটার সঙ্গে একমত ছিলেন না অধিনায়ক অর্জুনা রানাতুঙ্গা। তিনি মনে করতেন ডেভ না থাকলেও লঙ্কা বিশ্বচ্যাম্পিয়নই হতো। এই মতানৈক্য এবং বিশ্বকাপপরবর্তী ফর্মহীনতা এমন পরিস্থিতি তৈরি করে যে ডেভ তিন থেকে চারে খেলাতে শুরু করেন গুরুসিংহেকে। লঙ্কা দলে তখন চারে ব্যাট করতেন রানাতুঙ্গার ছোট ভাই সঞ্জীবা রানাতুঙ্গা। তাই অধিনায়ক বিষয়টা ভালোভাবে নেননি। ফলে লঙ্কার কোচিং ছেড়ে ল্যাঙ্কাশায়ারে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন ডেভ। এরপর কোনো কারণ ছাড়াই দল থেকে বাদ পরেন গুরুসিংহে। তারপরই ক্রিকেট থেকে তার অপ্রত্যাশিত অবসর ঘোষণা। অধিনায়ক রানাতুঙ্গাকে দোষ দেননি গুরুসিংহে। এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘তাড়াতাড়ি ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার ক্ষেত্রে আমি রানাতুঙ্কাকে দোষ দিই না। দিন শেষে সিদ্ধান্তটা আমারই ছিল। তবে বলতে চাই খেলার জন্য আদর্শ পরিবেশ ছিল না। এর জন্য দায়ী কেবল অর্জুনা রানাতুঙ্গা নয়, শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট বোর্ডেরও দোষ ছিল।’

১৯৮৫ সালের নভেম্বরে পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট এবং ওয়ানডে অভিষেক হয়েছিল গুরুসিংহের। টেস্ট সম্পর্কে তখন কোনো স্পষ্ট ধারণা ছিল না তার। এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘পঁচাশিতে আমার যখন টেস্ট অভিষেক হয় তখন ব্যাপারটা মোটেই গুরুত্ব সহকারে নেইনি। আমার কাছে ওটা ছিল অন্য একটা খেলার মতোই। টেস্ট কি জিনিস তখন জানতাম না। পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম টেস্টে আমি ইমরান খান এবং জাভেদ মিয়াঁদাদের বিরুদ্ধে খেলেছিলাম। সেই দলে ছিল মুদাসসর নজর, মোহসিন খান এবং কাশিম উমরের মতো ক্রিকেটার। পরে আমার সুনীল গাভাস্কারের বিপক্ষে খেলার সৌভাগ্য হয়েছে। তার সঙ্গে কথা বলে অনেক কিছু শিখেছিলাম।’

অভিষেকের তিন বছর পর ডিস্ট্রিক্ট ক্রিকেট খেলতে অস্ট্রেলিয়া গিয়েছিলেন গুরুসিংহে। অনেক রানও করেন মেলবোর্নে। তখন অস্ট্রেলিয়ার ডিস্ট্রিক্ট ক্রিকেট খুব শক্তিশালী। খেলতেন মার্ক হিউজের মতো ক্রিকেটার। এদের বিপক্ষে খেলতে খেলতে শট আর বাউন্স খেলা রপ্ত করেন বাঁহাতি গুরুসিংহে।

মাত্র ১৯ বছরে পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি করেন। কলম্বো টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে ১১৬ করে অপরাজিত ছিলেন। ওয়াসিম আকরাম আর আবদুল কাদিরের বিপক্ষে খেলাটা তখন সহজ ছিল না। ‘আমার মনে হয় পাকিস্তানের বোলিং আক্রমণ তখন দুনিয়ার সেরা। তাদের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি আমাকে অনেক তৃপ্তি দিয়েছিল’ বলেন গুরুসিংহে। নিজের শেষ টেস্ট সেঞ্চুরি করেছিলেন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মেলবোর্নে। ১৯৯৫ সালের সেই অজি দলে ছিলেন ক্রেইগ ম্যাকডারমট, গ্লেন ম্যাকগ্রা এবং শেন ওয়ার্নের মতো বোলার।

শ্রীলঙ্কার হয়ে ৪১ টেস্টে ৩৮.৯২ গড়ে ২৪৫২ রান করেছেন গুরুসিংহে। সেঞ্চুরি করেছেন সাতটি। ওয়ানডেতেও সমান সফল ছিলেন। ১৪৭ ম্যাচে ২৭.২৮ গড়ে করেছেন ৩৯০২  রান। আছে ২ সেঞ্চুরি আর ২২ হাফসেঞ্চুরি। শুধু এই পরিসংখ্যান দিয়ে তো আর গুরুসিংহের গুরুত্ব বোঝা সম্ভব নয়। স্কুল ক্রিকেট থেকে তিনি টানছেন লঙ্কান ক্রিকেটকে। হাসান তিলকারতেœর সঙ্গে অনূর্ধ্ব-১১ স্কুল ক্রিকেটে খেলতেন। ব্যাটিং শেখার চেষ্টা করতেন রেডিও শুনে। ‘আমাদের সময় টেলিভিশন ছিল না। রেডিও শুনতাম। ডেভিড গাওয়ারের খেলা পছন্দ করতাম। মার্ক ওয়াহকেও ভালো লাগত। ছোটবেলায় কখনো ভাবিনি একদিন শ্রীলঙ্কা বিশ্বকাপ জিতবে’ বলেছিলেন তিনি। স্কুল ক্রিকেটে গুরুসিংহে ছিলেন আক্রমণাত্মক ব্যাটসম্যান। পরে তিনে নামার পর স্টাইলে পরিবর্তন আনেন। সেই পরিবর্তনই স্থায়ী হয়েছিল। তিনে শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটের নির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত