ফাস্ট বোলিংয়ের দর্পিত সম্রাট কার্টলি অ্যামব্রোস

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০১:৫৫ এএম

আক্ষরিক অর্থেই কার্টলি অ্যামব্রোস ছিলেন ক্যারিবিয়ান দৈত্য। ৬ ফুট ৭ ইঞ্চি উচ্চতা নিয়ে বল ছাড়তেন প্রায় ১০ ফুট ওপর থেকে। তাতে যে গতি আর বাউন্স মিশে থাকত সেটাকে মারাত্মক বললে প্রায় কিছুই বলা হয় না। একজন ম্যালকম মার্শাল আর অ্যান্ডি রবার্টস মিলে যা অ্যামব্রোস আসলে তাই ছিলেন। লোকে যদিও তাকে রবার্টসের উত্তরসূরি বলত।

মাঠের বাইরে বেশি কথা বলা পছন্দ করতেন না। কেউ ইন্টারভিউ চাইলে প্রায় অননুকরণীয় ভঙ্গিতে বলতেন, ‘কার্টলি টক টু নো মান’। যা বলার বলতেন মাঠে। তার হাতে ক্রিকেট বলটা বাঙ্ময় হয়ে উঠত। ৯৮ টেস্টে ২০.৯৯ গড়ে ৪০৫ উইকেট নিয়েছেন। যদিও সত্যিকারের অ্যামব্রোস পরিসংখ্যানে নয়, ধরা দিতেন ছোট ছোট স্পেলে। সেগুলো এমনই অগ্নিগর্ভ ছিল যে প্রতিপক্ষকে মুহূর্তে ছারখার করে দিত। নব্বই দশকের মাঝামাঝিতে ত্রিনিদাদে একবার সেই আগুনে পুরে কয়লা হয়েছিল ইংল্যান্ড। মাত্র ৪৬ রানে গুঁড়িয়ে গিয়েছিল অ্যালেক স্টুয়ার্টের দল। ২৪ রানে ৬ উইকেট নিয়েছিলেন অ্যামব্রোস। অন্যবার ওয়াকাতে ১ রানে ৭ উইকেট নিয়ে বোর্ডার বাহিনীকে মাটিতে মিশিয়েছিলেন।

১৯৯২’র নভেম্বর রিচি রিচার্ডসনের সেই উইন্ডিজ অস্ট্রেলিয়া সফর শুরু করেছিল ব্রিসবেনে ড্র করে। মেলবোর্নে জিতে এগিয়ে যায় অজিরা। ব্রায়ার্ন লারা ২৭৭ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস খেলেছিলেন সিডনিতে। সেই টেস্টও ড্র। এরপর অ্যামব্রোসের দুই ইনিংসের ১০ উইকেটে অ্যাডিলেড টেস্ট মহানাটকীয় ভাবে ১ রানে জেতে উইন্ডিজ। সিরিজে সমতা ফেরে।

পার্থে পঞ্চম টেস্ট খেলতে নামার আগে উইকেট দেখে অ্যামব্রোস রিচার্ডসনকে বলেছিলেন, ‘স্কিপার, যদি টস জিততে পারো, টেস্ট ও সিরিজ আমরাই জিতব।’ এই আত্মবিশ্বাসের কারণ সম্পর্কে অ্যামব্রোস পরে জানান, ‘তখন আমি দারুণ মুডে। মনে হয়েছিল আগে বোলিং করলে ঐ উইকেটে কেউ আমায় থামাতে পারবে না।’ কিন্তু রিচার্ডসন নয় টস জিতেছিলন অজি অধিনায়ক অ্যালান বোর্ডার। বিস্ময়কর ভাবে নিজেরা আগে ব্যাটিং নেন, যা চেয়েছিলেন অ্যামব্রোস।

‘খুব অবাক হয়েছিলাম। ব্যাপারটা আমার মাথায় ঢোকেনি। আমার এখনো মনে হয় ওটা ছিল অধিনায়ক বোর্ডারের সবচেয়ে বড় ভুল।’ মধ্যাহ্ন বিরতির আগে অস্ট্রেলিয়ার স্কোর ছিল ২ উইকেটে ৫৯। ডেভিড বুন ও মার্ক ওয়াহ ব্যাট করছিলেন। জাস্টিন ল্যাঙ্গার এবং স্টিভ ওয়াহকে আউট করেছিলেন ইয়ান বিশপ। প্রথম সেশনে ছন্দ খুঁজে পাননি অ্যামব্রোস, ‘সকালে ঠিক জায়গায় বল রাখতে পারছিলাম না। খুব হতাশ লাগছিল। নিজের ওপর চূড়ান্ত বিরক্তি নিয়ে লাঞ্চ সারলাম, আর মনে মনে বললাম, মাঠে ফিরে স্পেশাল কিছু করতে হবে।’

সত্যি ‘স্পেশাল’ কিছুই করেছিলেন অ্যামব্রোস। বিরতির পরই আউট করেন মার্ক ওয়াহকে। এরপর বোর্ডার প্রথম বলেই প্যাভিলিয়নমুখী। মাত্র ৩২ বলের সেই স্পেলে ১ রান দিয়ে ৭ উইকেট নিয়েছিলেন অ্যামব্রোস। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংস ১১৯ রানে শেষ হয়েছিল। দ্বিতীয় ইনিংসে বিশপ জ্বলে ওঠেন। ফলে ওয়াকা টেস্টে ইনিংস হারের লজ্জায় ডোবে অস্ট্রেলিয়া। আর সিরিজ জেতার পর অ্যামব্রোস বলেন, ‘আই ওয়াজ বেসিক্যালি আনস্টপএবল। বোলিংয়ের সময় নিজেকে ইনভিজিবল মনে হচ্ছিল। এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিলাম যে হাত থেকে একটাও ভুল ডেলিভারি বের হয়নি।’

এই হলেন আসল অ্যামব্রোস। ছন্দ পেলে ভুল ডেলিভারি করতেন না। টেস্ট এবং ওয়ানডেতে এমন কিছু স্পেল তার হাত থেকে বেরিয়েছে যা ইতিহাস। উঠে এসেছিলেন অ্যান্টিগা থেকে। গতি, বাউন্স আর সিম মুভমেন্ট দিয়ে যখন ক্রিকেট শাসন শুরু করেন তখন ক্যারিবিয়ান সাম্রাজ্য পতনমুখী। যতদিন মাঠে ছিলেন সেই পতনোন্মুখ সাম্রাজ্যে জৌলুশ ফেরানোর চেষ্টা করেছেন। কখনো সফল হয়েছেন। কখনো হতে পারেননি। তবু প্রতিটা স্পেলে বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি ফাস্ট বোলিংয়ের দর্পিত সম্রাট হতে এসেছেন। মার খেতে নয়।

আজ স্যার কার্টলি অ্যামব্রোসের ৫৭তম জন্মদিন। এক যুগের ক্যারিয়ারে (১৯৮৮-২০০০) এমনই ইমেজ তৈরি করেছেন যে, এই বয়সেও কেউ তাকে মারার সাহস করে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত