ব্যবসা-বাণিজ্যে মহানবী (সা.)

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২০, ১১:৪০ পিএম

ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রতি পবিত্র কোরআন ও হাদিসে বেশ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইসলামে ব্যবসা-বাণিজ্য অন্য যেকোনো পেশার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। তবে ব্যবসা অবশ্যই সততার ভিত্তিতে শরিয়ত ও সুন্নত মোতাবেক হতে হবে। পাশাপাশি ব্যবসায়িক কর্মকান্ডে ব্যস্ত হয়ে আল্লাহর স্মরণ থেকে কখনো গাফেল হওয়ার সুযোগ নেই। তাই ব্যবসায়ীর কর্তব্য হলো, সব সময় আল্লাহকে স্মরণ করা। হালাল পদ্ধতিতে আয়-উপার্জনের চেষ্টা করা। আবু সাইদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, ‘সৎ ও আমানতদার ব্যবসায়ী কেয়ামতের দিন নবী, সত্যবাদী ও শহীদদের সঙ্গে থাকবে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১২০৯; দারিমি, হাদিস : ২৫৩৯)

খুব অল্প বয়সে মা-বাবা ও দাদাকে হারিয়েছিলেন মহানবী (সা.)। এরপর তিনি চাচা আবু তালেবের স্নেহে লালিত-পালিত হয়েছেন। চাচার ঘরে অবস্থান করে তার ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষেত্রে তিনি চাচাকে সহযোগিতা করতেন। চাচার হাতে কিছু তুলে দেওয়ার চেষ্টা করতেন।

যৌবনে উপনীত হওয়ার পর মেষ চরানো এবং পরে ব্যবসার মাধ্যমে শুরু হয় মহানবীর (সা.) অর্থনৈতিক জীবন। তার ব্যবসায়িক সুনাম ও ‘আল-আমিন’ উপাধিতে ভূষিত হওয়ার কারণে খাদিজা (রা.) তাকে প্রথমত ব্যবসায়ের অংশীদার ও দ্বিতীয়ত স্বামী হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। সুন্দর আচরণ ও সততা ছাড়াও রাসুল (সা.)-এর মধ্যে বুদ্ধিমত্তা, দৈহিক শক্তি ও প্রখর বিচক্ষণতা ইত্যাদি গুণের সমাবেশ ঘটেছিল।

হাদিসের গ্রন্থগুলো থেকে জানা যায়, রাসুল (সা.) তখন পারিশ্রমিকের বিনিময়ে মেষ চরাতেন। আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনাকৃত হাদিসে রাসুল (সা.) নিজেই বলেছেন, ‘আল্লাহ যত নবী পাঠিয়েছেন, তাদের সবাই ছাগল চরিয়েছেন।’ তখন সাহাবিরা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল আপনিও? রাসুল (সা.) উত্তরে বলেন, ‘হ্যাঁ, আমি কিরাতের বিনিময়ে (পারিশ্রমিক) মক্কাবাসীদের ছাগল চরাতাম।’ মহানবী (সা.) এই মেহনত ও পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্থনৈতিক জীবনের শুভসূচনা করেছিলেন। (বুখারি, হাদিস : ২২৬২; ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২১৪৯)

বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) নিজে ব্যবসা করেছেন ও এ ক্ষেত্রে অন্যদের সহযোগিতা করেছেন। তার ব্যবসার পরিধি ছিল বিস্তৃত; বর্তমানে যেটাকে ‘ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড’ বলা হয়ে থাকে। এই অঙ্গনে তিনি অনেক আদর্শ রেখে গেছেন। যদি আমানতদারি ও সততার সঙ্গে ব্যবসা করা যায়, তাহলে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড নেক আমলে পরিণত হয়।

যৌবনে পদার্পণ করার পর মহানবী (সা.) ব্যবসা-বাণিজ্যকে পেশা হিসেবে নিয়েছিলেন। তৎকালীন কোরাইশদের অন্য যুবকরাও এভাবে নিজের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড শুরু করতেন। তার ব্যবসা-বাণিজ্যের শুরুর তালিম হয় চাচা আবু তালেবের তত্ত্বাবধানে। চাচার সঙ্গীরূপে তিনি ইয়েমেন ও শামে (সিরিয়া) বাণিজ্যিক সফরও করেন।

ইবনে সাদ (রহ.)-এর বর্ণনা দ্বারা বোঝা যায়, চাচা আবু তালেব কিংবা অন্য ব্যবসায়িক সঙ্গীদের সঙ্গে রাসুল (সা.) বাজারে কর্মতৎপর ছিলেন। তাদের মাধ্যমে রাসুল (সা.) ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাথমিক ধারণা-অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। খাদিজা (রা.)-এর বাণিজ্যিক পণ্য নিয়ে সিরিয়া সফরের আগে তিনি কমবেশি ব্যবসা করেছেন। এবং সফল ব্যবসায়ী হিসেবে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ রেখেছেন। এমনকি তখন তার সততা ও সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা ও কর্মদক্ষতার সুখ্যাতির সুবাস আরবের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়ে।

তৎকালীন আরবদের রীতি ছিল, মক্কার ধনীদের মধ্যে যারা দূরবর্তী সফর ও বাজারের কার্যক্রম থেকে বিরত থাকত, তারা ও যারা অন্য কারণে নিজে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারত না তারা কর্মতৎপর, কর্মদক্ষ, পরিশ্রমী ও আমানতদার ব্যক্তিকে ব্যবসায়িক পণ্য দিয়ে আরবের বিভিন্ন বাজারে পাঠাত। তাদের মধ্যে মুদারাবার আদলে মুনাফার চুক্তি হতো, সে অনুযায়ী লাভের একটা অংশ মুদারিবদের দেওয়া হতো। এভাবে উভয় পক্ষই লাভবান হতো। রাসুল (সা.)-ও মুদারাবার উসুল ও মূলনীতির ওপরই ব্যবসা-বাণিজ্যের শুভ সূচনা করেছিলেন। খাদিজা (রা.)-এর বাণিজ্যিক পণ্য সিরিয়া নিয়ে যাওয়ার আগে অনেকের সঙ্গে তার ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল।

নবুয়তপ্রাপ্তির আগে যেসব শরিকের সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর ব্যবসা-বাণিজ্য করার কথা পাওয়া যায়, তারা হলেন সায়েব, কায়েস ইবনে সায়েব মাখজুমি, আবদুল্লাহ ইবনে আবিল হাম্মাদ প্রমুখ। তারা রাসুল (সা.)-এর সততা, সত্যবাদিতা, পবিত্রতা ও কর্মদক্ষতার সাক্ষ্য দিতেন। এই ব্যবসা-বাণিজ্য নবুয়তপ্রাপ্তির পরও অল্পস্বল্প চালু ছিল, তবে ভিন্ন আঙ্গিকে ও ভিন্নভাবে, যা ইবনে কাসির (রহ.)-এর বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়।

ইবনে কাসির (রহ.) লিখেছেন, আবু সুফিয়ান ইবনে হারব নিজ বন্ধু উমাইয়া ইবনে আবিস সালতের সঙ্গে ব্যবসার জন্য সিরিয়া যান। সেখানে দুই মাস অবস্থান করে মক্কায় ফিরে আসেন, অতঃপর ইয়েমেনে বাণিজ্যিক সফরে গিয়েছেন। সেখানে পাঁচ মাস অবস্থান করে মক্কায় প্রত্যাবর্তন করেন। আবু সুফিয়ান এরপর যখন কাবা শরিফে তাওয়াফ করার জন্য গেলেন, তখন রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। তিনি রাসুল (সা.)-কে বলেন, আপনার ব্যবসায়িক পণ্য অনেক হয়ে গেছে এবং তাতে অনেক মুনাফাও হয়েছে। আপনি কাউকে পাঠিয়ে দিয়ে তা নিয়ে আসার ব্যবস্থা করুন। আমি সেই পারিশ্রমিকও নেব না, যা সবার কাছ থেকে সাধারণত নিয়ে থাকি।

এ কথা শুনে রাসুল (সা.) তা নিতে অস্বীকার করে বলেন, আপনি পারিশ্রমিক না নিলে আমি ব্যবসায়িক পণ্য নেব না। তখন আবু সুফিয়ান বলেন, ঠিক আছে আমি আপনার কাছ থেকে তা-ই নেব, যা অন্য সবার কাছ থেকে নিই। কথামতো রাসুল (সা.) নিজের বাণিজ্যিক পণ্য নিয়ে এলেন এবং আবু সুফিয়ানও পারিশ্রমিক নিলেন। এই বর্ণনা ইমাম বাইহাকি (রহ.)-ও এনেছেন। আল্লামা বালাজুরি (রহ.)-কর্তৃক রচিত ‘আনসাবুল আশরাফ’-এর বর্ণনা মতে, এ ঘটনাটি সে সময়ের, যখন রাসুল (সা.) গোপনে দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন।

নবুয়তপ্রাপ্তির কিছু আগে ও পরে এ ঘটনা রাসুল (সা.)-এর ব্যবসায়িক কর্মতৎপরতার পরিচায়ক, যা মুদারাবার মূলনীতির ওপর ছিল। এ কথা স্পষ্ট যে, তখন রাসুল (সা.) ব্যবসা-বাণিজ্যের জগতে মর্যাদা অর্জন করে নিজের সম্পদ অন্যদের মুদারাবার ভিত্তিতে দিচ্ছিলেন। ফলে তখন বাণিজ্যিক সফরের প্রয়োজন ছিল না। সঙ্গে সঙ্গে দাওয়াতি কার্যক্রমের কারণে সরাসরি সফরের সুযোগও হয়ে উঠছিল না।

এসব বর্ণনা দ্বারা একটি অহেতুক অভিযোগ সমূলে অপনোদন হয়ে যায় যে, রাসুল (সা.) খাদিজা (রা.)-কে বিয়ে করার পর তার ধন-সম্পদের ওপর ভরসা করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। অথচ ঐতিহাসিক বর্ণনাগুলো এ অভিযোগের সত্যায়ন করে না। বরং তিনি নিজেও ব্যবসা-বাণিজ্য করতেন। তবে হ্যাঁ, তার প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজা (রা.) যেহেতু তৎকালীন আরবের বিশিষ্ট নারী ব্যবসায়ী ছিলেন, তাই স্বামী হিসেবে রাসুল (সা.) খাদিজা (রা.)-এর ব্যবসার তত্ত্বাবধান করতেন। পাশাপাশি নিজের ও খাদিজা (রা.)-এর পুঁজি নিয়ে পুরোদমে ব্যবসা করেছেন। তিনি ছিলেন বাণিজ্য নগরী মক্কার সর্বাধিক পুঁজিবান ব্যবসায়ী। নিঃসন্দেহে এই দীর্ঘ ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতাই তার জন্য মদিনায় অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটাতে সহায়ক প্রমাণিত হয়েছিল।

রাসুল (সা.)-এর অনাড়ম্বর জীবনচরিত দেখে এ কথা ভুলে গেলে চলবে না, তিনি ছিলেন মক্কার সবচেয়ে বলিষ্ঠ, বুদ্ধিমান ও অধিক পুঁজিবান ব্যবসায়ী। নবুয়তের আগে তিনি মানবসেবায় নিজের পুঁজি কী পরিমাণ খরচ করতেন, তা খাদিজা (রা.)-এর ভাষায় ফুটে উঠেছে, ‘নিশ্চয় আপনি আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করেন, অসহায় দুস্থদের দায়িত্ব নেন, নিঃস্বের সহযোগিতার জন্য উপার্জন করেন, মেহমানের আপ্যায়ন করেন ও দুর্দশাগ্রস্তকে সত্য পথে সাহায্য করেন...। ’ (বুখারি, হাদিস : ০৩)

এসব কারণে রাসুল (সা.)-এর পরিবার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী পরিবার হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছে। ইসলামও পেশা হিসেবে ব্যবসা-বাণিজ্যকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত